বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের উদ্বোধন

আগের সংবাদ

ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি যুক্তরাষ্ট্রের

পরের সংবাদ

দস্যুমুক্ত সুন্দরবনে নির্বিঘ্ন পর্যটক-জেলেরা

আসলাম রহমান, সুন্দরবন থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১১, ২০২০ , ৭:১২ অপরাহ্ণ

ডাকাত সর্দারের কাছে থাকতো দু’পকেটে দুইটা মেশিন (অস্ত্র)। বাহিনীর অন্য ২৫/৩০ সদস্যের সবাই অস্ত্রধারী। তারা আসলে ফরেস্ট অফিসারও (বন কর্মকর্তা) থরথর করে কাপতো। বড় মহাজনেরর কাছ থেকে দাদন নিয়ে আসা টাকা তাদের দিয়ে দিতো হত। মাঝে মধ্যেই হানা দিতো গামা, কালু, মাস্টার আর হাশেম জুলফির (জুলফিকার) মত বিভিন্ন জলদস্যু বাহিনী। বাপ-দাদার পেশা হওয়ায় মায়া আর ভালোবাসায় বন ছাড়তে পারিনি। জীবন হাতের তালুতে রেখে বনের ভেতর ছোন কাটতাম। তবে এখন আর সেই ভয়ানক দিন নাই। গত তিন বছর ধরে ডাকাতের কোন আনগোনা নেই। মনে হয় এখন মায়ের কোলের মত নিরাপদে আছি।’

কথাগুলো জানাচ্ছিলেন সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ছোন এবং গোলপাতা সংগ্রহের স্থানীয় মহাজন মোশারফ হোসেন ভুইয়া। প্রায় একই রকম কথা বলেন বঙ্গোপসাগরেবর গভীর সমুদ্রেরে মাছ ধরা ট্রলারের মালিক চান মিয়া। তিনি বলেন, এখন মনে হয় মায়ের কোলে আছি। তিন বছরে ডাকাতের উৎপাত নেই। বাংলাদেশ নৌ বাহিনী, র‌্যাব আর কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল দেয়। আগে সাগরে প্রতিরাতে ডাকাতি হতো। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু আতংক নিয়ে সাগরে থাকতাম। রাতে ট্রলারে আলো জালাতাম না। আলো দেখে দেখে হানা দিতো ডাকাতের দল। বাধা দিলে কুপিয়ে জখম কিংবা গুলি করে সাগরে ফেলে দিতো। জেলে অপহরণ আর মুক্তিপণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেক সময় জেলেরা জোটবদ্ধ হয়ে ডাকাতদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু গত ৩/৪ বছর ধরে কোন ডাকাতের উৎপাত নেই। ডাকাতি কি ভাবে বন্ধ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, র‌্যাব, নৌবাহিনী আর কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালিয়েছে। টহল দিচ্ছে। সুন্দরবনে র‌্যাবের অভিযানে অনেক ডাকাত সর্দার মারা গেছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক ডাকাত আত্মসমর্পন করেছে। ফলে সুন্দরবনে বর্তমানে সেই অর্থে দুধর্ষ কোন ডাকাত নেই।

এ অঞ্চলের দায়িত্বরত খুলনা নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, বিস্তৃত সমুদ্র তীরবর্তী সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড নিয়মিত নিরাপত্তার টহল দিয়ে থাকে। ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা ও তৎসংলগ্ন নদী এলাকায় নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নৌবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির কারণে সুন্দরবনও এখন জলদস্যু, বনদস্যু, ডাকাতসহ পেশাদার অপরাধীমুক্ত হয়েছে। মা ইলিশ রক্ষার সময়ও এ অঞ্চলে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সার্বক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে থাকে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

সুন্দরবনের ভেতরের একাধিক জেলে এবং গোলপাতা সংগ্রাহক জানিয়েছেন, সুন্দরবনে আগের মত ডাকাতি নেই এটা ঠিক। তবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এখানে কাজ করতে হয়। বিশেষত, বনকর্মকর্তা এবং পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। এছাড়া কিছু বখাটে লোকজন রয়েছে। তারা মাঝে মধ্যে মাছ নেয়। রয়েছে শরণখোলা রেঞ্জের ছন সংগ্রহের একজন মহাজন অভিযোগ করেন, নতুন কর্মকর্তা এসে হঠাত করেই তাদেরকে আর ছন কাটতে দিচ্ছেন না। তারা সরকারকে প্রতি কুইন্টাল ছনের জন্য আইন অনুযায়ী ২৫০ টাকা করে নিয়মিত দিচ্ছেন। কিন্ত কর্মকর্তা তাদেরকে ছন কাটতে দিচ্ছেন না। এখন ছন কাটতে অন্য পন্থায় (ঘুষ) যেতে হবে বলে তিনি ইঙ্গিত করেন।

ছন সংগ্রহকারীরা জানান, একেকজন মহাজনের আন্ডারে ১৫/২০ জন শ্রমিক থাকে। তারা প্রতিদিন ৩০০ আটি ছোন কাটতে পারে। প্রতি আটি ছনের জন্য শ্রমিককে দিতে হয় ২ টাকা। সুন্দরবন থেকে মংলা বন্দরে পৌছতে আটি প্রতি ট্রলার ভাড়া দিতে হয় ১ টাকা। তারা মংলা বন্দরে বড় মহাজনের কাছে প্রতি আটি ছোট ৪ টাকায় বিক্রি করেন। মহাজন এই ছন মুল পানের বরজের মালিকদের কাছে ৫ থেকে ৬ টাকায় প্রতি আটি বিক্রি করেন। সুন্দরবনে তারা ১২/১৫ জন ছোট মহাজন রয়েছেন। প্রত্যেকে মৌসুমে ৫০ হাজার থেকে একলাখ আটি ছোন সংগ্রহ করে। শ্রমিকের শ্রমের কষ্ট এবং তাদের লাভের হিংসভাগ চলে যায় মংলার বড় মহাজনের পকেটে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে সুন্দরবনে জলদস্যুদের সবচেয়ে বড় বাহিনী মাস্টার বাহিনী আত্মসমর্পন করে। এরপর একে একে দস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে থাকে। ছোট বড় অনেক জলদস্যু বাহিনী সরকারের কাছে আত্ম সমর্পন করতে থাকে। দস্যুমুক্ত হতে থাকে সুন্দরবন। সুন্দরবন এখন প্রায় পুরোপুরিই দস্যুমুক্ত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে খুলনার কয়রা উপজেলার কয়রা খালে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে আমিনুর বাহিনী নামের জলদস্যু বাহিনীর প্রধান ও তার চার সহযোগীসহ নিহত হয়। আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে সুন্দরবনে ডাকাতের সাথে মাঝে মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। এতে বোঝা যায় সুন্দরবন এখনো পুরোপুরি দস্যুমুক্ত নয়। আগের বড় বড় বাহিনী ভেঙ্গে ছোট ছোট বাহিনী গড়ে উঠেছে। তবে তারা খুব বেশি শক্তিশালী নয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারোয়ার-বিন কাশেম বলেন, ধারাবাহিক অভিযান এবং আত্মসমর্পন প্রক্রিয়ার কারণে সুন্দরবনে এখন পরিপূর্ণ শান্তি বিরাজ করছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পন করা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এখনও নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

এসএইচ