অরণ্যপুষ্প

আগের সংবাদ

অনন্য এক বসন্তজাতক

পরের সংবাদ

অপার্থিব

শুভ্রা নীলাঞ্জনা

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৭:২০ অপরাহ্ণ

আমাদের পাড়ার যে অমলটা ছিল দুম করে একদিন মরে গেল। বাইক অ্যাক্সিডেন্টে। শুনে আমার মনটা খুব খারাপ হলো। গোপনে চোখের জলও ফেললাম। এমন হবে কখনো ভাবতেই পারিনি, স্বপ্নেও না। অমল সব সময়ই আমার পিছু লেগে থাকতো। ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রেম নিবেদন করতো। যখন-তখন এই সোনা শোন না বলে প্লিজ একবার রাজি হয়ে দেখ। আমি তোর জন্য কী করতে পারি। রামের মতো করে ১০৮টি নীল পদ্ম তোর পায়ের কাছে রেখে দেব। একটা কম পড়লে এই আমার কালো চোখটাই উপড়ে দিব মাইরি বলছি। অমলের এসব কথায় আমি কখনো পাত্তা দেইনি এমনকি রাগও করিনি। একসাথেই তো বড় হয়েছি ছোট থেকে। অমল আমার থেকে খুব একটা বড় না। টেনে-টুনে দুই থেকে তিন বছরের বড় হবে। একটা বয়সে মেয়েটাই ম্যাচিউরড হয়ে যায় ছেলেটার থেকে। আমাকে একটু বড়ই দেখাত এমন একটা দিদি দিদি ভাবছিল আমার ভেতরে। ও যখন আমায় সোনা সোনা বলতো আমার বেজায় রাগ এসে জমা হতো বাবা-মার ওপর। বিশ^ সংসারে আর নাম পায়নি। সোনা নাম রাখার কী দরকার ছিল। হ্যাপাটা আমি বুঝছি হারে হারে। অমল তো একটা বিচ্ছু। পাড়ার সব পূজাতে দিনের মধ্যে হয়তো ২০ বার আশা ভোঁসলের সোনারে সোনারে গানটা বাজাবেই। আমাদের বাড়িটা আবার পূজামণ্ডপের কাছেই। বাধ্য হয়েই শুনতে হয়। অনেকবার বলেছিও অমলকে এই শোন সোনারে সোনারে গানটা বাজালে-না পূজা এসে কিন্তু লণ্ডভণ্ড করে দেব। অমল হেসে বলতো আচ্ছা দিস।
একদিন তো আমার খুব রাগ হলো। সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি স্কুলে। আজ থেকে তিন-চার বছর আগের কথা। ও আরেকটা সাইকেল নিয়ে আমার পিছু পিছু এই সোনা এই সোনা বল না রাজি! আমার তো প্রচণ্ড গরমে মাথাটা তেতেছিল এমনিতেই। আমি সাইকেল থামিয়ে বললাম এদিকে আয়। আয়নাতে তোর থুবরিটা দেখেছিস? আমি ঋত্বিক রোশন চাই বুঝলি। আর সোনা সোনা করবি না, মনে থাকে যেন। অমল তো হেসেই উড়িয়ে দিল। বললো তুই না পাগল আছিস মাইরি। ও তো হিরোরে হিরো। সাধারণ মানুষ আবার ঋত্বিকের মতো হয় নাকি? মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল এসব। আমি তোর আসল হিরো। আচ্ছা ঋত্বিকের মতো বাইসেপ চাই তো? যা আজ থেকেই জিম শুরু করে দেব। আমার হাইট দেখেছিস ৫ ফিট ১০ একদম হয়ে যাব বলে সাইকেলটা ঘুরিয়ে চলে গেল।
এর মধ্যেই আমাকে চলে যেতে হলো কলকাতায় পড়াশোনার জন্য। অমলের সাথে আর আমার আগের মতো দেখা হতো না। অমল হাবড়াতেই ছিল। মাঝেমধ্যে বন্ধে আসলে দেখা হতো। তখন টুকটাক কথা হতো। ও হয়তো একসময় বুঝে গিয়েছিল আমার পেছনে ঘুরে লাভ নেই। দেখা হলে বলতো তুই তো উড়াল দিয়েছিস কলকাতায়। কত বড় বড় হিরো তোর পেছনে এখন লাইন দিয়ে আছে। আমি এই হাবড়ার অমল কখন তোর পেছনে লেগেছিলাম তোর কি আর মনে আছে? তবে একটা কথা মরে গেলেও আমি তোকেই চাইবো। আমি বললাম কি অলুক্ষণে কথারে বাবা! মরে গেলে আর চাইবি কীভাবে। অমল হেসে গেয়ে উঠেছিল ‘জীবনও মরণের সীমানা ছাড়িয়ে বন্ধু-হে তুমি আছো দাঁড়িয়ে’ রবীদাদুর গানটা শুনেছিস? আমি বললাম হুম শুনেছি তো। হয়েছে হয়েছে, স্ট্যান্ট মারা কথা আর বলতে হবে না। আগে মর তারপর দেখবো।
উফ কি কুক্ষণেই না এই কথাটা বলেছিলাম! সত্যি সত্যিই অমলটা মরে গেল!
আমার এত খারাপ লাগছে কেন অমলের জন্য। অমলকে তো আমি ভালোবাসতাম না। কখনো মনেই আসতো না। সব সময় দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি। মৃত্যুর পর বুঝলাম অমল কীভাবে আমার অজান্তে হৃদয়জুড়ে বসেছিল। আমি কেন ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।
এর নাম কি ভালোবাসা? প্রেম? নাকি মায়া?
আমি অমলের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় বছরখানেক হতে চলল অমল চলে গেছে ওপারে। শুধু বড়িতে গেলেই বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠতো। ওদের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খুব করে মনে পড়ে অমল ছিল এখানেই। আর কখনো থাকবে না। অমলের জায়গাটা শূন্য পড়ে আছে। মানুষ অসময়ে, অবেলায় কেন চলে যায়? বারবারই ভাবায় এসব কথা আমাকে।
আমাদের ভার্সিটি থেকে ঠিক হলো এবার এসকারশনে পুরী যাবো, আমরা সবাই হইহই করে রওনা হলাম হাওড়া স্টেশন থেকে। পুরী পৌঁছাতে প্রায় আট ঘণ্টা লেগে যাবে।
মাঝখানে তিন-চারটা স্টেশন যাওয়ার পর রাত ১১-১২টার দিকে একটি ছেলে উঠলো দেখতে অবিকল ঋত্বিক রোশনের মতো, আমি দেখে চমকে উঠলাম। আরে আমার স্বপ্নের নায়ক এতদিন পর সত্যি সত্যি সামনে থেকে দেখতে পেলাম। আমি উসখুস করছি কোথায় বসছে দেখার জন্য। জায়গাটা দেখার পর মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। আমি বসেছি বাম দিকে সামনের দিকে মুখ করে আর ঋত্বিক বসেছে আমার দিকে মুখ করে ৩-৪টি সিট পিছিয়ে। তার মানে মাঝে মাঝে চোখে চোখ পড়েও যেতে পারে। ও মাই গড! আমি ভাবতেও পারছি না জার্নিটা এতটা সুখকর হয়ে উঠবে। আমি-পিয়াল, বোবোদের বললাম না ঋত্বিকের মতো দেখতে একটি ছেলে কামরায় উঠেছে। না হলে ওরা হ্যাংলার মতো লাফিয়ে উঠবে। আর বেবোকে দিয়ে একদম বিশ্বাস নেই দুম করে ওইদিক দিয়ে যাওয়ার ভান করে অলক্ষ্যে কাগজে ওর সেলফোন নম্বরটা লিখে ছুড়ে মারতে পারে আমাদের অজান্তে। বেবো আরো কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। আর বেবো দেখতে সুন্দরী টল ফিগার যে কোনো কেউ তার প্রেমে পড়ে যেতে পারে। তবে বেবো প্রেমে পড়ে না। ও একটু খেলে। খেলা শেষ হলে বেবোর ইন্টারেস্ট শেষ। এ নিয়ে ওর কোনো অনুশোচনাও নেই। ও বলে এখন কেউ লাগাতার প্রেম করে? ছাগল যারা তারা করে। এক জায়গায় আটকে থাকবি কিরে! দুনিয়াটা এগিয়ে যাচ্ছে তুইও এগিয়ে যা। এক জায়গায় পড়ে থাকলে পড়ে পড়ে মার খাবি। তোকে পিষে মেরে পেলবে। পা দিয়ে মাড়িয়ে যাবে। জাস্ট এঞ্জয়। লাইফ ইজ বিউটিফুল। লাইফ ইজ চেঞ্জেবল।
তাই এ নিয়ে আমি কাউকে আর শেয়ার করলাম না। নিজের ভেতরই চেপে রাখলাম। মাঝে মাঝে ঋত্বিকের সাথে আমার চোখাচোখি হয়েছে। ঋত্বিকের চোখে আমার জন্য মুগ্ধতা দেখে আমি ফিদা। এমন একটা চোস্ত ছেলে আমাকে পছন্দ করেছে। পুরী ভ্রমণটা আমার জন্য দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমি যে কোনোভাবেই ঋত্বিকের সাথে কানেক্ট হতে চাইছিলাম মনে-প্রাণে। কিন্তু ব্যাটে-বলে মিল ছিল না। আর শঙ্কায় ছিলাম কখন না কোন স্টেশনে নেমে পড়ে। এসব ভাবতে ভাবতেই আমার চোখটা মুদে এলো। আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। যখন সকাল হলো, তখন আমরা পুরী স্টেশনে। হকচকিয়ে উঠেই ঋত্বিকের সিটের দিকে তাকালাম কেউ নেই সুনসান। প্রায় সবাই নেমে গেছে। বরং আমরাই সবার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলাম। ট্রেন থেকে নেমে আমার উৎসুক চোখ চারদিকে ঋত্বিককে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু না কোথাও তার টিকিটা পর্যন্ত দেখা গেল না। ভেতরে ভেতরে আমি খুব চুপসে গেলাম। নিজের ওপর খুব রাগ হলো। মরার ঘুম পেয়েছিল আমার। কী দরকার ছিল কাল রাতেও ঘুমিয়ে পড়ার? কিছুই তো জানা হলো না। কোথায় যে নেমে পড়লো মনটা খারাপ হয়ে আছে মেঘে ঢাকা আকাশের মতো করে। পায়েলরা বললো কিরে তুই এমন পাঁচের মতো মুখ করে আছিস কেন? আমি খুব শুকনো হাসি দিয়ে বললাম কেই কিছু না তো। ভালো ঘুম হয়নি তাই হয়তো। আমরা সবাই হুড়মুড় করে হোটেলে উঠে পড়লাম। একদম সাগরের পাড়েই। স্বর্গ দ্বারের কাছে পুলীন পুরী হোটেলে। রুমে ঢুকেই জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই মনে হলো সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউগুলো জানালার কার্নিশে এসে পড়ছে। বাহ রুমটা এত সুন্দর পেয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে খুব লাকি মনে হচ্ছে। আমি আর পায়েল এক রুম শেয়ার করলাম। পূর্বা এসে বললো আমিও তোদের সাথেই থাকবো। আমাদের রুমটা থেকে সমুদ্র এতো ভালো দেখা যায় না। তোরা বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখতে পারিস। উফ কী সুন্দর! আমি কিন্তু যাবো না। এই বলে পূর্বা ধপাস করে বিছানায় লুটিয়ে পড়লো। ওর দেখাদেখি আমরাও বিছানায় ধরাশায়ী হলাম। পায়েল বললো এভাবে পরিপাটি বিছানা নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে না। আমরা কেউ ফ্রেশ হইনি। প্রচুর ধুলাবালি শরীরে, চল উঠে আগে আমরা ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নেই। চারদিকে আবার করোনা ভাইরাসের আগমন। খুব সাবধানে থাকতে হবে বলে আমরা হুড-মুডিয়ে উঠে পড়লাম। পূর্বা চলে গেল ওর রুমে। ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে খেয়ে-দেয়ে সাগরের পাড়ে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো।
সবাই জোড়ায় জোড়ায় হাঁটছে। পায়েল, বেবো, পূর্বা সাথে অঙ্কুর, উদয় আর ঋদ্ধ। আমিই একা হয়ে আছি। মনটা খারাপ হয়ে আছে। আসলে আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। সবার সাথেই আমার বন্ধুত্ব। বিশেষ কেউ নেই। আসার সময় ওরা বলেছিল তুই তো কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকবি। আমি বলেছিলাম না থাকবো না। আমি আমার মতোই থাকবো। আর মজা করে বলেছিলাম পুরীতে গেলে আমার কোনো বন্ধু হয়েও যেতে পারে। দেখেনিস তখন আমিও…।
ওরা যখন যুগলে পা ফেলছিল আমি ফেলছিলাম একা। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো। হাই! আমি চমকে পেছন ফিরে তাকালাম আমার মুখটা হাঁ হয়ে গেছে বিস্ময়ে। ঋত্বিক!
মেঘ না চাইতেই জল! এও সম্ভব! অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো ঋত্বিক!
ও বলে উঠলো রিয়েলি। আই এম ঋত্বিক।
সত্যিই আমার নাম ঋত্বিক। তুমি জানলে কী করে?
আমি বললাম আপনি দেখতে অবিকল ঋত্বিকের মতো তাই! হাইট, চুল, হাসি প্রথম দেখায় ঋত্বিকই মনে হয়।
ও বললো তোমার নাম?
আমি বলার আগেই আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো ‘সোনা’।
আমি বললাম আপনি জানলেন কী করে? ও বললো তোমার বান্ধবীরা এই নামেই ডাকছিল।
হুম, তাই তো। সূর্যাস্তের সময় আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। তখন পূর্বা সোনা, সোনা বলে ডাকছিল।
ও বললো ওরা যখন তোমায় সোনা, সোনা বলে ডাকছিল তখন সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে বাড়ি খেয়ে আমার কানে এসে বাজছিল। তখন আমি কনফার্ম হলাম তুমিই সোনা। একদমে কথাগুলো বলে বললো প্রথমেই তোমাকে তুমি বললাম বলে মাইন্ড করোনি তো?
ঋত্বিকের কথার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল আমি যেন ওর কত কালের চেনা। আমি বললাম না না মাইন্ড করবো কেন? আমার বেশ ভালোই লাগছে। কথায় কথায় আমরা অনেক দূর হেঁটে গেলাম। প্রায় পায়েলদের সাথে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। হঠাৎ মনে হলো আমাকে ফিরতে হবে। বললাম ওরা আমাকে খুঁজবে। চলুন ফেরা যাক। ও বললো চলো। আমরা আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ওদের আড্ডার মাঝে ও বললো আমি আপনাদের পাশের হোটেলেই আছি নীলাচলে। এই তিন-চার দিন থাকবো। আমি বললাম আমরাও তিন-চার দিনই থাকবো। আমি বললাম আমরা কাল যাবো চিল্কা হৃদ দেখতে। ও বললো আমিও যাবো।
ঋত্বিক বললো ‘চিল্কায় সকাল’ বুদ্ধ দেব বসুর কবিতা পড়ে অনেক দিন ধরেই ভাবছি চিল্কায় এক সকাল কাটাবো। আমি আস্তে আস্তে করে আওড়ালাম।
কী ভালো আমার লাগলো এই সকাল বেলায়।
কেমন করে বলি?
কী নির্মল এই আকাশ, কী অসয্য সুন্দর
যেন গুণীর কণ্ঠের অভাব উন্মুক্ত তান
দিগন্ত থেকে দিগন্তে
কী ভালো আমার লাগলো এই আকাশের দিকে তাকিয়ে।
মাঝখান থেকে ঋত্বিক বলে উঠলো
কী ভালো তোমাকে বাসি
কেমন করে বলি?
তোমার সেই উজ্জ্বল অপরূপ মুখ, দ্যাখো-দ্যাখো, কেমন নীল এই আকাশ
আর তোমার চোখে কাঁপছে কত আকাশ, কত মৃত্যু, কত নতুন জন্ম
কেমন করে বলি।
ঋত্বিকের মুখে আবৃত্তি শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
ও বললো দেখা হবে কাল। বলে চলে গেল।
আমি ওর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ওরা সবাই হইহই করে উঠলো। এই তোর ঋত্বিককে কই পেলি? সত্যি সত্যিই মানুষ যা চায় তাই পেয়ে যায় কীভাবে? কারণ ওরা সবাই জানে আমি ঋত্বিকের ডাই-হার্ট ফ্যান।
ওদের হইচই দেখে বললাম তোরা সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি করিস। হুট করেই কি প্রেম হয়ে যায়? দেখলাম, একসাথে কিছুক্ষণ হাঁটলাম তাতেই প্রেম! এতো সস্তা ভাবিস না আমায় বলে দলছুট হয়ে হাঁটা দিলাম হোটেলের উদ্দেশে। যেতে যেতে মনে পড়লো দুত্তরি ঋত্বিকের সেল নম্বরটাই তো রাখা হলো না। তাহলে রাতে বেশ জমিয়ে কথা বলা যেত। মনে মনে বললাম কাল দেখা হলেই নিয়ে নিবো।
ঘুম থেকে উঠেই যথারীতি আমরা চিল্কার উদ্দেশে রওনা হলাম। গাড়ি রেখে বোটে করে যেতে হয় চিল্কার হৃদ পার হয়ে দ্বীপে সমুদ্রের কাছে। যেতে যেতে পথে চিল্কা হৃদে ডলফিনের দেখা পেলাম। আর নাম না জানা অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। আকাশে পাখিদের মেলা। এক-একটা পাখি ছোঁ মেরে হৃদ থেকে মাছ ঠোঁটে করে উড়াল দিচ্ছে। দেখতে দেখতে দ্বীপে চলে আসলাম। বোট থেকে নেমে সমুদ্রের কাছে চলে এলাম। বিশাল জলরাশি। মুভিতে যেমন নীল জল দেখি আমরা চিল্কার কাছে সমুদ্রের জল ঠিক তেমনি নীল। মনে হয় কেউ নীল চাদর বিছিয়ে দিয়েছি অথবা নীল আকাশটা সাগরে নেমে এসেছে। আমরা হইহই করে সমুদ্রের দিকে দৌড়াচ্ছিলাম। পেছন থেকে হঠাৎ জোরে জোরে চিৎকার দিয়ে কেউ বলে উঠলো এভাবে সমুদ্রে নামবেন না। এ জায়গা পুরীর সমুদ্রের মতো এক নয়। এখানে দূর থেকে দেখতে হয়। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম ঋত্বিক একটা ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা থেমে গেলাম। দূর থেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের মোহনীয় রূপ দেখে মুগ্ধ হতে লাগলাম। ধু-ধু বালুচর সাথে এলো মেলো বাতাস, লাগোয় ঝাউবনের মর্মর ধ্বনি। সব মিলিয়ে অপূর্ব মুগ্ধতায় ডুবে যাচ্ছি। আমি মন্ত্র মুগ্ধের মতো ঋত্বিকের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঋত্বিক দ্রুত কতগুলো শট নিয়ে নিলো আমার। আমি কাছে যেতেই ক্যামেরাতে আমার ছবিগুলো দেখালো। আমি বললাম কী করে পাবো? ও বললো মেইল করে দেব। আমি তখনি হরহর করে ই-মেইলটা বলে দিলাম। তারপর সবাই একসাথে হইচই করে ডাব খেয়ে যার যার বোটে উঠে গেলাম। ঋত্বিকও তার বোটে উঠে গেল।
মাঝখানের একদিন আমরা পুরীতে থাকবো। পরের দিন যাবো ভুবনেশ^র, ধবলগীরী, উদয়গীরী ও লিঙ্গরাজ মন্দির দেখতে। ঋত্বিকের সাথে আমার আর দেখা হলো না। আমরা হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আর সেলফোন নম্বরটাও নেয়া হয়ে উঠেনি। আমরা ঐ দিন রাতেই ফিরে এসেছিলাম। আমি দুই দিন ঋত্বিকের দেখা না পেয়ে নিজের তাগিদেই হোটেল নীলাচলে চলে গেলাম। আমি ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম ঋত্বিকের জন্য। যেয়ে আমি হোটেল ডেস্কে ঋত্বিকের সম্পর্কে জানতে চাইলাম। ওরা বললো এ নামে তো কেউ উঠেনি এই হোটেলে। আমি তার চেহারার বর্ণনা দিলাম। তখন ওরা বললো অমল নামে এই চেহারা একজন উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় দুদিন ধরে সে কিছু না বলে সব রেখে লাপাত্তা।
আমি অমল নাম শুনে হকচকিয়ে গেলাম। একটু ভয়ও পেলাম। তারপর তার ঠিকানা দেখতে চাইলাম। কোথা থেকে আসছে? হাবড়া দেখে আমার দম আটকে আসছিল। আমি ভাবছিলাম। এ কী করে সম্ভব? অমল তো মারা গিয়েছে বাইক অ্যাক্সিডেন্টে। ও কীভাবে ঋত্বিক হবে। আমার মাথাটা ভন ভন করে ঘুরাচ্ছে। চোখে ঝাপসা দেখছি। আমি সামনের সোফাটায় বসে পড়লাম।
ও সব সময় বলতো আমি ঋত্বিক হবো দেখিস। আর আশ্চর্য আমার সব কথাই ও আগে থেকে জানতো। আমি যখন অবাক হয়ে বলতাম তুমি কী করে জানো?
ও বলতো তুমি কথায় কথায় বলেছ।
আমি ধাতস্ত হয়ে বললাম আমি একটু ওর রুমে যেতে চাই। ওরা আমাকে ওর রুমে নিয়ে গেল। সব দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমার ছবি। ক্যামেরা ওর কাপড়-চোপড়।
আস্তে আস্তে আমি সাইড টেবিলটার কাছে গেলাম। একটা চিরকুট লেখা দেখে।
সোনা,
আমাকে খুঁজতে যেও না। তোমার খুব ইচ্ছে ছিল আমি ঋত্বিকের মতো হই। এমন সুযোগ হয়তো কখনো আসবে না। এমনভাবে তোমাকে সমুদ্রে পাব না কখনো একা। তাই কটা দিন আমি ঋত্বিক হয়ে ফিরেছিলাম তোমার কাছে। মৃত্যুর ওপারেও আমি তোমাকে একি রকম ভালোবাসি।
ভালোবাসা বড় নাছোড়বান্দা।
‘অমল’