বিদ্যালয়ে জাল সনদে চাকরি, তথ্য ফাঁস

আগের সংবাদ

তিনি আমাদেরই লোক

পরের সংবাদ

আমাদের শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৭:৩৬ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে আমাদের শিক্ষক ছিলেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সে অবস্থায় ঢাকায় আমরা তার অভাব অনুভব করি এবং চাই যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসুন। স্বাধীন বাংলাদেশে দলাদলির বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভালো চলছিল তা বলা যায় না। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসা তখন সহজ ছিল না। পনেরো-ষোলো বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং তাঁকে নিয়ে আমরা আনন্দিত হই। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে তিনি পছন্দ করতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা-জীবনে তাঁর কাম্য সাফল্য তিনি লাভ করেছেন। আমাদের বিভাগীয় প্রধান মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁকে খুব পছন্দ করতেন, আর তিনি খুব পছন্দ করতেন মুনীর চৌধুরীকে। ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে বাংলা বিভাগ খুব মর্যাদাবান ছিল। এই বিভাগের মর্যাদাবান হওয়ার দুটি কারণ ছিল : এক. এই বিভাগের মহান শিক্ষকরা-হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, এস কে দে, মোহিতলাল মজুমদার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ আবদুল হাই, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আহমদ শরীফ, নীলিমা ইব্রাহিম, মুনীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান ও আরও অনেকে। দুই. ব্রিটিশ শাসনবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে বাংলা বিভাগের গৌরবজনক ভ‚মিকা। ব্রিটিশ আমলে ও পাকিস্তান আমলে বাংলা বিভাগ সব সময় প্রগতিশীল ভ‚মিকা পালন করেছে। আমার শিক্ষকদের মধ্যে আমি মুহম্মদ আবদুল হাই, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আহমদ শরীফ, মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম ও আনিসুজ্জামানকে আমার একান্ত হিতার্থীরূপে লাভ করেছিলাম। এর বিপরীত দিকও ছিল।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৬২-৬৩ অনার্স প্রথম শিক্ষাবর্ষে আমাদের কৃষ্ণকান্তের উইল পড়াতেন। মনে পড়ে প্রথম দু-তিনটি ক্লাসে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনকথা, রচনাবলির পরিচয় এবং সাধারণভাবে তৎকালীন বাংলা সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা করেন। তারপর ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটির কাহিনী, কেন্দ্রীয় বক্তব্য, উপন্যাস রচনায় বঙ্কিমচন্দ্রের বিশেষত্ব, তাঁর রচনায় যৌক্তিক শৃঙ্খলা, বাহুল্য ও পুনরুক্তি না থাকা, প্লট রচনায় ও চরিত্র সৃষ্টিতে নৈপুণ্য, উপন্যাস রচনায় রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের এেরপর ১৪ পাতায়
সঙ্গে তুলনায় তাঁর বিশেষত্ব ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। স্যার ক্লাসে কথা ধীরে বলতেন এবং কম বলতেন। পরীক্ষার প্রসঙ্গে কথা বলতেন। তবে মনে হয় পরীক্ষা বিষয়ে তিনি সচেতন থাকতেন। তাঁর ক্লাস আমরা পছন্দ করতাম। বঙ্কিমের উপন্যাস পড়ে এবং ক্লাসে স্যারের কথা শুনে জীবনের রহস্য ও জটিলতা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি এবং অনেক প্রশ্ন মনে জাগে। রোহিণীর প্রতি বঙ্কিম সহানুভ‚তিশীল ছিলেন, এই কথাটা তিনি উদাহরণ দিয়ে জোর দিয়ে বলতেন; সেইসঙ্গে বলতেন যে, বঙ্কিম গোবিন্দলাল, ভ্রমর, রোহিণী তিনজনের প্রতিই সহানুভ‚তিশীল ছিলেন তিনজনের জন্যই অশ্রুপাত করেছেন। ট্র্যাজেডির মর্ম তিনি বোঝাতে চেষ্টা করতেন। অ্যারিস্টটল থেকে আরম্ভ করে কিছু মনীষীর উক্তি তিনি উল্লেখ করতেন। নীতিবিদ বা ঋষি বঙ্কিম আর শিল্পী বঙ্কিম নিয়ে চলমান মতামত তিনি উল্লেখ করতেন মনে হয় কোনোটার পক্ষে কিংবা কোনোটার বিপক্ষে তিনি মত দিতেন না।
তৃতীয় বর্ষ অনার্সে তিনি আমাদের পড়াতেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-আধুনিক যুগ। রেনেসাঁস বা জাগরণ বা নবচেতনা বিষয়ে কোনোদিন কোনো কথা তিনি বলেছিলেন বলে মনে পড়ে না। মনে পড়ে, মুনীর চৌধুরী আমাদের প্রথম বর্ষেই মধুসূদনের নাটক পড়াতে গিয়ে ইউরোপের ও বাংলার রেনেসাঁস সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, বাংলার ছাত্র-শিক্ষক সবারই কাজী আবদুল ওদুদের বাংলার জাগরণ বইটি পড়া উচিত। আমাদের দ্বিতীয় বর্ষে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়াতে গিয়ে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ‘ইউরোপের রেনেসাঁস’ সম্পর্কে দুটি ক্লাসে এবং বাংলার রেনেসাঁস’ সম্পর্কে পরবর্তী দুটি ক্লাসে আবেগের সঙ্গে অনেক কথা বলেছিলেন। ওই সময়ে রেনেসাঁস বিষয়ে শিবনারায়ণ রায়ের একটি লেখা হয়তো তাঁর প্রথম বই সাহিত্যচিন্তায় আমি পড়েছিলাম এবং তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ক্লাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বাংলা গদ্যের বিকাশ, উনিশ শতকের বাংলা সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র, আধুনিক (আধুনিকতাবাদী নয়) বাংলা কবিতা, বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্প, বাংলা নাটক ও প্রাসঙ্গিক আরো নানা বিষয় পালাক্রম অনুযায়ী বর্ণনা করতেন। তিনি গুরুত্ব বিবেচনা করে লেখকদের নাম, বইয়ের নাম, পত্রপত্রিকার নাম, প্রয়োজনীয় সন-তারিখ ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিতেন। আমরা তাঁর ক্লাস পছন্দ করতাম, সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে ক্লাসে তাঁর কথা শুনতাম। এখন মনে হয় ইতিহাস বিবেচনা, কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র তিনি ভাবতেন। বিশ্বস্ততার সঙ্গে তিনি ঘটনা এবং কখনো কখনো ফলাফল বর্ণনা করতেন। ইতিহাস এবং সাহিত্যের ইতিহাসও আমার বিশেষ প্রিয়। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল, নজরুল, আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রমুখের সাহিত্যদৃষ্টি ও সাহিত্যচিন্তা আমি বেশি পছন্দ করি, আর প্রমথ চৌধুরী, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যদৃষ্টি ও সাহিত্যচিন্তাকে আমার কাছে একদেশদর্শী মনে হয়। তবে নিজেদের ক্ষেত্রে এঁদের চিন্তার গভীরতা ও সূতা এবং রচনার অসাধারণ উৎকর্ষ আমাকে আকৃষ্ট করে। বাংলা গদ্যে বুদ্ধদেব বসুর সুন্দর রচনারীতি সবাইকেই বিস্ময়কর রকমে আকৃষ্ট করে।
এমএ-তে (১৯৬৫-৬৬) অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাদের পড়াতেন প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ ও গল্প এবং তাপস-কাহিনী, মহর্ষি মনসুর প্রভৃতি গ্রন্থের লেখক মোজাম্মেল হকের রচনাবলি। মোজাম্মেল হকের গদ্যের বৈশিষ্ট্য ও বিষয়বস্তু সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। প্রমথ চৌধুরীর অসাধারণ গদ্যরীতি, সাহিত্য, সভ্যতা, পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্ক, সাধু ও চলিত ভাষা ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি বিশ্লেষণমূলক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করে আলোচনা করেছেন। প্রমথ চৌধুরীর ছোটগল্পকেও স্যার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রমথ চৌধুরীর বিশিষ্টতা ও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছাত্রদের কাছে প্রিয় ছিলেন তাঁর সফল শিক্ষকতার জন্য ছুটিতে থাকলে তিনি যথাসময়ে ক্লাসে আসতেন এবং সময় শেষ হলে ক্লাস থেকে বের হতেন। তাঁর কথাবার্তায় মিষ্টতা ছিল। তাঁর কোনো ক্লাসে কখনো কোনো সমস্যা হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। তিনি ছাত্রদের কাছে প্রিয় ছিলেন ছাত্রদের প্রতি তাঁর সদয় মনোভাব ও ভালো যে কোনো প্রস্তাবে সাহায্যের হাত প্রসারিত রাখার জন্য। আমি তাঁর কাছে শিক্ষালাভ করে যেমন, তেমনি ব্যক্তিগত নানা কাজে তাঁর সহায়তা লাভ করে উপকৃত।