সেলিম আল দীনের রবীন্দ্রনাথ এবং তারপর...

আগের সংবাদ

সেলিম আল দীনের নাট্যতত্ত্ব

পরের সংবাদ

চাকা ও বাংলাদেশের সামরিক শাসন

শফিক আজিজ

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৭, ২০২০ , ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ, যার হাত ধরে বাংলা নাটক হাজার বিভ্রান্ত চোরাবালি আর ঔপনিবেশিক অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে পেয়েছে মুক্তি। নাটকের বিষয়-প্রকরণ, আঙ্গিক, পরিবেশনা বা উপস্থাপনা আর নাট্যতত্ত্বে আরোপিত ইউরোপীয় আধিপত্য ভেঙে তিনি পুনঃস্থাপন করেছেন হাজার বছরের বহমান দেশজ বাঙালি ঐতিহ্য। আধুনিক শিল্পতত্বকে অস্বীকার করে নয়, বরং তার সঙ্গে সহজ আত্তীকরণ করেই দেশজ নাট্যাঙ্গিককে তিনি ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপীয় চিন্তাচ্ছন্নতার দাস্য মনোবৃত্তি থেকে নিজেকে বিমুক্ত রেখে দেশজ নাট্যের প্রতি আগ্রহের পেছনে তার ব্যক্তিমানসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভিঘাত প্রবল ছিল বলে ধারণা করা যায়। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যা এবং এর মধ্য দিয়ে জাতির ওপর চেপে বসা দীর্ঘকালীন সামরিক অপশাসনের বিরুদ্ধে সেলিম আল দীনের ব্যক্তিক ও নাট্যিক শৈল্পিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এর প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।

পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে চেপে বসে সামরিক শাসন। বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হতে থাকে প্রতিনিয়ত, ধর্মকে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। পরাজিত পাকিস্তানিদের এদেশীয় দোসরেরা প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের করে চরম অবমাননা। ধূলিসাৎ হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন। ধর্মকে ক্ষমতায় টিকে থাকার অপকৌশল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি এই অপশক্তি বাংলাদেশের জাতিগত পরিচয়ের কৃত্রিম সংকট উৎপাদন করে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তখন প্রবল আত্মিক তাড়না থাকা সত্ত্বেও নামতে পারেনি এই অপশক্তির বিরুদ্ধে। সেলিম আল দীন এই সময়েই রাস্তায় নেমে আসলেন শৈল্পিক প্রতিবাদ নিয়ে। ‘নাচাও রাস্তা নাচাও’ স্লোগান নিয়ে তার রচিত ‘চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ নাটক দিয়েই সূত্রপাত ঘটলো পথ নাটকের। রাস্তায় এই নাটক করতে গিয়ে শিল্পীদের গ্রেপ্তার বরণও করতে হয়। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি নাটকে সংযোজিত ভূমিকায় সেলিম আল দীন যে ভাষ্য দিয়েছেন তাতেই উঠে আসে সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তার অবস্থানের কথা :

… রাস্তার ওপর নাটক করবো এই গভীর আনন্দ মূল কাহিনীর সঙ্গে কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। তখন দেশে এক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। আমার মনে হয়েছিল অন্য এক শক্তির প্ররোচনায় নিষ্পাপ ও কোনো বিশালকায় সামুদ্রিক প্রাণী হত্যা করা হলো। এ প্রকৃতিবিরুদ্ধ। প্রকৃতিবিরুদ্ধ যে কোনো কাজের আনুপাতিক মূল্য দিতে হয়। এরকম একটা ঐশ্বরিক বিশ্বাস চর কাঁকড়ায় সক্রিয় ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের পথনাটক যে ভ‚মিকা রেখেছিল তার কোনো তুলনা সমকালীন বিশ্বে আছে কিনা সন্দেহ।
শুধু নাটক নিয়েই তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নামেননি, রাজপথেও ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। আশির দশকের শুরুতে জাতির ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দ যখন দোদুল্যমান, তখন একা একাই লড়েছিলেন তিনি এর বিরুদ্ধে। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সেলিম আল দীনের সভাপতিত্বে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী স্বরচিত ‘খোলা কবিতা’ পাঠ করেছিলেন কবি মোহাম্মদ রফিক। ‘সব শালা কবি হবে; পিপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই…’ কবিতা পাঠ করে মোহাম্মদ রফিক সামরিক সরকারের হাতে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এভাবে সেই আন্দোলনে নতুনমাত্রা যোগ করেছিলেন সেলিম আল দীন। তিনি আশাবাদী যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উদ্বোধনের মধ্য দিয়েই সব অপশক্তিকে রোধ করা সম্ভব। আর সে জন্য আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভেতর দিয়ে মানুষকে খুঁজেছেন, খুঁজেছেন বাংলাদেশকে, দেখেছেন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন।

সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটকের প্রেক্ষাপট ও আবহে রয়েছে সরাসরি সামরিক শাসন। এ প্রেক্ষিতে সামরিক শাসনের একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে থাকে। এসব দেশে জাতিগঠন, আদর্শ, গণতন্ত্র এবং বৃহত্তর জাতীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অভাব; নেতৃত্ব, বৈধতা এবং অর্থনৈতিক সংকট; মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাপক দুর্নীতি, আধুনিকীকরণে বাধা, বেসামরিক প্রশাসনের দুর্বলতা প্রভৃতি সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিতে উৎসাহিত করে এবং এ সুযোগে সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যখন রক্তপাত ঘটিয়ে বা রক্তপাতহীনভাবে বেসামরিক লোকের পরিবর্তে সামরিক লোক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন ওই অবস্থাকে সামরিক হস্তক্ষেপ বা শাসন বলা হয়।

নাটকের কাহিনীতে দেখা যায়, কাগেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি গঞ্জের নাম এলংজানি। সে গঞ্জের হাসপাতালে ঢাকা বা বড় শহর থেকে অপঘাতে মৃত এক যুবকের লাশ এসেছে। বৈশাখের কোনো এক উজ্জ্বল সকালে দূরে মাঠে ধান কাটতে যাবে এমন একটি গরুর গাড়িতে মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার শর্তে উঠানো হয় লাশটি। কিন্তু যে ঠিকানায় লাশটি পাঠানো হয় তার সাথে কোনো কোনো গাঁয়ের নাম খানিকটা মিললেও, এমনকি মৃত যুবকের নামের সঙ্গেও একজনের নামের মিলে গেলেও প্রকৃত ঠিকানার অভাবে কোনো গাঁয়ের কেউই লাশটির দায়দায়িত্ব নিতে চায় না। নয়ানপুর গ্রামটিতে গাড়োয়ান ও তার সঙ্গীরা উপস্থিত হওয়ায় সে গ্রামের এক স্কুল মাস্টার লাশটিকে নবীনপুরের কেউ হবে বলে মত দেন। কিন্তু নবীনপুরে নিয়ে দেখা গেল বাহিত লাশটি সে গাঁয়ের কারো নয়। রাত কেটে ভোর হয়। বহনকারী গাড়ির ষাঁড়দ্বয়ের সাথে স্থানীয় ষাঁড়ের লড়াই বেঁধে যায়। গাড়োয়ানের জিতে যাওয়া ষাঁড়দ্বয়কে নবীনপুরের লোকেরা অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে আহত করে। একটি অপরিচিত বাজারে এসে ভাত রেঁধে খায় অভুক্ত গাড়োয়ান ও তার দুই সঙ্গী যুবক শুকুরচান আর জনৈক প্রৌঢ়। লাশটি তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে এক সময় তাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে। অবশেষে তারা নিজেরাই নামহীন-ঠিকানাহীন এই মৃতকে দাফন করে এক শীর্ণ নদীর বালুচরে। অব্যক্ত বেদনায় অশ্রুপাত করে গাড়োয়ান। যুবকটির মৃতদেহ সমাহিত হলে তারা তিনজন ধান কাটতে চলে যায় তাদের গন্তব্য ছিল সোহাগীর বিলের পথে।

নিম্নবর্গের বাহের গাড়োয়ান বউয়ের পীড়াপীড়িতে ধান কাটতে যায় ভাড়ায়; ঘরে নাই খাবার, এমনকি নিজের গরু পর্যন্ত নাই। নাট্যকারের ভাষায় বাহের বলে, ‘বউডা আমার সতী নক্ষী গো* কয় এ বুধুর বাপ খেতে খেতে ধান পাকিছে ঘরে বসি উপুস কাপুস মরবু ক্যা গরু নাই গাড়ি আছে। হলাঙ্গা ফকিরের ষাঁড় দুটু ভাড়া দেয় যাও না।’ বাঙালির সার্বিক মুক্তি তথা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও শোষণমুক্তির প্রত্যয়ে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সামরিক শাসনের নিষ্পেষণে তা সুদূর পরাহত হয়ে দাঁড়ায়। হাসপাতালের ডাক্তারের হুকুমে প্রথমে লাশটি নিতে বাহের অস্বীকৃতি জানায়; বলে, ‘কিসের ঠেকা পড়েছে হামার। খেপের মাল ফেলে দিয়ে চলে যামো \’ কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তারের ফরমান যে সামরিক ফরমান সেটা বাহের অচিরেই বুঝতে পারে। এ ডাক্তারকেই গাড়োয়ানের সঙ্গী সান্তাল ধরমরাজ ঈশ্বর মনে করে, ‘ঈশ্বর মানে শ্বেতীরোগে যার অতিকালো চামড়ায় এশীয় গোঁড়া ও সামন্তবাদী রাষ্ট্রের ম্যাপ…’। বাহেরকে লাশ নিতে বাধ্য করা, সামরিক ফরমানের মতো আদেশ জারি করা ডাক্তার এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সামরিক সরকারের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
অবশেষে লাশ নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাহের ও তার তিনসঙ্গী। ‘চাকায় চাকায় রোদনের দীর্ঘ রেখা আঁকতে খাটুনী বেচা অভুক্ত ক্লান্ত চারজন মানুষ ও একজন ভুল ঠিকানায় আসা মৃত যাত্রা শুরু করে \

শহীদরাও এক সময় স্বজন হয়ে উঠে, ‘চাকার আবর্তনে আবর্তনে অপরিচিতি থেকে পরিচয় ক্রমে গাঢ় ও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠে \’ মহৎ কর্মে মৃতদের লাশ শস্যের চেয়েও দামি হয়ে উঠে, ‘এই গাড়িতে এমন এক কষ্ট বহন করে নিয়ে যাচ্ছে সে যে তাতে বরং ভরা ধানের সোনার আড়ত ভুষি উড়ে যাবে* এই মৃতকে ঘিরে যে আহাজারি উঠবে পৃথিবীর কোনো শস্য তাকে রুখতে পারে না \’ এক সময় শহীদরাও সাধারণের স্বজন হয়ে উঠে। বাহের গাড়োয়ান বলে উঠে ‘সেই সকাল থিকে যার নিগে এত কষ্ট এতপথ তারে ধূলায় চাপা দিয়ে যামো। মরা বলে কেউ না সে।’ গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য ‘বুকে-পিঠে রৌদ্রের অক্ষর’ লিখে নূর হোসন শহীদ হন। গণতন্ত্রের মুক্তির যে কাক্সক্ষা বুকে ব্যক্ত করেছিলেন নূর হোসেন, তার পূর্বের হাহাকার যেন প্রতিধ্বনি হয়ে উঠে গাড়োয়ানের কণ্ঠে। সে চিৎকার করে উঠে, ‘হো ও ও খোদা হামাকের মুক্তি নাই* মোরা নেতিয়ে পড়মো উপুড় হমো পথের ধুলায় তবু মুক্তি নাই* এই পীরের থানের গরুর মুক্তি নাই’।
চাঁদ লাল হয়ে আসে মধ্যরাতের পর \ প্রতিধ্বনি আসে দূর গাঁও থেকে মুক্তি নাই* রাতের বাদুড় ও মুক্তি নাই কথাটা পাশাপাশি উড়ে যায় \তবু আবার সে ক্রোধে চিৎকার করে, ‘তুমার মুক্তি নাই শুকুর চানের যে হাঁটতি কষ্ট হয় মুক্তি নাই’।

এমনকি লাশসমেত চাকা বহন করে নিয়ে যাওয়া ষাঁড়ও এক সময় প্রতিবাদী হয়ে উঠে। নবীনপরের ষাঁড়ের আক্রমণ প্রতিরোধ করে। নাট্যকারের ভাষায় ‘…ওই মর্গের অন্ধকার থেকে আসা যুবকের অন্যায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে ষাঁড়ের ক্রোধ।’ বাহের স্বপ্ন দেখে একদিন গণতন্ত্র উত্তরণের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হবে এই মৃত্যুর রহস্য। ‘প্রায় সবুজ শুকানো খেজুর চাটাই মোড়া বরফ দিয়ে যার অন্যায় মৃত্যুকে শাদা ও খয়েরি কাঠের গুঁড়ার মধ্যে ঢেকে রাখা হয়েছে সে এখন উদ্ভাসিত হবে এসব লণ্ঠনের আলোয় \’ বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতার মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ে সামরিক সরকারের পতন ঘটে এবং উত্তরণ ঘটে গণতন্ত্রের। নাটকটি প্রসঙ্গে সমালোচক অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান মন্তব্য করেছেন :
বেওয়ারিশ লাশের একটি আশ্রয় চাই, চাই সৎকারের মর্যাদা, মানবিক দায়বোধহীন শাসন ব্যবস্থায় সংসারের কেজো লোকেরা তার গুরুত্ব অনুধাবনে অক্ষম। সভ্য সমাজ মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্ববান হবে এটাই কাম্য। জীবিত মানুষের প্রতি কর্তব্য পালনে অভাবনীয় অনীহা যাদের তারা মৃত্যের জন্য কোনো দায়িত্ববোধ করে না। সেলিম আল দীন তাঁর নাটকে উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ ও সামাজিক মানুষকে দেখেছেন।

ক্ষমতার মধুলেহনের বাসনায় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সামরিক বাহিনী; দেশের জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনে নিষ্ঠা আর মৃতের প্রতি কোনোরূপ দায়বদ্ধতা থাকে না এদের। সেলিম আল দীন এ নাট্যের মাধ্যমে করুণাসমেত অভিসম্পাত বর্ষণ করেন তাদের প্রতি, ‘এখন করুণা জাগে তাদের জন্য যারা তাকে হত্যা করেছে যারা তাকে ভুল ঠিকানার দিকে প্রেরণ করেছে* করুণা জাগে তাদের জন্য যারা পেট চিরেছে হত্যার কারণ গোপন করেছে* যারা অন্যায়ভাবে মানব কষ্টের সহস্র সহস্র বর্ষের সঙ্গী যুদ্ধ জয়ী ষাঁড়কে অন্যায়ভাবে আঘাত করেছে \’
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ফেনীর উপক‚লীয় সমুদ্রাঞ্চল, খাসিয়া অধ্যুষিত সিলেট, উত্তরবঙ্গের সান্তাল-ওঁরাও ও কৃষিসম্ভূত ভ‚প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং লোকজীবন কাঠামোর মধ্যে কেটেছে সেলিম আল দীনের শৈশব-কৈশোর। বাঙালির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতির রেনেসাঁকালীন ষাটের উত্তাল দশকে সেলিম আল দীনের তারুণ্যের প্রধান অংশ অতিবাহিত হয়েছে ঢাকায়। তাঁর শিক্ষা, মানস গঠন ও জীবনদর্শনের প্রধান পাঠ তখনই সমাপ্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, জাতির পিতার নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সামরিক শাসন ও ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান, বাঙালির কৃত্রিম আত্মপরিচয় সংকট, লুম্পেন-বুর্জোয়া পুঁজিবাদের আগ্রাসন প্রভৃতি তাঁর জীবনদর্শন ও লেখকসত্তায় ফেলেছে বিস্তর প্রভাব। বাঙালির নিজস্ব নাট্যাঙ্গিক অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যাঙ্গিক নির্মাণে ব্রতী, বাংলা নাট্যাঙ্গিকের প্রাণপুরুষ এই কীর্তিমান শিল্পীর অকাল প্রয়াণে বাংলা নাট্য সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা এতদসংশ্লিষ্ট সবাই স্বীকার করেন।