দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই শিশু ধর্ষণ রোধ করবে

আগের সংবাদ

মিয়ানমারকে রায় মানতে বাধ্য করতে হবে

পরের সংবাদ

ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন

জনমত কি পরিবর্তনের পক্ষে?

বিভুরঞ্জন সরকার

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২৪, ২০২০ , ৮:৩০ অপরাহ্ণ

নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব কী? কী ভাবছেন সাধারণ ভোটাররা? এ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো জনমত জরিপ হয়নি। তবে সাদা চোখে যেটা দেখা যায়, তা থেকে এটা মনে হয় না যে মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বরং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মানুষ দুটি কথা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে বলেন। প্রথমটি হলো, ভোট কি দিতে পারব? ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যাবে? আর দ্বিতীয়টি হলো, যাই হোক না কেন, মেয়র পদে আওয়ামী লীগই জিতবে।

আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচনের তারিখ নিয়ে নানা বিতর্ক ও উত্তেজনা হয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশন প্রথমে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিল ৩০ জানুয়ারি। অথচ সেদিন সরস্বতী পূজা। সরস্বতী পূজার দিন নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরূপতা দেখা দেয়। নির্বাচন পেছানোর জন্য অনুরোধ জানানো হলে নির্বাচন কমিশন তা অগ্রাহ্য করে। উচ্চ আদালতে আপিল করা হলেও সেটা নাকচ হয়। নির্বাচনের তারিখ পেছানোটা অসম্ভব বলে ধারণা দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে গেলে এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচন এবং পূজা বর্জনের হুমকি দেয়ার প্রেক্ষাপটে শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন হলে তাদের আপত্তি নেই। এরপর নির্বাচন কমিশনের কানে পানি যায়। তারা তড়িঘড়ি বৈঠকে বসে নির্বাচনের তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে। এতে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিও পিছিয়ে দিতে হয়। একটি এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা। অন্যটি একুশের গ্রন্থমেলা।
১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে থাকে। এটি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই পরীক্ষা নিয়ে শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকের মধ্যেও থাকে বিশেষ আবেগ, আগ্রহ এবং উত্তেজনা। এই পরীক্ষার তারিখ নিয়ে সবার মধ্যেই এক প্রকার সংবেদনশীলতা কাজ করে। পরীক্ষার তারিখ নিয়ে কোনো সমস্যা হলে শিক্ষার্থীদের মনোসংযোগ ব্যাহত হয়। নির্বাচন কমিশনের অদূরদর্শিতা এবং খামখেয়ালিপনার জন্য এবার এসএসসি পরীক্ষার তারিখ পেছাতে হলো। অথচ শুরুতে মনোযোগী হলে নির্বাচন দুই-তিন দিন এগিয়ে আনা যেত। তাহলে পরীক্ষা ও বইমেলা পেছাতে হতো না। পানি ঘোলা করে খাওয়ার নীতি থেকে সরে আসতে পারে না কেউ কেউ।
১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনও একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিকে বলা হয় ভাষার মাস। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতার দিকে এগিয়েছি। একুশ বাঙালির জীবনে এক উজ্জ্বল দিন। বলা হয়ে থাকে, একুশই বাঙালিকে মাথা নত না করতে শিখিয়েছে। ভাষার মাসের শুরুর দিনটিতে বইমেলার উদ্বোধন আমাদের জাতীয় জীবনের একটি নিয়মিত অনুষঙ্গে পরিণত হলেও এবার তার ব্যতিক্রম হলো শুধু নির্বাচন কমিশনের গোঁয়ার্তুমির জন্য। ভাষার মাসের প্রথম দিন নির্বাচন না হলেই ভালো হতো।
যাক এখন সবার মনোযোগ ১ ফেব্রুয়ারির প্রতি। কী হবে ভোটের ফলাফল তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। কেউ মনে করছেন, দুই সিটিতেই আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হবেন। আবার বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ের ব্যাপারেও আশাবাদী মানুষ আছেন। তবে যারা বলেন বিএনপি জিতবে তারা একটি ‘যদি’ শব্দ যোগ করে বলেন, ‘যদি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ হয়।’ এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো নির্বাচন কতটুকু ‘সুষ্ঠু’ হবে? সুষ্ঠু নির্বাচন বলতেই বা কী বোঝেন। সাধারণভাবে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন বলতে বুঝি, ভোটের দিন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকবে, ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পারবে, যার ভোট সে দেবে, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে কেউ বাধা দেবে না। আর তার আগে নির্বাচনী প্রচারণায় সব প্রার্থী সমানভাবে অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে।
এবার নির্বাচনী প্রচারণা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ আছে। প্রচার কাজে বাধা দেয়ার দুয়েকটি অভিযোগ বিএনপির পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আওয়ালের ওপর হামলার একটি অভিযোগও বিএনপি করেছে। তবে তারপরও সবাই নির্বাচনী পরিবেশে অস্বাভাবিকতা তেমন দেখছেন না। এখন ভোটের দিন কী হয়, দেখার বিষয় সেটা। মানুষ যদি স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে দলে দলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়, তাহলে পরিস্থিতি হবে এক রকম আর মানুষ যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, ভোটার উপস্থিতি নগণ্য হয়, তাহলে পরিস্থিতি হবে অন্য রকম। উৎসবমুখর পরিবেশে বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে ভোট হবে কিনা, তা এখনই বলা মুশকিল।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলেই বারবার সবাইকে আশ্বস্ত করছেন। বিরোধী দলের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও বলেছেন, ‘ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ফলে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার সংস্কৃতির অবসান ঘটতে পারে।’ কিন্তু বিএনপির তো ইভিএমে চরম আপত্তি। এটা নাকি ভোট কারচুপির মেশিন। বিএনপি নিজেদের ‘আধুনিক’ বলে দাবি করলেও দেখা যায় আধুনিক সব কিছুতেই তাদের অনীহা। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিতে তাদের উৎসাহ কম। যন্ত্র শতভাগ ত্রুটিমুক্ত না হলেও বর্তমান বিশ্ব তো কার্যত যন্ত্র সভ্যতা। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ছাড়া আজ আর চলে না। তাহলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বিএনপির এত আপত্তি কেন? কারচুপি করার অভিপ্রায় থাকলে সেটা যে কোনো ভোট পদ্ধতিতেই করা সম্ভব। ব্যালট পেপারে ভোট অনিয়ম বন্ধ করা গেছে? ইভিএমে ভোট জালিয়াতি কম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কুমিল্লা সিটি নির্বাচন ইভিএমে হওয়ায় বিএনপি ভোট বর্জন করেছিল। কিন্তু মেয়র প্রার্থী দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে ভোট করেন এবং বিজয়ী হন। ইভিএম তার বিজয় ঠেকাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়া প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালে ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল? আসলে বিএনপি বিরোধিতাকেই তাদের প্রধান রাজনৈতিক কৌশল মনে করে থাকে। আস্থা-বিশ্বাসের অভাব থেকেই তারা দ্বিধান্বিত থাকে। ইভিএমে তাদের অনাস্থা। তারপরও নির্বাচনে আছে। কেন? ইভিএম যদি তাদের হারানোর জন্যই হয়ে থাকে তাহলে ‘জেনেশুনে বিষ পান’ করা কি উচিত? অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইভিএম সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমরা আধুনিক প্রযুক্তিকে সাপোর্ট করি। এর জন্য আমরা ইভিএমের পক্ষে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ। সেই হিসেবে এখন আর এনালগ থাকার সুযোগ নেই।’
বিএনপি বর্তমানে যে সংকটে পড়েছে, এটা তাদের নিজেদের ভুল রাজনীতির কারণেই। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, ‘২০১৪-১৫ সালে আন্দোলন করতে গিয়ে দলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে।’ অতীতের একাধিক হঠকারী সিদ্ধান্ত বিএনপিকে এখন খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। নতুন কোনো হঠকারিতা দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলেও মির্জা ফখরুল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিএনপির অনুক‚লে নয়। ঢাকা সিটির নির্বাচনের ফল কী হবে তা বুঝেও বিএনপি আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে একদিকে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করছে, অন্যদিকে তাদের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রচার করছে। আগের সব নির্বাচনেও তারা ভোটের আগের দিন পর্যন্ত গণজোয়ার দেখেছে, কিন্তু ভোটের দিন ভোট শেষ হওয়ার আগেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। এবার কী হয়, দেখা যাক।
তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণজোয়ারের যে স্বপ্ন বিএনপি দেখছে, সেটি দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। বিএনপির আন্দোলনেও ভাটা, ভোটেও ভাটা। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিএনপির হালে আর কখনোই জোয়ার আসবে না।’
এতো গেল পরস্পর প্রতিদ্ব›দ্বী-প্রতিপক্ষের কথা। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব কী? কী ভাবছেন সাধারণ ভোটাররা? এ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো জনমত জরিপ হয়নি। তবে সাদা চোখে যেটা দেখা যায়, তা থেকে এটা মনে হয় না যে মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বরং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মানুষ দুটি কথা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে বলেন। প্রথমটি হলো, ভোট কি দিতে পারব? ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যাবে? আর দ্বিতীয়টি হলো, যাই হোক না কেন, মেয়র পদে আওয়ামী লীগই জিতবে।
তার মানে কী? মানুষ যে কোনো মূল্যে পরিবর্তন ছিনিয়ে আনার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ নয়।
নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীরা যেসব গালভরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তার সিকি পরিমাণও যে বাস্তবায়ন করবেন না বা করতে পারবেন না এটা মানুষ জানে এবং বোঝে। ভোট প্রার্থী আর বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে আকাশ-জমিন তাফাৎ দেখেই মানুষ অভ্যস্ত। এখন যিনি চব্বিশ ঘণ্টা দরজা খোলা রাখার কথা বলছেন, জেতার পর তার মুখদর্শন সহজ হবে না। তারপরও সরকারে আছে যে দল সে দলের প্রার্থী ভোটে জিতলে কিছুটা বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা। বিরোধী দলের কেউ জিতলে তার প্রতি সরকার বৈরী থাকবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ সবক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।
ঢাকার দুই মেয়র পদে যদি আওয়ামী লীগ হেরেও যায় তাহলেও সরকারের পতন হবে না। জনপ্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও সরকার বড় চাপ অনুভব করবে না। মানুষ এসব বোঝে। বিএনপি কত ধরনের দুর্দশার মধ্যে আছে সেটাও এখন কারো অজানা নয়। দলীয় প্রধান কারাগারে। তার আশু মুক্তির সম্ভাবনা কেউ দেখছেন না। তার ওপর তিনি অসুস্থ। দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি তারেক রহমান লন্ডনে বসে স্কাইপিতে দল চালান। তারেককে নিয়ে দলের নেতৃত্বেই মতভেদ আছে। বিএনপির শুভার্থী বলে পরিচিত গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী তারেককে দলকে মুক্তি দিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। মোট কথা, বিএনপির এখন ‘ভাঙাচোরা’ অবস্থা। এই দলের প্রার্থীকে মানুষ ভোট দেবে কোন আশায়, কোন ভরসায়? দৃশ্যমান নির্বাচনী প্রচারণাতেও আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। তবে মানুষের মনের ভেতর কী আছে তা তো আর বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ঢাকার ভোটাররা যদি আবেগতাড়িত হয়ে কিংবা বিরাগবশ আওয়ামী লীগকে ‘না’ বলেন তাহলে সেটা হবে বড় খবর এবং একই সঙ্গে বড় দুর্ঘটনা।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

এসএইচ