হাওয়া ভবনের নায়কের নাম হাওয়া হচ্ছে!

আগের সংবাদ

বিএনপি মানে ‘বাংলাদেশ নেগেটিভ দল’

পরের সংবাদ

ঘুরে দাঁড়ানোর এখনই সময়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৪, ২০২০ , ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

শিক্ষা ক্ষেত্রে যা ঘটছে তার সর্বোচ্চ সাক্ষী হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুর্দশা। পাবলিক হাসপাতালের মতোই তার দুর্গতি। বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রাইভেটাইজেশন এখন পুরো মাত্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। এমনভাবে ঘটেছে যা পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাবলিক হাসপাতাল এখন মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, চিকিৎসার জন্য ঘুরতে হয় প্রাইভেটের দরজায় দরজায়। যারা সঙ্গতিপূর্ণ তারা ছুটে বিদেশে। সঙ্গতির অভাব যাদের তারা হয় প্রাইভেট চিকিৎসার দাপটে সর্বস্বান্ত হয়, নইলে মারা পড়ে। পাবলিক সঙ্কুচিত হয়েছে; হস্তান্তরিত হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেটের চোটপাটে। অত বড় আদমজী পাটকল, একাত্তরের পরে ব্যক্তিমালিকানা ত্যাগ করে যেটি চলে গিয়েছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, ধপ করে সেটি পড়ে গেল মাটিতে। মরা হাতির দামটাও পাওয়া গেল না। নানাজনে নানাভাবে খাবলে খাবলে নিল তার সম্পত্তি। এটি শুধু যে ঘটনা তা নয়, প্রতীকও বটে। সবক্ষেত্রেই চলছে একই রকম ব্যাপার। প্রাইভেটের যেসব লুণ্ঠন, প্রতারণা, সম্পদ-পাচার, কর ফাঁকি-দেয়া- অভ‚তপূর্ব দাপটের সঙ্গে সবকিছু শুরু হয়ে গেল। বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম এবং বাজার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা নয়, থাকেওনি। সব কিছু পরিণত হয়েছে পণ্যে। টাকা দিলে খুনি ভাড়া পাওয়া যায়, ঘুষ দিলে সবাই বশ হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের বেলায় লোকে ন্যায়-অন্যায় বোঝে না, আপনপর চেনে না, বদ্ধ উন্মাদের মতো কাজ করে। সাগিরা মোর্শেদের হত্যাকাণ্ডের সত্য উন্মোচন করে যেদিন খবর বেরুলো পত্রিকায় সেদিনই তো পড়লাম আরেক খবর, সুনামগঞ্জের এক গ্রামে তুহিন নামে পাঁচ বছরের একটি শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় গলা টিপে মেরে ফেলা হয়েছে। কারা করল ওই কাজ? করেছে তুহিনের নিজের বাবা ও চাচা। চাচাত ভাইদের একজনও লাগিয়েছে হাত। কেন করল? উদ্দেশ্যটা কি? উদ্দেশ্য অন্যকিছু নয়, প্রতিপক্ষকে খুনের আসামি বানানো। প্রতিপক্ষের সঙ্গে এই পক্ষের বিরোধ বেধেছে, সম্পত্তি নিয়ে। সম্পত্তি অনেক দামি- সন্তানের তুলনায়। রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ার প্রাণ যায় শুনেছি আমরা, পিতার হাতে আপন শিশুর প্রাণ যায় আগের দিনে শুনিনি। প্রবাদ-প্রবচনে এখন সংশোধন আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আগের কাল গত হয়েছে, এখন আমরা পুঁজিবাদী এবং অনেক বেশি উন্নত। রাজা নেই, তাতে কি আপনজনরা আছে। সাগিরাকে ভাড়া-করা লোক দিয়ে মারায় তার ভাসুর, ঘুমন্ত তুহিনকে নিজ হাতে গলা টিপে মারে তার বাবা। সাগিরা গেলেন নতি স্বীকার করেননি বলে, তুহিন মরল তার বাপের ঘরে জন্মেছিল বলে। নিরাপত্তা কে দেবে এখন মানুষকে? পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তো মুনাফাকেই বাঁচাবে, মানুষ মরল কি বাঁচল সে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপন্ন; কয়েকটা ইতোমধ্যেই বসে পড়েছে, বাকিগুলো বসে পড়ার পথে। বসে পড়লে শয্যাশায়ী হতে কী অসুবিধা! এর মধ্যে দেখছি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা আরো উঠবে। সংখ্যায় বাড়ছে, গুণেও বাড়বে; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে গিয়ে পড়াবেন, এখন যেমন পড়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যার পরে প্রাইভেট হয়ে যায় সেটা নিশ্চয়ই না জেনে বলেননি। বস্তুত যেমনভাবে প্রাইভেট ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালের কাছে পাবলিক হাসপাতাল মার খাচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নাস্তানাবুদ হবে প্রাইভেটের হাতে। প্রাইভেট কোম্পানির বাস, প্রাইভেট গাড়ি, এরা যেভাবে পাবলিককে বিদ্রুপ করে, শিক্ষার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটবে। ইতোমধ্যে তো এটাও দেখা যাচ্ছে যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় ভর্তি বেশি। মূলধারার শিক্ষা পরীক্ষার আক্রমণে এখন বিপর্যস্ত। আগে একটা সমাপনী পাবলিক পরীক্ষা হতো, এখন অগ্রে ও পশ্চাতে একটি করে জুড়ে দেয়া হয়েছে। একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামনস্ক করে তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ উৎসাহিত করার আয়োজন চলছে লেখাপড়ার চেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিকে বড় করে দেখতে, কোচিং সেন্টার ও গাইড বুকের ওপর আরো অধিক নির্ভরশীল হতে, এমনকি নকল করতেও। পরীক্ষা আছে নকল নেই এমন তো হতে পারে না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সরকার তিন বছরের অনার্স কোর্সের সমাপ্তিতে একটি সমাপনী পরীক্ষার ব্যবস্থার জায়গাতে প্রতি বছরে দুটি করে পরীক্ষার বন্দোবস্ত করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবর্তে পরীক্ষাকে আগের তুলনায় অধিক জরুরি করে তুলে শিক্ষার মানের ওপর ঘা বসিয়েছিল; বর্তমান সরকার ঘা দিয়েছে একেবারে গোড়া পেঁচিয়ে; প্রাথমিক স্তরেই ছোট ছোট শিশুকে ঘাড় ধরে ঠেলে দিয়েছে পরীক্ষা কেন্দ্রে। শিক্ষা ব্যাপারটা পরীক্ষা-দানবের অত্যাচারের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় পরিণত করা হচ্ছে। শিক্ষা থেকে আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতা পলায়ন তৎপরতা এখন সর্বত্র দৃশ্যমান।
ইংলিশ মিডিয়াম কিন্তু এক রকমই আছে। সেখানে ঘন ঘন পরীক্ষা নেই, প্রশ্ন ফাঁস নেই, নকলও চলে না। এবং পিটিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো জোর করে ভালো ফল দেখানোর সরকারি তৎপরতাও নেই। তদুপরি ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষকরা ভালো বেতন পান, তারা ভালো থাকেন, বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষকদের মতো তাদের রাস্তায় নেমে অনশনে বসতে হয় না, পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করার দায়ও নেই।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট বানায়। তারা অর্থ বিদেশে পাচার করে, হুন্ডি চালু রাখে, ক্যাসিনো বসায়, ২৫ টাকার পেঁয়াজকে ২৬০ টাকায় তুলে দেয়। আমাদের বাপ-চাচারা হালি ধরে ইলিশ মাছ কিনতেন, সে তো এখন স্বপ্ন। আমরাও হালি ধরে কমলালেবু কিনেছি, এবার হালি ধরে কিনতে হলো পেঁয়াজ। বাংলাদেশে অসম্ভব কী! সিন্ডিকেট লবণের দামও উঁচুতে উঠাতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত পারেনি। হতে পারে তাদের পরামর্শদাতারা লবণ নিয়ে পাকিস্তানি কেলেঙ্কারির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সেটা ছিল পাকিস্তানের প্রথম যুগ, ১৯৪৯-এর দিকে। ১২ আনা সেরের লবণের দাম তোলা হয়েছিল ১৬ টাকাতে। শাসকশ্রেণির জন্য এর পরিণতিটা হয়েছিল ভয়াবহ; ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এখনকার সরকারকে অবশ্য নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে; ভোটারবিহীন নির্বাচন, মধ্যরাতে ব্যালটবাক্স ভর্তির নির্বাচন, এসব দস্তুর চালু হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে আরো অভিনব ব্যবস্থা উদ্ভাবিত হবে এমনটা আশা করা নিতান্ত দুরাশা নয়। তবুও, পাবলিক বেশি চটে গেলে কী না কী ঘটিয়ে ফেলে এমন আশঙ্কা তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেজন্যই হয়তো আত্মসম্বরণ করা হয়েছে। লবণের দাম উপরের দিকে রওনা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ক্ষ্যামা দিয়েছে। তবে পেঁয়াজের দামের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রদর্শন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য বিলক্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং সংবাদপত্রের ভাষায়, ওই উচ্চতাতেই ‘স্থিতিশীল’ রয়েছে।
তিন.
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধকালে সমাজতন্ত্রের কথা শোনা গিয়েছিল। যুদ্ধের আগেও, ঊনসত্তরের সময়েই, জাতীয়তাবাদী নেতারাও সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলাবলি শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ বাধ্য হয়েছিলেন বলতে। উদ্দেশ্য আন্দোলনরত মানুষকে নিজেদের বেষ্টনীর ভেতর ধরে রাখা। নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রæতি থাকবে সেটাও ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক; উজ্জ্বল অক্ষরে সেটা লেখাও হয়েছিল। কিন্তু যতই সময় পার হতে থাকল ততই, অনেকটা প্রভাত কাটিয়ে ভরদুপুরের আগমনের মতো, পরিষ্কার হয়ে উঠল এই সত্য যে রাষ্ট্র ধরেছে পুরনো পথ, চলেছে সে পুঁজিবাদী ধারাতেই। প্রথমে একটু ইতস্তত করেছে, তার পরে মহোৎসাহে, প্রবল প্রতাপে এবং ক্রমবর্ধমান বিক্রমে এগিয়ে গেছে ব্যক্তিমালিকানার সড়ক ধরে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমাজতন্ত্রের জন্য কোনো সম্ভাবনাই নেই। সমাজে মধ্যবর্তী স্তরটা বসে যাবে। ভাগ হয়ে যাবে শিক্ষার পৃথিবী দুই ভাগে; একপাশে ইংরেজি মাধ্যম, অন্যপাশে মাদ্রাসা। বাংলা মাধ্যম দেবে যাচ্ছে, আরো দাববে।
কিন্তু এমনটা যে ঘটবে কেউ কি কখনো ভেবেছিল? বাংলাদেশের অভ্যুদয় ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রেরণা ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে ঠিকই, না হয়ে উপায় ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা হয়নি। স্বপ্ন ছিল একটি অভিন্ন শিক্ষাধারা গড়ে তোলার; সে স্বপ্ন কুপোকাৎ হয়ে স্বাপ্নিকদের লজ্জা দিচ্ছে। সবকিছুই ঘটল একটি কারণে। সেটি হলো সমাজতন্ত্রীদের অকৃতকার্যতা। মুক্তির সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন, সমাজতন্ত্রীরাও ছিলেন; সমাজতন্ত্রীরাই ছিলেন মূল শক্তি, তাঁরাই আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, এগিয়ে নিয়ে গেছেন, কিন্তু নেতৃত্বে থাকতে পারেননি। নেতৃত্ব চলে গেছে জাতীয়তাবাদীদের হাতে। জাতীয়তাবাদীরা মুখে যাই বলুন, বা বলতে বাধ্য হোন, ভেতরে তারা পুঁজিবাদী, তাদের বিশ্বাস তখন যেমন ছিল এখনো তেমনি রয়ে গেছে ব্যক্তিমালিকানাতেই। বক্তৃতায়, বিবৃতিতে, আওয়াজে সমষ্টির কথা বললেও স্বাধীনতা তাদের জন্য ব্যক্তিগত সুখ আনবে এমনটাই ছিল তাদের প্রত্যাশা। স্বাধীনতা পেয়ে তারা ব্যক্তিমালিকানার লাইনে চলা অক্ষুণ্ন রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক। এবং সেটাই তাঁরা করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হয়নি; মুক্ত হয়েছে পুঁজিবাদ এবং সে তার দৌরাত্ম্য চালিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে প্রবল দুর্বলকে যে হটিয়ে দেবে এটা অনিবার্য। কাপ্তাই হ্রদে একসময় ‘পিরানহা’ নামে একটি রাক্ষুসে মাছ ধরা পড়েছিল, ওই মাছ যেখানে থাকে সেখানে অন্য মাছেরা বিপদে পড়ে, কারণ ‘পিরানহা’ বাঁচে অন্য মাছ ভক্ষণ করে। বাংলাদেশের সর্বত্র এখন ওই মাছের দৌরাত্ম্য; অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সর্বত্র সে ব্যাপকহারে ছোট মাছেদের উদরস্থ করছে। স্বভাবতই তার বিশেষ চোখ দুর্বলদের ওপর। বাংলাদেশে এখন তাই এমনসব ঘটনা ঘটছে কখনো যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে, ধর্ষণের পরে তারা নিহতও হচ্ছে। কিশোর আবরার নিহত হয়, অন্যের অপরাধে নিরপরাধীরা জেল খাটেন। এসবই আমাদের জীবনের এখনকার স্বাভাবিক ঘটনা। এর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর এখনই সময়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নকি