সেলিম আল দীনের নাট্যতত্ত্ব

আগের সংবাদ

পূজার দিনে ভোটের ঘোষণা দিয়ে ইসি বিতর্ক সৃষ্টি করছে

পরের সংবাদ

বাংলা নাটকের শেকড় মেলেছে বিশ্বভূগোলে ডানা

ড. আফসার আহমদ

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৭, ২০২০ , ১২:২৪ অপরাহ্ণ

সেলিম আল দীনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৮ সালে, সম্ভবত ১০ জানুয়ারি। আমরা জানতাম, সেলিম আল দীন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। কিন্তু কোনো ঘরেই তার নামফলক ছিল না। একদিন ক্লাসে গেছি মঈনউদ্দিন আহমেদের ক্লাস করবো বলে। শুনলাম তিনিই সেলিম আল দীন। ঝাঁকড়া চুল, ক্রুদ্ধ চেহারা, মুখভর্তি দাড়ির জঙ্গল, অগোছালো পোশাক, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। আমাদের পড়াতেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য-ইতিহাস। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমি তোমাদের জানা ইতিহাসকে উল্টো করে দেখাতে চেষ্টা করবো। যে সোজা পথে সময়ের হিসাবে তোমরা জানছো মধ্যযুগ, উল্টো করে দেখলে দেখবে ঐ মধ্যযুগের মানুষগুলোর উজ্জ্বল চিন্তাভাবনাই আধুনিক বিশ্বকে এখনো আবিষ্ট করে রেখেছে।’ তার কাছেই আমি শুনলাম শ্রী চৈতন্যের নাম। ধর্ম প্রচারক বলে যাকে জানি, তিনি হলেন বাংলা নাটকের একজন বড় অভিনেতা যিনি নির্দেশকও বটে। এভাবেই আমি এবং আমরা বিশ্বমানবতার উত্থানপর্বের কণ্ঠ শুনলাম পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যের, বিশেষ করে বাংলার কবি চণ্ডীদাসের কবিতায়
‘শুনহে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
সেই আমার প্রথম সেলিম আল দীন দেখা শুরু। তার কাছে বিশ্বনাট্যের পাঠ নেয়া আরম্ভ করলাম নতুন আলোয় পরিস্নাত এই আমি। আমরা শুনতে থাকলাম, পাঠ্যের বাইরে কত না বিচিত্রনামা দেশের নাট্য ইতিহাস। আর স্বদেশ ও ভ‚গোলে স্থিত হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত নাট্যের ইতিহাস হাতড়ে ফিরছেন তিনি নাট্যশৈলীর নবনির্মিতির সে এক কঠোর সন্ধিক্ষণ তার। তখনো কিত্তনখোলা লেখা শেষ হয়নি। কিত্তনখোলা লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৭৮ সালে, শেষ হয়েছিল ১৯৮০ সালে। প্রথম মঞ্চায়ন ১৯৮১ সালে। এই পুরো সময়টা আমার ছাত্রজীবন এবং আমি তখন সেলিম আল দীনের হাত ধরে কবিতা থেকে সরে এসে পরিপূর্ণভাবে নাট্যকর্মী হয়ে গেছি। তিনি তখন ক্লাসের বাইরে অন্য আরেক সেলিম আল দীন আমার কাছে। বিশ্বভ‚গোলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিল্পের স্বর্ণকণাগুলো কত না দ্যুতি ছড়িয়েছিল আমার সেই সেলিম আল দীন বাসকালে। আমার মনে আছে, সে সময়ে তার শকুন্তলা নাটকের আলোচনায় আমি এমত একটি ধারণায় পৌঁছাই যে, পচনশীল মানুষের যে মানবিক বেদনা শকুন্তলা বহন করে, তেমনি আমরাও পাশ্চাত্য নাট্যচর্চার পচনশীলতার ধারা বহন করে চলেছি। বাঙালির নিজস্ব নাট্যআঙ্গিক নির্মাণের পথপরিক্রমার ধারায় বাঙালির নাট্যচর্চার অনিকেত অন্বেষণকে ভিত্তি দিয়েছে শকুন্তলা। শকুন্তলার পর থেকেই শুরু হলো সেলিম আল দীনের নতুন আরেকটি পথের খোঁজে অবিরাম চলা। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া নাট্য ইতিহাসের সন্ধানে ব্রতী হলেন তিনি। সেই সময়ে তার এই নতুন পথের অন্বেষণের যন্ত্রণা এবং আনন্দ উভয়ই আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তার সেই আলোচনার স্বর্ণকণিকাগুলোই বাংলা নাটকের শেকড় মেলেছে বিশ্বভ‚গোলে ডানা তথ্যে, তত্ত্বে এবং নৈয়ায়িক যুক্তির পারম্পর্যে পরবর্তীকালে গ্রন্থে রূপ নিয়েছে মধ্যযুগের বাংলা নাট্য। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘব্যাপ্ত মধ্যযুগের পরিবেশনামূলক গেয় আখ্যান নাট্য ধরা হলে বাংলা নাটকের আদিঅন্ত সমন্বিত একটি নাট্য ইতিহাস হয়ে ওঠে। বাঙালির এই হাজার বছরের নাট্য ইতিহাস রচনার পথপ্রদর্শক অবশ্যই সেলিম আল দীন।
সেলিম আল দীন উল্টো পথে হেঁটেছেন বলেই ঔপনিবেশিক নাট্য ইতিহাসের বিপরীতে তিনি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন বাঙালির হাজার বছরের নাটকের ইতিহাস। ঐ যে শুরুতে আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করেছিলাম, সেলিম আল দীন শিল্পের কোনো অলৌকিক আকাশ থেকে গল্পের স্বর্ণরেণু সংগ্রহ করেননি বাঙালির লৌকিক মিথ ও আখ্যানের সমান্তরাল উজ্জ্বল স্বর্ণ-তারকামণ্ডিত লৌকিক আখ্যান নির্মাণ করেছেন শিল্পের আকাশে। তিনি হেঁটেছিলেন হোমার, কৃত্তিবাস, গেটে, ফেরদৌসী কিংবা মধুসূদনের শিল্পের পথে। তিনি তাই সব রচনায় পূর্বসূরিদের স্মরণ করেছেন, তাদের চলার পথে হেঁটেছেন নতুন পথের সন্ধানে। অনেকটা এরকম, রবীন্দ্রনাথের গানের মতো
‘এ পথে আমি যে গেছি বারবার
ভুলিনি তো একদিন।’
সেলিম আল দীনও ভোলেননি। রবীন্দ্রনাথের প্রেরণাকে মূল বিবেচনায় রেখে তিনি বাঙালির নাট্যরীতির পুনর্নির্মাণ করেছেন। তবে তা হঠাৎ ঘটেনি। শিল্পের কঠিন মৃত্তিকা ক্রমাগত খননে খননে তিনি খুঁজে বের করেছেন বাঙালির নাট্যনন্দনরীতি। তার নাটকের বিষয় ও আঙ্গিক আলোচনা করা হলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একজন নাট্যকারের বোধে ও বিশ্বাসে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের আনন্দ-বেদনায় কি করে নাট্যচরিত্রগুলো সজীব হয়ে ওঠে তা অনুভব করা সম্ভব হবে সেলিম আল দীনের কিত্তনখোলা নাটকের রচনাকালকে স্পর্শ করা গেলে।
সেলিম আল দীনের নাটকের মানুষগুলো হাড়ে-হাড্ডিতে এই বঙ্গীয় ভূখণ্ডের তারা সমস্ত সত্তা দিয়ে বাংলাদেশটাকে দেখে। আমরা ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে গায়েনের কাহিনী বর্ণনার মধ্যে দেখি, গায়েন অখণ্ড একটি কাহিনীকে পরিবেশনার প্রয়োজনে খণ্ড খণ্ড করে বর্ণনা করেন। খণ্ড বর্ণনাগুলো সংযুক্ত থাকে সঙ্গীতের মিড়ের মতন কাহিনীর শরীরে। তাই খুব স্বচ্ছন্দে গায়েন গল্পের একটি অংশকে এক জায়গায় রেখে আরেক অংশের বর্ণনা শুরু করেন। গায়েন যখন বলেন, ‘এই কথা এখানে থাক, দেখি রাজকন্যা লালমতি এখন কি করছে তার রাজপুত্র জামালকে গভীর বনে হারিয়ে।’ এভাবে গায়েনরীতির গল্প বলার অবিরাম ধারাটিতে খানিক বিরতি ঘটিয়ে দর্শকের কল্পনার স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঘটান গায়েন। ফলে খুব সহজেই এই রীতিতে দর্শক-শ্রোতা-অভিনেতার পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গল্পটি এগিয়ে চলে। সেলিম আল দীন বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যের এই রীতির আধুনিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কিত্তনখোলায়। এই নাটকের গল্প কাঠামো গড়ে উঠেছে বহুবিচিত্র খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের অচ্ছেদ্য বন্ধনে। প্রতিটি খণ্ড দৃশ্যেই বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির অন্তর্গত রূপের বর্ণময়তা লেপ্টে রয়েছে। এ কথাগুলো আমি তাকে বলেছি যে, কিত্তনখোলা নাটকের ভেতরে একটা রোমান্টিক আবহ আছে। এই নাটকে অন্তর্লীন বেদনা তীক্ষ্ণতর হয় ক্রমাগত সুন্দরের ক্ষয় পেতে দেখে। চরিত্রগুলোর ভালোবাসার অপূর্ণতা, প্রাপ্তির অপূর্ণাঙ্গতা এবং জীবন ঘষে আগুন জ্বালানোর একটি ব্যর্থ প্রয়াস এই নাটকের বেদনার কেন্দ্রবিন্দু। এই নাটকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে, এখানে সবকিছুই বদলে যায় স্বপ্ন বদলায়, পেশা বদলায়, জীবিকার ধরন পাল্টে যায় অনিবার্য অভিঘাতে। আমি আমার এক লেখায় এর নাম দিয়েছিলাম ‘সামাজিক রূপান্তর’ ধ্রুপদী রূপান্তরবাদের প্রণোদনা যার মূলে। এই নাটকে সামাজিক রূপান্তরবাদের যে প্রকাশ তার মহাকাব্যিক আদল রয়েছে। আর বাস্তবতাকে ঘিরে যে রূপান্তরিত জীবনের গল্প উঠে এসেছে, তার রয়েছে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি। এজন্য কিত্তনখোলা নাটকের মহাকাব্যিক বাস্তবতা জীবনের দুটো পিঠকেই আলোকিত করে। সেই দুই পিঠে যে প্রেম-অপ্রেম কিংবা আশা-নৈরাশ্যের কৃষ্ণছায়া থাকে সেগুলো নড়েচড়ে ওঠে বাস্তবতার আঘাতে। তাকে আমি বলি ‘মহাকাব্যিক বাস্তবতা’। কিত্তনখোলা নাটকের রোমান্টিক আবহ এর ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আঞ্চলিক হলেও তা কাব্যগন্ধী ও ইঙ্গীতবাহী অসংখ্য চিত্রকল্পের সমষ্টি। যতটা না সংলাপে প্রকাশিত তার থেকে অনেক বেশি প্রকাশিত হয় দর্শকের বোধ ও কল্পনায়। সেলিম আল দীন এই নাটকে আঞ্চলিক ভাষার একটি নতুন অবয়ব নির্মাণ করেছেন। একথা ঠিক যে, সেলিম আল দীন বাংলা ক্রিয়াপদ নিয়ে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনে পড়ে, আমাদের প্রায়শই ক্রিয়াপদবিহীন বাক্য লেখায় উৎসাহিত করতেন।
সেলিম আল দীন তার জীবনের শেষ প্রান্তে রচনা করেছেন ধাবমান (২০০৭), স্বর্ণবোয়াল (২০০৭), ঊষাউৎসব (২০০৭), স্বপ্নরমণীগণ (২০০৭) এবং পুত্র (২০০৭) প্রভৃতি নাটক। এ সব নাটক যেন তার খণ্ড এপিক। নাট্যকার স্থির ও প্রাজ্ঞ বিস্ময়ে খণ্ডের মধ্যে অখণ্ড জীবনের কিংবা শিল্পের সমগ্রতার আহ্বান শোনেন। তিনি স্বয়ং ধাবমান নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং নিজের তত্ত্বাবধানে নাটকটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে মঞ্চস্থ করেছেন। ধাবমান নাটকে আমরা সেলিম আল দীনকে বনপাংশুল-এর মতো সর্বপ্রাণবাদী একজন মানুষ হিসেবে দেখি।
সেলিম আল দীন রচিত ধাবমান মৃত্যুর বিপরীতে জীবনের নাটক। এই নাটকে আমরা দেখি সব মানবিক সুখ ও শোকের নূপুরধ্বনির ঝঙ্কার তুলে জীবন ও মৃত্যু একটি রেখায় মিলেছে। আর মৃত্যু যদি এমনই তবে তা সব বেদনা, অভিমান ও শঙ্কার মানবিক বলয়ে বন্দি থাকে কেন? আমি যতবার ধাবমান পাঠ করেছি ততবারই মৃত্যুভীতি মাড়িয়ে জীবন যেখানে বিকেলের লাল আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে পরদিনের ভোরের কমলা রোদের অপেক্ষায় তেমন একটা স্থানহীন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকি। এভাবেই আমি ধাবমান নাটকের ষণ্ড মোষ সোহরাবের গল্পের সঙ্গে মানব জীবনের নানামুখী বেদনা বেহাগের সুরের সঙ্গে আত্মলীন মগ্নতায় ডুবে যেতে থাকি। সেলিম আল দীনের ধাবমান নাটকের গল্পের সর্বব্যাপ্ত আবেদনটি অনুভব করার জন্য মানুষের বোধের সমান্তরাল এই ষণ্ড মোষের মানবিক কষ্টকথার খানিকটা তুলে ধরবো।
সোমেশ্বরীর পারের কোনো এক গ্রামের দরিদ্র কৃষক নহবতের বাড়িতে জন্ম নেয় একটি মহিষ শাবক। নহবত তার নাম রাখে সোহরাব। মহিষটি সন্তানের যত্নে বেড়ে উঠে নহবতের ঘরে। এভাবে ক্রমে ক্রমে একটি বলদর্পী ষণ্ড মোষে পরিণত হয় সোহরাব। তার মানব পিতা ভ্রমেও ভাবেনি সোহরাব সন্তান নয়, নিতান্তই পশু। সে নহবতের বিকলাঙ্গ পুত্র এশাকের ভালোবাসা, মমতা ও ঈর্ষার মধ্য দিয়ে এক সঙ্গে বড় হতে থাকে। কিন্তু একদিন এশাক স্বপ্ন দেখে যে এই মোষটাকে খোদার নামে জবাই দিলে তার আরেকটি পা ভালো হয়ে যাবে। সে এই নিদারুণ স্বপ্ন কথা শোনালে শুরু হয় নহবতের ভেতরে মানবিক টানাপড়েন। একদিকে পুত্র অন্যদিকে প্রায় পুত্রসম সোহরাব, একটি মোষ। তার কেবলি ভাবনা জাগে মনে আর পীড়িত হতে থাকে এই ভেবে যে তবে কি শুধু হত্যার নিমিত্তে সোহরাবকে সে পালন করেছে? এভাবে মানুষ পরাজিত হয় আত্মজ প্রীতির অমোঘতার কাছে। কসাইরা একদিন রোরুদ্যমান নহবতের হাত থেকে সোহরাবকে নিয়ে যায়। জবাইকালে কসাইয়ের ধারালো ছুরির নিচ থেকে পালিয়ে যায় মৃত্যুভীত সোহরাব। সে পালাতে থাকে অনিবার্য মৃত্যুর থাবা থেকে দূরে, বহুদূরে। কিন্তু সে পালাতে পালাতে এই ভেবে অভিমানী ও আতঙ্কিত হতে থাকে যে, যে মানব পিতা তাকে সব বিপদ থেকে এতকাল রক্ষা করেছে তার অভয় হাত নেমে আসে না আর তার ওপর। তিনদিন তিনরাত প্রাণিটা শ্রাবণের সোমেশ্বরীর পারে আকস্মিক মানব কোলাহলের বন্যা তুলে গ্রাম থেকে গ্রাম এবং হাট বাজার লণ্ডভণ্ড করে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবে বলে ছুটে চলে দিগি¦দিক। তার শিঙে ক্ষুরে খুন হয়েছিল এক কসাই এবং আরো অন্য একজন। তারপর একদিন সেই মোষটা, ক্লান্ত এবং অসহায় ফিরে আসে ফেলে যাওয়া সেই গৃহে যেখান থেকে পালিয়েছিল আর ফিরবে না বলে। সে এক গভীর মানবিক অভিমান যেন সোহরাবের। ঠিকানাবিহীন জীবনে যে মানব গৃহের ছায়াতলে জন্মেছে, বেড়েছে সেখান থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের আটপৌরে আনন্দ-বেদনার ঘটনাগুলোকে নানা প্রাসঙ্গিকতায় একটি সুতোয় বেঁধে অসাধারণ ভাষার জাদুতে পাঠকের কাছে শরীরী প্রতিমায় দাঁড় করিয়েছেন সেলিম আল দীন। আমার বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যেই নয়, বিশ্বসাহিত্যেও এ ধরনের গল্প বিরল। এই গল্পে মানুষের স্বাভাবিক হত্যা প্রবণতার বিরুদ্ধে মানবিক প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে। ষণ্ড মোষকে মানুষ হত্যা করতে চেয়েছে মাংসের লোভে। অন্যদিকে মোষটি মানুষ হত্যা করেছে অন্যায্য অথচ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবে বলে। এভাবেই এই নাটকে মানুষের জন্য আপাতদৃষ্টিতে অপরিহার্য বলে বিবেচিত মহিষ জবাইয়ের কাজটি মানবিকতার বিচারে নৃশংসতা বলে গণ্য হয়। ষণ্ড মোষের জন্য আমাদের বেবাক সহানুভ‚তি ও সহমর্মিতা উপচে পড়ে।
ধাবমান নাটক না উপন্যাস না আখ্যান সে বিবেচনাকে নাট্যকার নিজে প্রাধান্য দেননি কখনো। বাংলা নাট্য সাহিত্যের সহস্র বছরের ইতিহাসে গেয় আখ্যান কাব্যের ধারা অনুসারে নির্দিষ্ট আঙ্গিক কাঠামো বিহীন যে ঔপনিবেশিক অবলেশমুক্ত নাট্য রচনার ধারা তৈরি করেছেন সেলিম আল দীন এটি তারই পরিণত ও সংহত পরিবেশনা। তাই এটিকে ফর্মের বেষ্টনীর মধ্যে ফেলে এর প্রাণ ভোমরাকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চাননি নাট্যকার। ধাবমান নাটকের কোথাও তিনি নিজেকে শুধু নাট্যকার বলে দাবি করেননি। বলেছেন গল্পটি ‘হয়তো কোনো এক চারণিক মান্দি কবি সোহরাব বধের প্রত্যক্ষদর্শী অথবা অন্য কোনো ধরনের কোনো কবির কল্পনাজাত গল্প মাত্র।’ শব্দে, বাক্যে এবং ভাষার অনিবর্চনীয়তায় যে দৃশ্যকল্পগুলো তিনি এই নাটকে তৈরি করেছেন তাতে প্রাচ্যের হাজার বছর ধরে প্রচলিত গল্পকথনরীতির রূপ প্রতিমাকে আধুনিক জীবন-যন্ত্রণার সমীপ্যে নিয়ে এসেছেন। সেলিম আল দীন হাজার বছরের সংলাপধর্মী নাট্যরীতির প্রথা ভেঙে এভাবে হয়ে উঠেছেন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পী। দেশকালহীন, সম্প্রদায়হীন নিখিল বিশ্বের সর্বপ্রাণবাদী ভাবধারায় তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ববিহারী। আর সেখানেই তিনি শিল্পবোধের ক্ষেত্রে সাবলাইমের সাক্ষাৎ লাভ করেন।
ধাবমান নাটকে সেলিম আল দীন গল্প ও জীবনের অনিবার্যতায় মান্দি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও কৃত্যের যে মিশ্রণ ঘটিয়েছেন তাতে সোহরাব এভাবেই মানুষের ঘরে পালিত জীবনের মধ্যদিয়ে ক্রমাগত মানবের প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে ওঠে; দর্পী অথচ অসহায়, ক্রুদ্ধ এবং অভিমানী। মানুষের নির্মমতার বিরুদ্ধে এ যেন এক সর্বপ্রাণবাদী নাট্যকারের আত্মার ক্রন্দনধ্বনি, যেনবা সব মৃত্যুর বিরুদ্ধে ঋকমন্ত্রের জীবনভাষ্য হোক না সে পশু সে যে মানবিক জীবনযাপনের অংশীদার হতে চেয়েছিল।
ধাবমান নাটকে সেলিম আল দীনের ঋষিবাক্য প্রায় বাকপ্রতিমার সমাহার এমন একটি নাটক। এখানে এই নাটকের গল্পের মুখ ফেরানো কত না ধর্ম কিংবা মিথের পানে। অথবা এভাবে বলা যায় ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন দেশের মিথ কিংবা গল্প মিশে গেছে ধাবমানের শরীরে। গল্পের পাঠক মানুষ নয়, মোষের প্রতিই করুণার্দ্র হয় এই ভেবে যে মানুুষের ঘরে পালিত হলো অথচ স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার তার হলো না। এ প্রসঙ্গে এই নাটকে মহানবী (স.) কর্তৃক একটি বৃদ্ধ উটকে মালিকের কাছ থেকে ক্রয় এবং মুক্তি প্রদানের কথা আছে। ধাবমান নাটকের ষণ্ড মোষ সোহরাব, গ্রিক বীর একিলিস, মেঘনাদ কিংবা শাহনামা মহাকাব্যের সোহরাব এক হয়ে যায় কেননা গুপ্ত ঘাতকের চিরায়ত সুড়ঙ্গ দিয়ে হত্যাকারী তাদের হনন করেছিল। এভাবে এই নাটকে সেলিম আল দীন নাটকের সীমানা ছাড়িয়ে শিল্পের সমগ্রতার অন্বেষণে স্বদেশ ও সমকালকে গল্পের অন্বিষ্টি করেছেন। বাঙালির সহস্র বছরের গল্পকথনের ধারায় সর্বপ্রাণবাদী প্রত্নপ্রতিমার সঙ্গে জীবনের ভাঙন-গড়নের প্রেক্ষাপটে আধুনিক এপিক দৃষ্টির সংযোগ ঘটিয়েছেন।
একথা সত্যি যে, এই নাটকের রচয়িতা অনবরত ভাঙন-গড়নের ভেতর দিয়ে জীবনকে অবলোকন করেছেন। জীবনের প্রস্ফুটিত পদ্মকোরকের ওপর ভোরের সূর্যালোক তিনি এতটাই প্রবলভাবে অনুভব করেছেন যে পৃথিবীর তাবৎ নৃশংসতার বিরুদ্ধে তিনি জীবনের উত্থানকেই পাঠ করেছেন। একথা এজন্যই বলছি যে, মানব জীবন এবং প্রাণী জীবনের প্রতিটি দুঃখ, বেদনা এবং আনন্দের সঙ্গে এই নাটকের চরিত্রগুলোকে তিনি সম্পৃক্ত করেছেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি যে তিনি মনে করতেন প্রাণিকুল এবং মৎস্যকুলের জীবনকে মহাকাব্যের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে নাটক রচনা করবেন। ধাবমান এবং স্বর্ণবোয়াল নাটক তার এমনি মহৎ প্রয়াসের উদাহরণ। নাটকে বিধৃত বিচিত্র সব চরিত্রের আনন্দ-বেদনার অনুরণন শুনেছি নাটক পাঠ কালে তার কণ্ঠে। আমি দেখেছি যে তার অশ্রু ঝরে পড়ছে মানবিক বেদনায় সোহরাবের জন্য ভেবে পাইনি তা কি মানবিক বেদনা নাকি অনিবার্যতার প্রেক্ষাপটে মানুষের অসহায় ক্রোদের অশ্রুধারা।
সেলিম আল দীন আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তার সৃষ্টি তো আছে তা এত বেশি অমোঘ যে তার রচিত বাক্যবন্ধে মিলিত হয় সহস্র বছরের শিল্পতীর্থগামী মানুষের কলরব। বর্ণনায় দৃশ্যমানতা সৃজনের যে বিস্তৃত আকাশে তিনি গড়েছেন তার ছাতের নিচে তবে এসে পঙ্ক্তিবদ্ধ হোক শিল্পতীর্থগামী মানুষেরা। তবে নাটকের সংলাপ রীতির প্রচল ভেঙে তিনি যে হাজার বছরের পথচিহ্ন ধরে শিল্পাভিসারী হয়েছেন একথা যেমন সত্যি, তেমনি বাঙালির গেয়কাব্যের আখ্যানধর্মী পরিবেশনা রীতিকেও তার নাটক কিংবা কাব্য যা-ই বলি না কেন তার বর্ণনার পরতে পরতে উন্মোচন করেছেন।
সেলিম আল দীনের অর্জন অনেক। বাংলা নাটকের ইতিহাসে তিনি প্রথম বাংলা নাট্যকোষ রচনা করেছেন। তিনি বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দীর্ঘ গবেষণার পর রচনা করেছেন মধ্যযুগের বাংলা নাট্য শীর্ষক আকর গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি বাংলা নাটকের হাজার বছরের ইতিহাস রচনার সূত্রসমূহকে আবিষ্কার করলেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণাপুষ্ট প্রচলিত নাটকের ইতিহাস তিনি প্রত্যাখ্যান করেন তার গবেষণায়। আমরা দেখলাম বাংলা নাটক সৃষ্টির জন্য কোনো লেবেদেফের অপেক্ষায় থাকেনি বাঙালি। নাটকের ক্ষেত্রে বাঙালির রয়েছে বিশ্বসভ্যতার সমান বয়সী ইতিহাস। তিনি তার গবেষণায় দেখালেন যে মধ্যযুগে আসরে পরিবেশিত নাটকগুলো কাব্যাকারে ছিল বলে তা কাব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অথচ তা ছিল আসরে পরিবেশনার সামগ্রী গেয় কাব্য। সুরে, ছন্দে, বর্ণনায় ও অভিনয়ের চমৎকারিত্বে তা হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মানুষদের আনন্দিত ও আন্দোলিত করেছে। ভরতনাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত ‘ওঢ্র-মাগধী’ নাট্যরীতির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বলে পরিচিহ্নিত কালপর্বে। সেলিম আল দীনের এই গবেষণা তাকে বাংলা নাটক ও সাহিত্যের ইতিহাসে অমর করে রাখবে। ঔপনিবেশিক মানসিকতাপ্রসূত বাংলা নাটকের ইতিহাস রচনার ভ্রান্তিগুলোকে সেলিম আল দীন চিহ্নিত করেছেন। স্ব-ভ‚গোলে শেকড় মেলে নিজের দেশ, কাল, শিল্পরুচি এবং নিজের শিল্পতত্ত¡কে বিশ্বভূগোলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তিনি আচার্য সেলিম আল দীন। তার এই বিশ্ববোধের মৌল প্রণোদনা প্রাচ্যের অবিনাশী শিল্পভাবনা থেকে উৎসারিত।