সেতু ভেঙে উত্তরের ৯ জেলার যোগাযোগ বিপর্যস্ত

আগের সংবাদ

তারাকান্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩

পরের সংবাদ

মৌসুমের শুরুতেই উত্তরাঞ্চলে শৈতপ্রবাহ

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯ , ১:৫১ অপরাহ্ণ

শীত জেঁকে বসেছে উত্তরাঞ্চলে। ঘন কুয়াশা আর সেই সঙ্গে হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে জনজীবন। গত চারদিনে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। মাঝ রাত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশার সঙ্গে বইছে হিমেল হাওয়া। বৃষ্টির মতো ঝরে শিশির। হঠাৎ করেই শীতের তীব্রতা বাড়ায় গরম কাপড়ের দোকানে ভিড় করছেন শীতার্তরা। তারা বেশি ভিড় করেছেন ফুটপাতের পুরনো কাপড়ের দোকানে। নিজেদের সাধ্যমতো কিনছেন শীতবস্ত্র।

এদিকে কুয়াশা বাড়ায় নিতান্তই প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ। আর সন্ধ্যা নামতে না নামতেই গুটিয়ে যাচ্ছে হাট বাজার, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলের দোকানপাট। সকালে স্কুলগামী শিশু এবং বৃদ্ধদের কষ্ট বেড়েছে দ্বিগুণ। সারাদিন সূর্যের দেখা না মেলায় গরম কাপড় জড়িয়েই কাজে যোগ দিতে হচ্ছে সবাইকে। এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন।

কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামে দুপুরে ঘণ্টা খানেকের জন্য সূর্যের দেখা মিললেও উত্তাপ কম। ২টার পর আবার হারিয়ে যায় সূর্য। ফলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এখন নাকাল কুড়িগ্রামের মানুষ। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা। শিশু ও বয়স্করাও পড়েছেন দুর্ভোগে। পাশাপাশি গবাদিপশুও রেহাই পাচ্ছে না এ থেকে।

এদিকে হঠাৎ করেই শীতের তীব্রতা বাড়ায় গরম কাপড়ের দোকানে ভিড় করছেন শীতার্তরা। তারা বেশি ভিড় করেছেন ফুটপাতের পুরনো কাপড়ের দোকানে। নিজেদের সাধ্যমতো কিনছেন শীতবস্ত্র।

নাগেশ্বরীতে ফুটপাতের দোকানে আসা এমনই একজন নারায়ণপুর ইউনিয়নের মুকুল মিয়া। জানান, কয়েকদিন ধরে শীত বাড়ায় পরিবারের জন্য গরম কাপড় কিনতে এসেছেন। রিকশাচালক মোতাহার আলী জানান, ঘন কুয়াশা এবং ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে সময়মতো রাস্তায় বের হতে পারছেন না।

সোনাহাট স্থলবন্দরের শ্রমিক হাসেম আলী, আবদুল করিম জানান, সকাল ৮টায় পাথর ভাঙার কাজে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও কুয়াশার কারণে এক ঘণ্টা পিছিয়ে যায় কাজ। ফলে আয় কমেছে।

কুড়িগ্রামে বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেলা আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র পর্যবেক্ষক জাকির হোসেন জানান, আগামী শুক্রবারের পর তাপমাত্রা আরো কমবে এবং শুরু হবে শৈত্যপ্রবাহ।

এদিকে শীতের কারণে বাড়ছে ঠাণ্ডা জনিত রোগের প্রকোপ। কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শাহিনুর সরদার শিপন জানান, ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কিছু কিছু রোগী আসছেন। তবে শীতের প্রভাব এখনো তেমন শুরু হয়নি।

জেলা ত্রাণ শাখা থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৫১ হাজার ৫১৪টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জানান, শীত মোকাবেলায় তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

পঞ্চগড়: রাত ও ভোরে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এলেও দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত তা গিয়ে দাঁড়ায় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এখন বিকেল গড়াতেই এ জেলায় তাপমাত্রা কমতে থাকে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত হালকা কুয়াশার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরে হিমালয় থেকে ভেসে আসে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস। রাতে পথঘাটে কুয়াশার জন্য যানবাহন চলতে সমস্যা হয়। উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে গা হিম হয়ে আসে। টুপ টুপ করে রাতভর চলে কুয়াশাপাত। লেপ ও কম্বল ছাড়া ঘুমানো যায় না।

আবার সকাল ৮টার পর থেকেই কুয়াশা কেটে যায় তবে কোনো কোনো দিন বেলা ১১টার আগে সূর্যের দেখা মেলে না। কিন্তু রাত থেকে সকাল পর্যন্ত অসম্ভব ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে ঠাণ্ডার প্রকোপ বেশি। এই সময়টিতে নিম্ন আয়ের মানুষদের শীত নিবারণ করতে কষ্ট হয়। অনেকেই রাত কিংবা ভোরে খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নেন। এছাড়া শীতের প্রকোপ বাড়তে শুরু করায় জেলার হাসপাতালগুলোতে দিন দিন শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

এদিকে দরিদ্র শীতার্তদের জন্য প্রথম দফায় প্রায় ২১ হাজার শীতবস্ত্র পঞ্চগড়ের পাঁচটি উপজেলার মাধ্যমে বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। শীতের কারণে চা শ্রমিক, পাথর শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমিকরা ঠিকভাবে কাজে যেতে পারছে না। অভিযোগ উঠেছে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের শীতার্ত মানুষেরা সরকারি শীতবস্ত্র ঠিকভাবে পাচ্ছেন না। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শীতার্ত মানুষ সরকারি শীতবস্ত্র সুষ্ঠুভাবে বিতরণের দাবি জানিয়েছে। বেসরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

দিনাজপুর: দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান জানান, গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯১ শতাংশ। বিকেল সাড়ে ৪টায় সর্বচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৭৮ শতাংশ। গত মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।

সূত্রটি জানায়, ঘন কুয়াশা ও মেঘলা আকাশ দিনব্যাপী থাকার কারণে শীতের তীব্রতা অনুভব করা গেছে। হঠাৎ করেই উত্তরের জনপদ দিনাজপুর জেলায় শীতের প্রকট বেড়ে যাওয়ায় বৃদ্ধ ও শিশুদের শীতজনিত রোগের প্রভাব বেড়ে গেছে। বুধবার সকাল থেকেই সূর্যের আলো দিনব্যাপী দেখা যায়নি। নিম্ন আয়ের মানুষ শীতের কারণে কাজে যেতে পারেনি। ঘন কুয়াশা থাকায় দিনাজপুর থেকে ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাগুলোতে যানবাহনের চলাচল দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে।

আবহাওয়া সূত্র জানায়, আগামী ২০ ডিসেম্বরের পর থেকে তাপমাত্রা আরো নিচে নেমে আশার সম্ভাবনা রয়েছে। তাপমাত্রা নেমে গেলে এ অঞ্চলে মৃদ শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতে পারে। আগাম শীতের প্রস্তুতি হিসেবে আবহাওয়ার সর্বশেষ অবস্থান সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম জানান, শীতের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৫১ হাজার ৬০০ এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ১৫ হাজার ৫২০ পিসসহ মোট ৬৭ হাজার ১২০ পিস কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত কম্বল গতকাল বুধবার সকাল থেকে জেলার ১৩টি উপজেলার ১০৩টি ইউনিয়ন এবং ৯টি পৌরসভায় ৪৬০ পিস করে কম্বল বিতরণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি জেলার বিত্তবান, ব্যবসায়ীসহ সব মহলকে দরিদ্র ও শীতার্ত জনসাধারণের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান জানান, বুধবার দুপুর ২টায় ১ লাখ পিস শীতবস্ত্রের চাহিদায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে ফ্যাক্স বার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। প্রেরিত বার্তায় ৫০ হাজার পিস কম্বল, ৩০ হাজার পিস শিশু পোশাক, ১০ হাজার পিস, সোয়েটার জ্যাকেট ও ১০ পিস শাড়ি-লুঙ্গির চাহিদা দেয়া হয়েছে।