তিন বছরের মধ্যে আমরা পেয়াজ রপ্তানীতে সমর্থ হবো

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্কুল হকি প্রথম রাউন্ড সমাপ্ত

পরের সংবাদ

বইমেলার শ্রেষ্ঠ উপহার ‘আমার দেখা নয়াচীন’

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০ , ১০:৩১ অপরাহ্ণ

প্রথমত মুজিববর্ষ উপলক্ষে বইমেলা যে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হয়েছে- এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তারপর মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’ প্রকাশ, আমি মনে করি বইমেলার শ্রেষ্ঠ উপহার। বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রসঙ্গে ভোরের কাগজের এক প্রশ্নের জবাবে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রো ভিসি ও বিশিষ্ট কবি মুহাম্মদ সামাদ।

‘আমার দেখা নয়াচীন’ সম্পর্কে কবি বলেন, সেইসময় যে চীনের অবস্থা ছিল, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। ১৯৪৯ সালে চীন স্বাধীনতা পেল। সমাজতন্ত্রের বিজয়, অভাব অনটন, চুরি ডাকাতি, রাহাজানি, জমিদারি প্রথা, ফটকাবাজারিসহ সমস্ত ঘটনা বাংলাদেশের অবস্থার সঙ্গে তুলনা- এতো সুন্দরভাবে বইটিতে লেখা হয়েছে, যা অতুলনীয়।

কবি সামাদ আরো বলেন, মাও সেতুংয়ে নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের বিপ্লবের ফলে চীনের মানুষের ভেতর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন এলো, তারা মিথ্যা কথা বলা বন্ধ করে দিল, আফিম খাওয়া বন্ধ করে দিল, মানুষকে ঠকানো বন্ধ করে দিল, তারা পরস্পরেকে সাহায্য করতে শিখল, যেখানে একটা সেতু তৈরি করতে প্রচুর টাকার দরকার হতো সেখানে তারা স্বেচ্ছাশ্রমে ব্রিজ রাস্তাঘাট তৈরি করেছে। একজন আরেকজনকে সাহায্য করেছে। এই যে মানুষের ভেতরে পরিবর্তন- এর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পর্যবেক্ষণ, অর্থাৎ আমাদের দেশের গরীব মানুষের অবস্থা কেমন। ঐ দেশের সঙ্গে এই দেশের তুলনা করে করে নানা ধরণের যে বর্ণনা করেছেন তা অসাধারণ। এই বইটা আমি পড়ে প্রায় শেষ করেছি।

বইমেলার স্মৃতিচারণ করে ঢাবির প্রো ভিসি বলেন, এই বইমেলা তো আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে। প্রাণের টানে মানুষ এখানে ছুটে আসে। এখানে প্রাণের আদান প্রদান হচ্ছে বেশ। আসলে এই মেলা আমাদের জাতিসত্তারই অংশ হয়ে গিয়েছে। বইমেলা মানে আমার কাছে একরাশ আনন্দ। যে আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। মেলার এ আঙ্গিনা আমাদের অন্যরকম স্বস্তির জায়গা।

কোন সময়ে মেলার দেখা পেলেন- জানতে চাইলে কবি সামাদ আরো বলেন, আমি ১৯৭৭ সাল থেকে মেলার দেখা পাই। তখন ১০ জনের মতো প্রকাশক বটতলায় বসতো। আমরা আড্ডা দিতাম। রাহাত খান, গুণদাসহ অন্যান্য লেখককে দেখতাম। ভালো লাগতো। এখনকার মতো তখন লেখকদের অতো ছবি ছাপা হতো না। লেখকের প্রতি একটা মাদকতা থাকতো। এটাই ভালো লাগতো। সেই সময়ের মেলা আর এই সময়ের মেলার অনেক পার্থক্য। এখনকার মেলায় তো ভিড়। বইয়ের সংখ্যা, পাঠকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু মানসম্মত বই যে বেরুচ্ছে না তা কিন্তু নয়। মেলার কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা- জানতে চাইলে বলেন, এবারের মেলার ডিজাইনটা অনেক ভালো হয়েছে, বিশাল পরিসর।

কদিন আগে কবিতা উৎসব সম্পন্ন করলেন- এ নিয়ে জানতে চাইলে কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের পূর্বসুরীদের নিরন্তর সংগ্রাম, ত্যাগ আর আত্মদানের পরম্পরায় স্বজনের রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। আজ থেকে তিন দশক পূর্বে সামরিক স্বৈরশাসনের শৃংখল থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে শুরু হয়েছিলো আমাদের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে সংঘটিত সকল অশুভ, অন্যায়, নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার অবসানের আকাঙ্ক্ষা আর অঙ্গীকার নিয়ে তিরিশটি জাতীয় কবিতা উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। এই তিরিশটি উৎসবের স্লোগান বা মর্মবাণী এবং আমাদের প্রধান কবিদের ভাষণ ও বক্তব্যে তার প্রমাণ উৎকীর্ণ রয়েছে।

সমকালীন পৃথিবীর চিত্র তুলে ধরে কবি বলেন, সাহিত্যে ও সমাজে আদিমতা, বন্যতা, অসভ্যতা, নীচতা ও ক্ষুদ্রতার নির্দেশক হলো বর্বরতা। এ মুহূর্তে পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে হাজারটা প্রশ্ন এসে মাথায় ভিড় করে। কেন এখনও এতো যুদ্ধ, হত্যা, ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতি? সবুজ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র ধ্বংসের ক্ষুধায় জনবসতির উচ্ছেদ কি আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেব? নানা ছল-ছুতায় প্রতিদিন নিষ্পাপ শিশুর ওপর বিভৎস নির্যাতন বা অকাল সংহার কি কখনও কাম্য হতে পারে?

সাহিত্যের সমকালীন যাত্রা সম্পর্কে কবি সামাদ বলেন, সকল শিল্পের দাবি তো একটাই- অসত্য, অন্যায়, কূপমণ্ডুকতা, কলুষ ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর সুন্দরের আবাহন। সুন্দরকে পেতে হলে কৃষিখামার, কল-কারখানা, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি কবিতা, সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, সংগীত, নাটক, চিত্রকলাসহ অন্যান্য শিল্প-মাধ্যমের চর্চাক্ষেত্র প্রসারিত করা অপরিহার্য। সেই পথে মানবউন্নয়নের ধারাকে বেগবান করতে না পারলে সমাজে যে অস্থিরতা ও অস্বস্তি সৃষ্টি হবে, তা পরিণতি পাবে বর্বরতায়।

কবিতা এবং শিল্পমাধ্যমের সকল ধারার সঙ্গে শিক্ষার যোগটা কেমন মনে করেন জানতে চাইলে এই কবি বলেন, কবিতা মানে না বর্বরতা। কবিতা ও শিল্পমাধ্যমের সকল ধারার সঙ্গে শিক্ষার যোগ নিবিড়। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষার সংখ্যাতাত্ত্বিক বিস্তৃতি ঘটলেও, মান খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার প্রধান পাদপীঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈষয়িকতার দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিকশিত হচ্ছে না জ্ঞানের সাধনা ও গবেষণার ক্ষেত্রসমূহ।

সমাজ প্রগতির আন্দোলনে, স্বাধীনতা, সাম্য ও মানুষের মুক্তির সংগ্রামে কবিতার ভূমিকা কেমন বলে মনে হয়- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমাজ প্রগতির আন্দোলনে, স্বাধীনতা, সাম্য ও মানুষের মুক্তির সংগ্রামে কবিতার উজ্জ্বল ভূমিকা ইতিহাসে অমলিন। এই মাটিতেই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন; বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কবিতার সঞ্জীবনী শক্তি জনমানুষের চেতনাকে শাণিত করেছে; আমাদের পৌঁছে দিয়েছে মুক্তির মন্দিরে, সাফল্যের দুয়ারে। প্রকৃতি, নারী ও মানবের বেদনা, বিদ্রোহ ও আনন্দের শিল্পিত প্রকাশ কবিতা। কবিতার সৌন্দর্য অপার। যেমন, কোনো রূপবতী নারী ও ধ্রুপদী চিত্রকর্মকে আমরা বলি, দেখতে ঠিক নিটোল কবিতার মতো; কালোত্তীর্ণ কাহিনীকে বলি মহাকাব্যিক; তেমনি সুন্দরের আরাধনায় কবিতা ক্লান্তিহীন।

নকিব