মর্গে ১০ মরদেহ, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ

আগের সংবাদ

একাত্তরে ব্যবহার করা ৩৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার

পরের সংবাদ

মুক্তিযোদ্ধা বাবার গল্প

যদি রাত পোহালে শোনা যেত…

সাজেদা সুলতানা

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ , ৩:০১ অপরাহ্ণ

ছোটবেলায় দাদীর কাছে বাবার মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠার গল্প প্রথম শুনেছিলাম। দাদা-দাদীর একমাত্র ছেলে আমার বাবা। গাজীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে তার জন্ম। দাদী বলতেন ‘এক মেঘলা দিনে গ্রামের অন্য এক যুবকের সঙ্গে শেখ সাহেবের ডাকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে যুদ্ধে গিয়েছিল তোর বাবা।

যাওয়ার সময় পরিচিত একজনের কাছে হাতঘড়ি, সখের সাইকেল আর একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। চিঠিতে লেখাছিল ‘প্রিয় নেতা শেখ মুজিব দেশকে স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। যদি বেঁচে থাকি স্বাধীন দেশে আবার দেখা হবে। আপনার অনুমতি না নিয়েই চলে যেতে হচ্ছে মা, এজন্য আমায় ক্ষমা করে দিবেন’।

আমরা ভাই-বোনেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি দাদীর কথা। লক্ষ্য করছি, আমার বাবার কথা বলতে বলতে দাদীর চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে দাদী সেই একাত্তরে চলে গিয়েছেন। তারপর কী হলো? জিজ্ঞাসা করতেই দাদীর ধ্যান ভাঙলো।

দাদী বলতেন ‘বংশের প্রদীপ যুদ্ধে গেছে। জান নিয়ে ফিরে আসবে কিনা জানতাম না। লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক কেঁদেছি। যাতে কেউ বুঝতে না পারে। গ্রামেই ছিল পাকবাহিনীর দোসর রাজাকার-আলবদরের আস্তানা। কেউ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে জানতে পারলে সেই পরিবারের ওপর চলতো নির্যাতন। জ্বালিয়ে দেয়া হতো ঘর-বাড়ি।’

মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে গর্ব হয় না? জিজ্ঞাসা করলেই দাদী সহাস্য বলতেন, ‘হ্যাঁ তাতো হয়ই, খুব গর্ব হয়। পরক্ষণেই দাদীর মুখে কালো ছায়া। বললো, রাজাকারেরা যে কত যন্ত্রণা করেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। একবার পাকবাহিনী আমাদের গ্রামে হানা দিয়েছিল। এক মুক্তিযোদ্ধার ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছিল।

রাজাকার-আল বদর-আল শাসমদের সহযোগিতায় গ্রামের তরুণী মেয়ে ও বউদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যেত। তাদের ওপর চলতো অবর্ণনীয় নির্যাতন। পাকবাহিনী যখন গ্রামে আসতো ভয়ে গ্রামের সব মহিলা পুকুরের পানিতে লুকিয়ে থাকতো। মানুষ খেয়ে না খেয়ে ভয়ে আতঙ্কে দিন পার করেছে। একদিকে পাকবাহিনীর ভয়, আরেকদিকে ছিলো রাজাকারদের অত্যাচার।

যুদ্ধ থেকে বাবা ফিরে আসাতে কেমন লেগেছিল? এ প্রশ্ন করতেই দাদী বলতেন, ‘যখন লোকমুখে খবর পেয়েছি পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, তারপর থেকে শঙ্কা ও প্রতীক্ষায় দীর্ঘ সময় পার করেছি। তোদের বাবা যেদিন বাড়ি ফিরলো সেদিন ছিলো আমাদের জন্য ঈদের মতো মহা-আন্দন্দের এক দিন। দাদী বলেই চললেন, তোদের বাবা বেঁচে না থাকলে আজ হয়তো এই পরিবারের প্রসার হতো না।

সেই একই গল্প ছোটবেলা আমরা বারবারই শুনতে চাইতাম। দাদীও শুনাতেন বার বার। যেন যুদ্ধদিনের সেসব গল্পের মধ্যে অনেক স্মৃতি ধরে রাখতেন। আমরা সবাই খুব উপভোগ করতাম। আর এদিকে, বাবাকে যুদ্ধে যাওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে হতো না। বাবা পরম আগ্রহ নিয়ে আমাদের শোনাতেন যুদ্ধদিনের গল্প।

এখনও খাওয়ার টেবিলে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা নিপীড়িত তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনগণ আর দামাল ছেলেরা ৭০ এর নির্বাচনের পর থেকেই যুদ্ধের জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকে। সন্ধ্যার পর গ্রামের মুক্তিকামী যুবকেরা একত্রিত হয়ে রেডিও শুনতো।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্সে ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন। জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন। একাত্তরের জুন মাসের দিকে বাবা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়ি থেকে পালাবার। তারপর ২০ জনের একটি দলের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। সেখানে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তিনমাস।

যখন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে থাকতেন, তখন রাতে ও দুপুরে দুবেলা নামমাত্র খাবার সরবরাহ করা হতো। বাকি সময় কারো ক্ষুধা লাগলে শুকনো খাবার, চিড়া-মুড়ি, গুড় ইত্যাদি কিনে খেতে হতো। টাকা পয়সা ছিল না বলে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে ২নং সেক্টরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

একবার সম্মুখযুদ্ধে দলের দুজনকে শহীদ হতে দেখেছেন। দলনেতার নির্দেশে প্রায়ই থাকার জায়গা বদল করতে হতো। তখন পাকিস্তানি দোসর রাজাকারবাহিনীও তৎপর ছিলো। মুক্তিবাহিনীর খবর পেলেই পাকক্যাম্পে খবর চলে যেতো। ধরে নিয়ে গিয়ে নৃসংশভাবে হত্যা করা হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুইবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন আমার বাবা। নয় মাস যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বিজয় ঘোষণার পর বাবা তার খালার বাড়িতে গর্ত খুঁড়ে অস্ত্রগুলি রেখে এসেছিলো। পরবর্তীতে যেগুলি সরকারের নির্দেশে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা করেছেন।

বাবা বলতেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের উন্নয়নে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠমো ও কুটির শিল্প উন্নয়নে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকারি অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি বিশ্বাসও করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এদেশের জনগণ তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না।

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির যে নিরাপত্তা বলয়ের প্রয়োজন ছিল তিনি সেটার প্রয়োজন বোধ করেন নি। কিন্তু কতিপয় ক্ষমতালিপ্সু বেইমান বাঙালি সেনাকর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে ট্যাংক দিয়ে জাতির পিতার ধানমন্ডির বাসভবন ঘিরে ফেলে। বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবার ও ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করে ইতিহাসের এক কলংকিত অধ্যায় তৈরি করে। আমরা হারাই আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। বিদেশে থাকার ফলে ভাগ্যগুনে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বেঁচে যান।

বাবা বলতেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর রাজাকার ও এদেশের পাকিস্তানি আনুসারীরা আবার তৎপর হয়ে উঠে। বাবাও ভয়ে ভয়ে থাকতেন। সেই সময়ে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিলো যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কেউ আলোচনা করার সাহস পেত না। শত্রুরা ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার নীল নকশা তৈরি করেছিলো। বাবা বলতেন, সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার ছিল সেটাই যখন ১৯৭৫ সালের পর রাজাকার বাহিনীর কেউ কেউ মন্ত্রী হয়ে দেশের পতাকা বহনকারী গাড়িতে চড়ে বেড়াতো।

মুক্তিযোদ্ধা বাবা এখনও বেঁচে আছেন। ছুটিতে বাড়িতে গেলে এখনও বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়। মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় প্রজন্ম আমাদের ছেলে-মেয়েরাও বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনে বড় হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু আমাদের পরমাত্মীয়, আমাদের আদর্শ। বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম, একটি চেতনার নাম। এই চেতনা, এই আর্দশ যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাবে। এখনো ভালো লাগে যখন দেখি মেয়ে গুণ গুণ করে গায়-

‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত
বঙ্গবন্ধু মরে নাই—
তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা,
আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা’।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ, এনিম্যাল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

এনএম