‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’

আগের সংবাদ

দূরের বাদ্যি, তবু কান পেতে রই

পরের সংবাদ

সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের কারিগর

শামসুজ্জামান খান

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ৯, ২০২০ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ

অনুজপ্রতিম সাহিত্যিক আবুল আহসান চৌধুরী আমার খুব প্রিয় মানুষ। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও মেলামেশার সুবাদে তাকে নানাভাবে জেনে-বুঝে আমি মুগ্ধ, অভিভ‚ত হয়েছি। কারণ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগ যেমন বিচিত্র ও গভীরতর, নিষ্ঠাও তেমনি ক্লান্তিহীন ও বিপুল শ্রম-চিহ্নিত। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং লোক-ঐতিহ্যের অকর্ষিত নানা ক্ষেত্রে তার গবেষণা ও অনুসন্ধান আর্কিওলজিস্ট ও এথনোগ্রাফারের খননধর্মী প্রযত্ন ও অনুপুঙ্খতার স্তর পরম্পরা অতিক্রম করার মতো। ফলে মীর মশাররফ হোসেন বা লালন ফকির সংক্রান্ত তার বহুতল-বিন্যস্ত গবেষণা পরিপূর্ণতা পেয়ে খুঁতখুঁতে সমালোচকেরও সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এই দুই মহান সাধক শুধু নন, তাদের সৃৃজন-ভুবনের প্রতিবেশী এবং পরিপূরক সুজন-কর্মী কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, জলধর সেন, পাগলা কানাই, মুনশী শেখ জমিরউদ্দীন, মোহাম্মদ দাদ আলী, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন, কে. মল্লিক বিষয়ে তার অনুসন্ধান উন্মোচনমূলক, আবিষ্কারধর্মী- ফলে তা জাতীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
আবুল আহসান চৌধুরী শুধু উপযুক্ত বৃত্তেই নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি- রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ গুপ্ত, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেনসহ বহু খ্যাতকীর্তি লেখকদের জীবন-জগৎ বা ভাবাকাশের নির্মোহ, বুদ্ধিদীপ্ত ভাষ্য রচনা করেছেন।

আবুল আহসানের এ ধরনের বহু কাজের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ বা পক্ষে সংযোগ রয়েছে। সেই সব বিষয় নিয়ে বিশদভাবে বলতে গেলে তার জন্য বিস্তৃত পরিসর প্রয়োজন। এই মুহূর্তে সেই সুযোগ না থাকায় তার শুধু একটি অসাধারণ কাজ সম্পর্কে সামান্য দুয়েকটি কথা নিবেদন করতে চাই। আধুনিক বাংলা গানে কে. মল্লিকের অবদান বিস্ময়কর। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি বাংলা গানের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান সমাজে বিধিনিষেধের বেড়াজাল ভেঙে যে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন, সেই বিষয়টি বিস্মৃতির প্রায় অতলেই হারিয়ে যাচ্ছিল। আবুল আহসান চৌধুরী অসাধারণ নিষ্ঠা, অসামান্য শ্রম ও নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কে. মল্লিকের আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এটি একটি অনন্যসাধারণ জাতীয় কর্তব্য সাধন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই আত্মজীবনীটি প্রকাশের ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। আমি আনন্দিত এই জন্য যে, এই বইয়ের প্রকাশের সময়ে আমি জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করছিলাম এবং এই বইটি জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশ করা যে একটি উপযুক্ত কাল, এটি জাদুঘরের প্রত্ন পর্ষদকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। আবুল আহসান চৌধুরী আমাদের শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বহু ফাঁক, ফারাক ও শূন্যতা পূরণ করেছেন। এই কাজটি তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি। এই কাজে সহায়তা করতে পেরে আমি তৃপ্ত ও আনন্দিত।

আমি যখন বাংলা একাডেমির গবেষণা, সংকলন ও ফোকলোর বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, তখন কাজের সূত্রেই আবুল আহসান চৌধুরীর প্রতিভার পরিচয় পাই। বিশেষ করে জীবনীগ্রন্থমালায় ‘লালন শাহ, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন’ প্রভৃতি গ্রন্থের মাধ্যমে তথ্যনিষ্ঠা, বিশ্লেষণযোগ্যতা ও মূল্যায়নক্ষমতার যে পরিচয় দিয়েছেন, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। তার মাধ্যমেই বাউল-কবি মহিন শাহের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। মহিন শাহের জীবদ্দশাতেই আবুল আহসান চৌধুরী ‘মহিন শাহের পদাবলি’ সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা করে একজন প্রকৃত গুণীর কাজের যে স্বীকৃতি ও মূল্য দিয়েছেন, তা এককথায় তুলনারহিত। এই বই প্রকাশের সঙ্গেও আমার সম্পর্ক ও যোগ ছিল, সে কথা সানন্দে স্মরণ করি।

বাংলা একাডেমির ফোকলোর-টিম নিয়ে ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজ করতে গিয়ে আবুল আহসান চৌধুরীর যে সহযোগিতা পেয়েছি, তার কথাও উল্লেখ করতে হয়। আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আত্মনিবেদিত গবেষক হিসেবে আবুল আহসান চৌধুরী ইতোমধ্যে সবার শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

এসআর