আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আগুন নিয়ন্ত্রণে

আগের সংবাদ

আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকানোর ক্ষমতা নেই ইসির

পরের সংবাদ

মধু কবির ভক্তরা ক্ষুব্ধ

‘মধুপল্লী’ উন্নয়নের কোটি টাকা ফেরত!

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২০ , ৮:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২০ , ১০:৪৯ অপরাহ্ণ

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের তীরের কেশবপুরের সাগরদাঁড়ির দত্তবাড়ির প্রাচীন নিদর্শনগুলো দীর্ঘ ২০ বছরেও পুনঃসংস্কার করা হয়নি। ঐতিহাসিক বাড়িটির জানালা, দরজা, সংরক্ষিত আসবাবপত্রগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে ছোট-বড় ৫টি স্থাপনা, মন্দির ও পুকুরঘাট সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে, অতিথিদের বিশ্রামের জন্যে নির্মিত ডাক বাংলোটি এক যুগ আগে ভেঙে ফেলা হলেও তা দীর্ঘদিনেও নির্মিত হয়নি। এরপরও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় কবির জন্মস্থান সাগরদাঁড়িতে পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানসমূহের জন্যে ট্যুরিজম বোর্ডের বরাদ্দ করা এক কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ না হওয়ায় ফেরত গেছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। ফলে মধুপল্লী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ভক্তদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকাব্যের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি (বাংলা ১২ মাঘ) যশোরের কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদ সংলগ্ন সাগরদাঁড়ী গ্রামের ঐতিহ্যবাহি দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রাজ নারায়ন দত্ত, মা জাহ্নবী দেবী। শিক্ষা জীবনে মধুসূদন গ্রিক, ফার্সি, জার্মান, ল্যাটিন, সংস্কৃত ভাষাসহ বহুভাষা রপ্ত করেন।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’। এ ছাড়া রচনা করেন কাব্য ‘তিলোত্তমা সম্ভব, ‘ব্রজাঙ্গনা’ ‘বীরঙ্গনা’ চতুদর্শপদী কবিতাবলী, নীতিমূলক কবিতা, নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ‘পদ্মাবর্তী’ ‘কৃষ্ণ কুমারী’ ‘মায়া কানন’, প্রহসন ‘বুড়োশালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ‘একেই কি বলে সভ্যতা’, উপকথা-রসাল স্বর্ণ লতিকা, অশ্ব ও কুরঙ্গ, কুক্কট ও মনি, মেঘ ও চাতক, সিংহ ও মশকী। ব্যাঙ্গ রচনা- রোগ শয্যায়, দুর্যোধনের মৃত্যু। ইংরেজি রচনাবলী-দি ক্যাপটিভ লেডি প্রভূতি মধুসূদনের অমর সাহিত্য কর্ম। এ কবি ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় মারা যান।

কেশবপুর সদর থেকে সাগরদাঁড়ির দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। পিচের রাস্তা হলেও প্রায় এক যুগ সংস্কার না হওয়ায় খানা-খন্দের কারণে যাতায়াত করতে গিয়ে মধুভক্তদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মধুকবির জমিদার বাড়িটি চার একর ৩৩ শতক জমির ওপর অবস্থিত। ১৮৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার ভক্তদের থাকার জন্যে চারশয্যা বিশিষ্ট রেস্টহাউজ বানিয়েছিল। এরই একটি রুমে বানানো হয় পাঠাগার। ১৯৬৬ সালে কবির বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে সরকার ন্যস্ত করে। কবির জন্মস্থান খ্যাত ঘরটি এখন আর নেই। কবির বাড়ি সংলগ্ন আবক্ষ মূর্তিটি কলকাতার সেন্ট্রল কো-অপারেটিভ ব্যাংক স্থাপন করে দেয়।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জমিদার বাড়ি, পুকুর পুনঃসংস্কারসহ পুরো এলাকাটি পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলে। যে বজরায় কপোতাক্ষ নদীর কুলে কবি সস্ত্রীক সাতদিন অবস্থান করেছিলেন, সেখানে একটি পাথরে খোদাই করে লেখা আছে ‘শতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে’। এই জায়গাটি বিদায় ঘাট নামে খ্যাত। ১৯৯৮ সালে এর পুনঃসংস্কার কাজ শুরু হয়। ২০০১ সালে শেষ হয়। এরপর আর সংস্কার হয়নি। দীর্ঘদিনেও দত্তবাড়ি, মন্দিরসহ প্রাচীন নিদর্শনগুলো পুনঃসংস্কার না হওয়ায় এর জানালা, দরজা ভেঙে যাচ্ছে। ছাদেও ফাটল ধরেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত আসবাবপত্রগুলো। ছোট-বড় ৫টি স্থাপনা, মন্দির ও পুকুর ঘাট এ মুহূর্তে সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মধুপল্লীর জায়গা স্বল্পতার কারণে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাসহ পিকনিক কর্নার নেই। স্যুভিনির সপ, ক্যাফেটোরিয়া, পিকনিক পার্টির জন্য ভালোমানের টয়লেট, ফ্যাসেলিটি, দর্শনার্থীদের বসার জন্যে চেয়ার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও বিশ্রামাগারও নেই।

এদিকে, মধুমেলায় আগত ভিআইপদের বিশ্রামের জন্যে নির্মিত ডাকবাংলোটি ২০০৬ সালে ভেঙে ফেলা হলেও তা নির্মাণ করা হয়নি আজও। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আগত অতিথিদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সাগরদাঁড়িতে প্রচুর দর্শনার্থীদের সমাগত ঘটে থাকে। গেল বছরের ১০ জুন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড থেকে সাগরদাঁড়ির পর্যটনের উন্নয়নে এক কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। মহাকবির আধুনিক ভাস্কর্য, সমাধিলিপি প্রতিস্থাপন, অনশনস্থলে কাঠ বাদাম গাছের শ্রীবৃদ্ধি, বিখ্যাত কবিতা অবলম্বনে টেরাকোটা দিয়ে কাহিনি চিত্র ওয়াল ও ওয়াশ ব্লক নির্মাণের জন্যে ওই বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে প্রশাসনের অবহেলার কারণে সমুদয় অর্থই ফেরৎ গেছে। মধুপল্লী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছের ভক্তরা। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে এই মুহূর্তে কবির বাসগৃহসহ ৫টি ভবন সংস্কার, স্যাঁতস্যাঁতেভাব দূরীকরণে রঙ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাগরদাঁড়ির মধুপল্লী সংলগ্ন বেহাল সড়ক। ছবি: প্রতিনিধি।

‘সাগরদাঁড়িতে মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় চাই’ এই আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট আবুবকর সিদ্দিকী বলেন, মধুকবির জন্ম সাগরদাঁড়িতে হলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ফ্রান্স ও ভারতে। তাই তিনি শুধু বাংলাদেশের কবি নন। আন্তর্জাতিকভাবে তাকে তুলে ধরার জন্যে সাগরদাঁড়িতে মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

প্রতিবছর শীতের আগমনের শুরুতে কবির প্রতি জাগে ভক্তদের ভালোবাসা। তাই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পর্যটকদের আগমন ঘটে থাকে। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সাগরদাঁড়িতে বসছে সাতদিনব্যাপী মধুমেলা। প্রতিদিন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা সাগরদাঁড়িতে আসছে বনভোজনে। ফলে মুখরিত হয়ে উঠতে শুরু করেছে মধুকবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মধুপল্লীর দত্তবাড়ির দায়িত্বে থাকা কাস্টডিয়ান ফজলুল করিম জানান, মধুমেলায় প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে থাকে। এতে বছরে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকার রাজস্ব আয় হয়। নানা সমস্যার কারণে পর্যটকরা এখানে আসতে আগ্রহী হয় না। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে।

কাস্টডিয়ান ফজলুল বলেন, তবে মধুপল্লীতে ইতোমধ্যে ছাদ বাগান ও পাখির বাসা স্থাপন করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে মাই কবিতা পাথরগুলোর পাশে স্থাপনসহ ‘সময় রেখা’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর জীবনী সংম্বলিত প্লাকার্ড বসানো হয়েছে।

এনএম

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়