তাপসের আসন শূন্য ঘোষণা

আগের সংবাদ

ইরানের সঙ্গে বিনা শর্তে আলোচনায় রাজি ট্রাম্প

পরের সংবাদ

একজন নিষ্ঠাবান গবেষক

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ৯, ২০২০ , ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন আবুল আহসান চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মীর মশাররফ হোসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ তার কর্মস্থল হতে পারতো।

জীবনের ক্ষেতে শস্য ফলানোর দায়ভার যিনি গ্রহণ করেন তাকে যাপন করতে হয় নিরলস কর্মিষ্ঠ জীবন। বাংলাদেশের সাহিত্য-গবেষণার ক্ষেত্রে তেমনি এক দারুণ সৃষ্টিপ্রবণ কর্মী পুরুষ হলেন ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি ৬৭ বছরে পদার্পণ করেছেন, তার বইয়ের সংখ্যাপ্রায় ১১৫। এর চেয়ে সুন্দর সম্মিলন আর কী হতে পারে। বাংলাদেশের খ্যাতিমান গবেষক ও লেখক আবুল আহসান চৌধুরী জীবনের এক চমৎকার সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন। নিশ্চয়ই তিনি আরো লিখবেন, আরো গবেষণা করবেন, আরো বহু পথ তিনি সফলভাবে অতিক্রম করবেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন আবুল আহসান চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মীর মশাররফ হোসেনের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ তার কর্মস্থল হতে পারতো, কিন্তু তিনি রয়ে গেলেন কুষ্টিয়াতে, প্রথমে সরকারি কলেজে, পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অতি অল্প বয়সেই আবুল আহসান চৌধুরী সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর রাখেন। শুরুতেই এক উজ্জীবিত তরুণ কবি তিনি। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আবুল আহসান চৌধুরীও অংশগ্রহণ করেন এবং কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন দেশপ্রেমের উদ্দীপনার কাব্য ‘স্বদেশ আমার বাঙলা’। ব্যক্তিজীবনের ব্যথা ও বেদনার কাব্য ‘নীলকণ্ঠ জীবন তুমি’ প্রকাশ পায় উনিশশ পঁচাত্তরে; তখনো আবুল আহসান চৌধুরীর ছাত্রত্ব ঘোচেনি। কবি আবুল আহসান চৌধুরীর এ দুটি মাত্র কাব্যফসল। এরপর আবুল আহসান চৌধুরী কবিতার জগৎ থেকে অনেকটা সরে আসেন এবং পূর্ণভাবে নিয়োজিত হন গবেষণামূলক অনুসন্ধিৎসা ও লেখালেখিতে এবং সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কর্মজীবনের পরিচয় তুলে ধরার কাজে। বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার দিক উন্মোচিত হওয়ার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। এটি উপলব্ধি করে আবুল আহসান চৌধুরী তার সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার বিষয় বেছে নেন। তবে চিন্তা-চেতনায় আবুল আহসান চৌধুরী সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। তার গবেষণায় এই বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। নিষ্ঠাবান গবেষক তিনি। তরুণ বয়সে ছাত্রজীবনে কুষ্টিয়ার বাউলসাধক নামে গ্রন্থ রচনা করে তিনি গবেষক হয়ে ওঠার শুভ সূচনা করেন।

কুষ্টিয়া আবুল আহসান চৌধুরীর জন্মস্থান, এখানেই তিনি বড় হয়েছেন এবং এটিই তার কর্মস্থল। কুষ্টিয়া বাংলা সাহিত্যের বহু কীর্তিমানের জন্মভ‚মি। এখানেই জন্ম নিয়েছেন গ্রামবার্তা প্রকাশিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ, বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন, সুসাহিত্যিক জলধর সেন, আধুনিক বাংলা ছোট গল্পশিল্পী জগদীশ গুপ্ত এবং আরো বহুজন। কুষ্টিয়া রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য আর বাউলসাধক চূড়ামণি লালন শাহের মরমী সাধনার মূল ভ‚মি। আবুল আহসান চৌধুরী কুষ্টিয়ার এই সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্যের আবহে তার মন-মানস গড়ে তোলেন এবং শিক্ষাজীবন শেষে অধ্যাপনাকালে কুষ্টিয়ার সাহিত্য সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে লিখতে তাগিদ অনুভব করেন। সাফল্য দেখলাম নানা রচনায়- কোনটি গুরুতর গবেষণাকর্ম, কোনটি বিশ্লেষণমূলক আলোচনা, কোনটি জীবনকথা এবং বেশ কিছু সম্পাদিত রচনা। তিনি লিখেছেন কুষ্টিয়ার ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে, সম্পাদনা করেছেন কুষ্টিয়ার পাবলিক লাইব্রেরির প্লাটিনাম জুবিলির স্মারকগ্রন্থ, উচ্চতর গবেষণা করেছেন কুষ্টিয়ার সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের ওপর; মীরের সঙ্গীত লহরী, টালা অভিনয়, মুসলমানের বাংলা শিক্ষা ও নাট্য রচনাবলির সম্পাদনাও করেছেন। কুষ্টিয়ার বাউলসাধক বিশেষ করে লালন সাঁইকে নিয়ে তার একাধিক গ্রন্থ আছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য জীবনীগ্রন্থও রয়েছে। মনে হয় বাংলার মরমী সাধনা ও লোক ঐতিহ্যের মানবিক মহিমা আবুল আহসান চৌধুরীকে আপ্লুত করেছে এবং এর প্রকাশ নিশ্চয়ই মহিন শাহের পদাবলি সংকলন, হাসন রাজাকে নিয়ে আলোচনা এবং হাসন রাজার রচনার সম্পাদনা, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের স্মারকগ্রন্থ প্রণয়ন এবং আব্বাসউদ্দিনকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা। ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের জীবনী রচনা, তাকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রণয়ন এবং তার নির্বাচিত রচনার সংকলন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর সুন্দর কাজ। কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া সাহিত্যিক জলধর সেন ও জগদীশ গুপ্তের জীবনীও তাঁর রচনা। আবুল আহসান চৌধুরীর সাহিত্য-গবেষণায় ও লেখালেখিতে স্থানিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কুষ্টিয়ার যেসব লেখক ও সাধকদের নিয়ে তিনি লিখেছেন তারা বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনে বিচরণ করেন। এর বাইরেও আবুল আহসান চৌধুরীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। তিনি ভাষা-আন্দোলনের দলিল সংগ্রহ করেছেন। কিছু বিরল সাহিত্য-উপকরণ ও আত্মকথার সঙ্গে পাঠকের সংযোগ ঘটিয়েছেন, যেমন কাজী আবদুল ওদুদের পত্রাবলি, রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত পত্রাবলি এবং বিখ্যাত গায়ক কে. মল্লিকের অপ্রকাশিত আত্মকথা।

অন্যদিকে বাংলা একাডেমির জীবনী সিরিজের লেখকদের অন্যতম আবুল আহসান চৌধুরী, হয়তো প্রধানও। এক ডজনেরও অধিক সাহিত্যিকের প্রামাণ্য জীবনী তিনিই রচনা করেছেন এবং এগুলোর মধ্যে কুষ্টিয়ার লেখকের বাইরে অন্যরাও আছেন। বাংলা সাহিত্যের দুই প্রথিতযশা একজন নিষ্ঠাবান গবেষক সাহিত্যিকের রচনাবলি সম্পাদনা আবুল আহসান চৌধুরীর সুকীর্তি। তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলির তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড এবং আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ রচনাবলির প্রথম খণ্ড। নিশ্চয়ই তিনি পরবর্তী খণ্ডলোও সম্পাদনা করবেন। সন্দেহ নেই, সংকলন, সম্পাদনা ও জীবনী রচনায় আবুল আহসান চৌধুরীর পারদর্শিতা ও প্রযত্ন দুই-ই হয়েছে, না হলে বাংলা একাডেমি তার ওপর এত দায়িত্ব চাপাতো না। উল্লেখ্য, আবুল আহসান চৌধুরীর বেশির ভাগ গ্রন্থই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত। আবুল আহসান চৌধুরী বাংলাদেশের সাহিত্য-গবেষণায় ও সম্পাদনায় তার স্থান করে নিয়েছেন।

এসআর