পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্ভাবনার হাতছানি

আগের সংবাদ

বিনামূল্যের বই আটকে ফি আদায়

পরের সংবাদ

ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির নির্বাচন-২০২০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৩, ২০২০ , ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও মেয়র পদে আওয়ামী লীগ বিএনপির বাইরেও অন্যান্য দলের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তারপরও নির্বাচনী লড়াইটি এই দুই দলের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে কারণে আওয়ামী লীগ বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইরে অন্য দল বা প্রার্থীর নাম খুব একটা উচ্চারিত হতে শোনা যাচ্ছে না। যদিও জাতীয় পার্টি দক্ষিণে তাদের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত বহাল রেখেছে- তারপরও সেই প্রার্থীর নামও আলোচনায় খুব একটা আসছে না। সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলেও বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনটিকে রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ দুই সিটি করপোরেশনেই বিএনপির বিপরীতে দলীয় সমন্বয়ক কিংবা দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের ভোট প্রচারে অংশ নিতে না পারার আচরণগত বিধির বাধা-নিষেধে পড়ায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারপরও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদ্বয়ের ব্যক্তিগত পরিচিতি নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার বাস্তবতা রাজনীতির বিশ্লেষকরা দেখছেন না। বিএনপির দুই প্রার্থী অপেক্ষাকৃত নবীন, যদিও তাবিথ আউয়াল ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন কিন্তু নির্বাচনের দিন দলীয় সিদ্ধান্তে বেলা ১১টার পর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত দিয়ে সরে দাঁড়ান। সেই নির্বাচনে তাবিথ আউয়াল শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলে ফলাফল কি হতো জানি না। তবে আনিসুল হক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তার মেয়াদের অর্ধেক সময়েরও কম মেয়র পদে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। মৃত্যু তার বাকি সময়টি কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু দুই আড়াই বছরের মেয়র পদে আনিসুল হকের দায়িত্ব পালন শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্যই নয়, দেশের জনপ্রতিনিধি হিসেবে এক অবিস্মরণীয় জনপ্রতিনিধির প্রতীক হিসেবেও মানুষের কাছে সমাদৃত হয়ে আছেন। মানুষ এখন মেয়র আনিসের মতো জনপ্রতিনিধিকেই দেশে দেখতে চায়। কিন্তু যদি ২০১৫ সালের নির্বাচনে আনিসুল হক জয়ী না হতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশ কখনো এমন অভিজ্ঞতার অর্জন লাভ করতে পারত না। সে কারণেই এখন যে কোনো সিটি করপোরেশন নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসে তখন সাধারণ মানুষের কাছেও বারবার আনিসুল হকের মতো ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি বারবার আলোচিত হচ্ছে। এবারো সেই বিষয়টি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ভোটারদের কাছে আনিসুল হকের মতো গুণাগুণের তুল্যতা নিরুপণের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসছে। সুতরাং নির্বাচনটি রাজনৈতিক  স্লোগান, ভোটাধিকার, দলীয় জয়-পরাজয় ইত্যাদি বিবেচনার চাইতেও অনেক বেশি ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের বদলে যাওয়া চিত্রটি ভোটারদের কাছে বিশেষভাবে বিবেচিত হচ্ছে, সেরকম যোগ্যতার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের শেষ মতটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ৩০ জানুয়ারি ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত।
বিএনপি দুই নবীন মেয়র প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করলেও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এই সুবিধাটি তারা নির্বাচনী আচরণবিধির সুবিধা থেকেই পেয়েছেন। এই নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেও খুব একটা লাভ হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে বিতর্কে কম জড়ানোই ভালো। আওয়ামী লীগ এবং চৌদ্দ দলে নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করার মতো নেতার অভাব রয়েছে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ হয়তো সেভাবেই বাকি দিনগুলোতে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার পরিবেশ বজায় রাখতে সিদ্ধান্ত নিবে। কিন্তু বিএনপির শুরু থেকেই নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ একের পর এক উত্থাপন করে আসছে। বিএনপি অবশ্য শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে লড়ে যাবে বলে যে কথা বলছে সেটি পালিত হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় এখনো কাটেনি। দুয়েকটি গণমাধ্যমে কিছু কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিএনপি ভোটারের মনোভাব পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত নেবে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও বিএনপি এই নির্বাচনটিকে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নিয়েছে বলে যে দাবি করছে সেটি বুঝা যাবে ৩০ তারিখ ভোটের দিন। বিএনপি আরো দাবি করছে যে, এই নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি বা অনিয়ম ঘটলে দলটি সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে, এমন হুঁশিয়ারি গণমাধ্যমে প্রায় দিনই উঠে আসছে। বিএনপি এও দাবি করছে যে এই নির্বাচনে তাদের অংশ নেয়ার মাধ্যমে বিএনপি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করবে। বিএনপির এসব বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কী ধরনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন যে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির এ ধরনের বক্তব্য এবার হয়তো ততটা আবেগ সৃষ্টি করতে পারবে না। কেননা ঢাকা সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ ভোটারই এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সরকারের উত্থান-পতনের কোনো কারণ যেমন দেখতে পায় না, একইভাবে দলীয় পরিচয়ে কিংবা বিএনপির নানা ধরনের উত্তেজনাকর বক্তব্যে আপ্লুত হওয়ার তেমন কোনো কারণও দেখা যাচ্ছে না। ভোটারদের একটা বড় অংশই ঢাকা সিটি করপোরেশনের সূচিত পরিবর্তনকে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে থাকে। কেননা এই শহরটি জনসংখ্যার চাপে এমনিতেই নুয়ে পড়ছে, হাজারো সমস্যা এই শহরে প্রতিদিন মানুষ দেখছে, এসবের সমাধান না হলে ভোগান্তি তাদেরই বাড়বে। সুতরাং আবেগের ভোট নয় বরং আনিসুল হকের মতো যোগ্য মেয়র কাউন্সিলরদের নিয়ে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন তৈরি করা গেলে সমস্যার সমাধান অনেকটাই আশা করা যেতে পারে- এমনটি ভোটারদের বড় একটি অংশের বিবেচনাতে রয়েছে। সেই বিবেচনা থেকে উত্তরের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ৯ মাস দায়িত্ব পালনকালে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তার সম্পর্কে ভোটারদের বড় অংশের ধারণা রয়েছে। তার বিপরীত প্রার্থীর ব্যাপারটি একেবারেই অস্পষ্ট। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ঢাকা-১০ আসনের তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন। ভোটাররা তাকেও মূল্যায়ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পরিচয়ে সবেমাত্র পরিচিত হয়েছেন। তাকে জনগণ মেয়র হিসেবে কতটা গ্রহণ করবেন কি করবেন না সেটি এখনো বুঝা যাচ্ছে না। সেই বিবেচনা থেকে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী ভোটারদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত, বিএনপির প্রার্থীদ্বয় তুলনামূলকভাবে পরিচয়ের দিক থেকে পিছিয়ে আছেন। জাতীয় নির্বাচনে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভোটাররা অনেক কিছু ছাড় দেন। কিন্তু ভোটাররা সিটি করপোরেশনের বাস্তবতাকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এমন ধারণা থেকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদ্বয় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছেন, বিএনপির প্রার্থীদ্বয় প্রভাবশালী নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয়ার অবস্থান থেকে এগিয়ে আছেন। ভোটের বিষয়টি এক্ষেত্রে চ‚ড়ান্তভাবে বলা যাবে না। তবে বিএনপি এখন নির্বাচন নিয়ে যেসব সংশয় সন্দেহ প্রচার করছে, কিংবা ভোট কারচুপি ও চালিয়াতির আগাম অভিযোগ তুলছে- সেটিতে আওয়ামী লীগ আদৌ জড়াবে কিনা তা বলা কঠিন। কেননা আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন তাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য কতটা সুখকর হবে সেটি দলটি বুঝে না তা ভাবার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক বোদ্ধারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে বলেও দিয়েছেন যে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হেরে গেলে দলের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো কিছু হবে না। তার এমন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট দলীয় অবস্থানটি বুঝা যায়। তাছাড়া আওয়ামী লীগের সব নেতৃত্বই এখনো পর্যন্ত যথেষ্ট সংযত ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন। দলীয় মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীরা দুই সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন ভাবনা নিয়েই জনগণের কাছে ভোট চাইছেন। অন্যদিকে বিএনপি দল এবং জোটগতভাবে নির্বাচনী মাঠে জয়-পরাজয় নিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার হুমকি-ধমকি দিয়েই চলছেন। ঐক্যফ্রন্টকে বিএনপি তাদের প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছে। তবে মাহমুদুর রহমান মান্না যত বেশি মাঠে অবস্থান করছেন অন্যদের ততটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্য ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করবে- সেটি নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ঢাকা দুই সিটি নির্বাচনকে গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করায় অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, বিশ দলীয় জোট এবং ঐক্যফ্রন্ট যেভাবে নির্বাচনটিকে রাজনীতিকরণ করছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা আদর্শে বিশ্বাসী ভোটারদের ভোট আদৌ ধানের শীষের প্রার্থীদের দিকে যাবে কিনা সন্দেহ আছে। এসব বিবেচনা ঢাকা সিটি করপোরেশনের আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ঘুরপাক খেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে ৩০ তারিখ ঢাকার দুই সিটি মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে ভোটাররা সূচিত পরিবর্তনের ঢাকা শহরের দিকেই হয়তো থাকবেন। কেননা শেখ হাসিনা ঢাকা শহরের পরিবর্তনে মেয়র আনিসুল হককে মনোনয়ন প্রদান করে যে রূপকল্পের বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, সেটি এবার আরো বেশি জোরদার হয়েছে বলেই মনে হয়। সেই সুযোগ হাতছাড়া করার কথা ঢাকাবাসী ছাড়বে বলে মনে হয় না। তারপরও অপেক্ষা করতে হবে ৩০ জানুয়ারির ফলাফল দেখা পর্যন্ত।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

নকি