বিএনপি মানে ‘বাংলাদেশ নেগেটিভ দল’

আগের সংবাদ

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চায় এমপিরা

পরের সংবাদ

নৌদুর্ঘটনা এখন নিয়তি, দায় নেয় না কেউ

এম. মিরাজ হোসাইন, বরিশাল

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৪, ২০২০ , ৮:০২ অপরাহ্ণ

বরিশাল-ঢাকা নৌপথে একের পর এক ঘটছে লঞ্চ দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় প্রাণ ঝরছে সাধারণ যাত্রীদের। দুর্ঘটনার পর লোক দেখানো তদন্ত কমিটি, মামলা আর রুট পারমিট বাতিল এক পর্যায়ে আর আলোর মুখ দেখে না। ফের চলে ওই লঞ্চ আর চালায় সেই অভিযুক্ত মাস্টারই।

অভিযোগ উঠেছে, লঞ্চের বেপরোয়া গতির কারণেই গেল কয়েক বছরে এধরনের একাধিক নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দায় নিতে চায় না কেউ। অধিকাংশ লঞ্চের যন্ত্রাংশ যেমন অপ্রতুল তেমনি নেই দক্ষ স্টাফও। যদিও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগের তদারকি প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে মুনাফার লোভে মালিকদের বিরুদ্ধে স্টাফ কেবিনের পাশাপাশি এবার মেডিকেল ফাস্ট এইড কক্ষও ভাড়া দেয়ার ঘটনা ধরে ফেলেছে বিআইডব্লিটিএ।

প্রশ্নবিদ্ধ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগের তদারকি

২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে চাঁদপুর সংলগ্ন মেঘনায় ঢাকা-বরিশাল রুটের পারবত-৯ লঞ্চের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সুন্দরবন-৮ এর ভিআইপি কেবিন দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ভিআইপি কেবিনযাত্রী নৌবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মা ও তার শিশু সন্তান এবং এক নারী ডেকযাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

২০১৬ সালের ৪ জুলাই কীর্তনখোলার চরমোনাই পয়েন্টে সুরভী-৭ লঞ্চের ধাক্কায় বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার পিএস মাহসুদের একাংশ দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে নিহত হয় ৫ যাত্রী। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর বরিশালের কীর্তনখোলায় এমভি হাজী মোহাম্মদ দুদু মিয়া (রা.)-১ কার্গোটি যাত্রীবাহী লঞ্চ শাহরুখ-২ এর সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যায়। এতে অল্পের জন্য রক্ষায় পায় লঞ্চের যাত্রীরা। সবশেষ দুর্ঘটনার শিকার হয় কীর্তনখোলা-১০ ও ফারহান-৯।

বড় ধরনের এসব নৌ দুটি দুর্ঘটনার পর সুন্দরবন-৮, পারবত-৯ এবং সুরভী-৭ লঞ্চের রুট পারমিট স্থগিত ও গঠিত হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। তবে কিছুদিন পরেই অভিযুক্ত লঞ্চগুলো যাত্রী পরিবহন শুরু করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও মামলার ফলাফল কী হয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নদীপথে দুর্ঘটনার পর রুট পারমিট বাতিল, তদন্ত কমিটি গঠন ও মামলা দায়ের বিআইডব্লিউটিএ এর রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। তবে দুর্ঘটনা বন্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি এ সংস্থাটি। ফলে নৌপথে এখন প্রাণহারানোর পাশাপাশি অঙ্গহানি হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, মাঝনদীতে একাধিক লঞ্চ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে চালানো, অদক্ষ জনবল এবং লঞ্চ মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফালোভ নদীপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মালিক পক্ষের প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারও নতজানু। দুর্ঘটনায় নিরীহ যাত্রীদের প্রাণহানি, অঙ্গহানির ঘটনা ঘটলেও এর দায় নিচ্ছে না কেউ। বিআইডব্লিউটিএর একাধিক বিভাগ একে অপরের দিকে দায় চাপাচ্ছেন।

লঞ্চ মালিকদের মুনাফালোভ কতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছে তার প্রমাণও মিলেছে গত রোববার (১২ জানুয়ারি) লঞ্চের দুঘটনার পর। হতাহত যাত্রীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের মেডিকেল কক্ষে ছুটে যান অনেকে। তবে এ কক্ষটিও যাত্রীদের কাছে ভাড়া দেয়া হয়।

বিআইডব্লিউটিএর বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু জানান, যাত্রীদের কাছে এ অভিযোগ পেয়ে বিআইডব্লিউটিএ তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কীর্তনখোলা লঞ্চ কোম্পানির ব্যবস্থাপক বেল্লাল হোসেন বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের মেডিকেল ফাস্ট এইড কক্ষে সাধারণ যাত্রী নয়, রোগী ছিল। তবে রোগীর অবস্থা মুমূর্ষ ছিল না।

ফাইল ছবি।

বিআইডব্লিউটিএ’র বরিশাল নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, ফারহান-৯ লঞ্চে কুয়াশা মোকাবেলায় ফগ লাইট সচল ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লঞ্চগুলোতে ফগ লাইট, জিপিএস, ভিএইচএফ, রাডার আছে কিনা এবং তা সচল কিনা তা দেখার দায়িত্ব নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগের।

সার্ভে বিভাগের আঞ্চলিক নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড চিফ সার্ভেয়ার আবু হেলাল সিদ্দিকী বলেছেন, সোমবার দুর্ঘটনার মুখে পড়া এমভি কীর্তনখোলা-১০ ও ফারহান-৯ লঞ্চের সার্ভে সনদ বাতিল করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব লঞ্চেই কুয়াশা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। লঞ্চগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচলের কারণেই এমনটা ঘটছে। তাছাড়া মালিকদেরও এ বিষয়ে তদারকি দরকার।

এব্যাপারে লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি সুন্দরবন লঞ্চ কোম্পানীর স্বত্বাধিকার সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, কুয়াশা মোকাবেলার যন্ত্রাংশ সব লঞ্চে আছে কিনা তা পরীক্ষা করা দরকার। সবার আগে লঞ্চে দক্ষ মাস্টার সুকানি প্রয়োজন। দুর্ঘটনায় জড়িত মাস্টার ও চালকের সনদ স্থগিত করা উচিত। তারা বেপরোয়াভাবে লঞ্চ চালায়। মালিক তো লঞ্চে থাকে না। নৌপরিবহন অধিদপ্তর যদি ভালো করে সব লঞ্চে তদারকি করে তাহলে এমন দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।

এনএম