জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি কালীগঞ্জের মাহফুজুর রহমান

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

পরের সংবাদ

আমাদের পরম পাওয়া স্বাধীনতা

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯ , ৯:০৯ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ , ৮:০৪ অপরাহ্ণ

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। পূর্ণ হলো স্বাধীনতার ৪৮ বছর। এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে সর্বোচ্চ গৌরবের একটি অবিস্মরণীয় দিন। আজকের এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে উদিত হয় নতুন একটি সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ। যা বাঙালি জাতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিশ্বপরিমণ্ডলে।
৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা। দেখেছে অসংখ্য নিপীড়িতের আর্তনাদ, ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি, বাস্তুহারা অগুনিতের হাহাকার ও ধ্বংসলীলা। ঔপনিবেশিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি হাঁপিয়ে উঠেছিল। দুঃশাসন, অত্যাচার, বৈষম্য, নিষ্পেষণ বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। তারা মুক্তির স্বাদ আস্বাদনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। যার ফলে এই ভূখণ্ডে এক পুনর্জাগরণের সূচনা হয়েছিল, যার আভাস আমরা ৪৮, ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯-এর আন্দোলনে দেখতে পাই। সে পুনর্জাগরণে যোগ দিয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতা। এসব আন্দোলন ছিল কখনো মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, কখনো ছাত্রদের বিজ্ঞানভিত্তিক- সর্বজনীন শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, কখনো বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার তথা স্বায়ত্তশাসন আদায়ের জন্য সংগ্রাম। কখনোবা সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, কখনো অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম। এই পুরো সময়জুড়ে বাংলার মানুষ জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদিয়কতা, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে।
মূলত বাঙালি জাতি নিষ্পেষিত ছিল বহু আগে থেকেই। ব্রিটিশ শাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বে কোনোকালেই বাঙালি জাতি তার স্বাধীন চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেনি। সমস্যা ছিল নেতৃত্বের সংকট। কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় সংকটের সমাধান করতে পারেনি। নিষ্পেষণের ইতিহাসের ক্রান্তিকাল রচনা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর কিশোর জীবন থেকে পরিণত জীবনে পদার্পণ এ যেন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলন তার কিশোর জীবন থেকে পরিণতিতে পৌঁছেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে।
আজকের দিনে বাঙালি জাতিকে সবচেয়ে যে বিষয়টি অনুপ্রাণিত করেছে সেটি হচ্ছে ইউনেস্কো স্বীকৃত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত এতদঞ্চলের মানুষ একটি ভাষণ শুনেছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা দল মত নির্বিশেষে পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি তখন জেনেভায়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বান সাড়া দিয়ে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি। যুদ্ধচলাকালীন ৯ মাস জেনেভায় পলিটিক্যাল রিফিউজি ছিলাম। আমরা বহির্বিশ্বের সঙ্গে ক‚টনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরির প্রচেষ্টায় ছিলাম। মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হতো।
সাধারণত ক‚টনীতিকরা যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন না। কিন্তু হাজার মাইল দূরে বসেও আমরা হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালি ক‚টনীতিক ক‚টনৈতিক ফ্রন্টে পাকিস্তানিদের মোকাবেলা করেছিলাম। বিদেশেও আমাদের নিরাপত্তার সংকট তৈরি হয়েছিল। আমরা ভালো করেই জানতাম, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যে কোনো সময় আমাদের দেশে থাকা মা-বাবা, ভাই-বোনদের ওপর অত্যাচার করতে পারে ও মেরে ফেলতে পারে। তবুও আমরা সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও ক‚টনৈতিক পরিমণ্ডলে আমাদের ক‚টনীতিকদের একযোগে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে ও সেসব দেশের প্রশাসনের ওপর বিরাট চাপও সৃষ্টি করে। অন্যদিকে তাদের এ প্রয়াস আমাদের যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে।
সে সময় মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং বাংলাদেশের জন্য।

সাহায্য চেয়েছি। তখন সব দেশে যেতে ভিসা লাগতো কিন্তু আমার যে রিফিউজি ডকুমেন্ট ছিল সে ডকুমেন্ট নিয়ে আমি ভিসা ছাড়া ঘুরেছি কোনো অসুবিধা হয়নি। যখন তারা শুনেছে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রিপ্রেজেন্টেটিভ তখনই তারা একটি শব্দ উচ্চারণ করতো, ‘আচ্ছা আপনি যান’ ফরাসি ভাষায় বলতো ‘আলেজি’। তারা বলতো ‘আপনি শেখ মুজিবের রিপ্রেজেন্টেটিভ, আপনার কোনো ভিসা লাগবে না’। এ মুজিব স্ফুলিঙ্গ সমস্ত ইউরোপকে আচ্ছন্ন করেছিল।
৯ মাসে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হলো পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল। কিন্তু এর পেছনেও অনেক গল্প ছিল, ছিল অনেক বিশ্ব রাজনৈতিক চাল। আমরা সেগুলোকে কিছু বন্ধু রাষ্ট্র বিশেষ করে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় মোকাবেলা করতে সক্ষম না হলে আরো কত প্রাণ বিসর্জন দিতে হতো তা কে জানে? ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বেও এ প্রশ্ন ছিল অমীমাংসিত। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল এবং সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছিল যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়।
১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মিটিং চলছিল। আমাদের সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। জেনেভা থেকে আমি, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শাহ এম এস কিবরিয়া এবং নিউইয়র্ক থেকে এস এ করিম সেখানে সার্বক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান করছিলাম। জেনেভা থেকে পূর্ণেন্দু কুমার ব্যানার্জি, সুইস রাজধানী বার্ন থেকে এ আর ভাইস মার্শাল সার্বক্ষণিকভাবে আমাকে দিল্লি ও মিস গান্ধীর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের খবরাখবর দিয়ে যাচ্ছিলেন। মুজিবনগর সরকার আমাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি কিছুক্ষণ পর পর বিবৃত করছিল। আমাদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করা ও বাংলাদেশে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মিটিং চলমান রাখতে সহায়তা করা যাতে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারে। তৎকালীন ভারতীয় প্রতিনিধি সরদার স্বরণ সিং বক্তৃতা দিলেন। রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্ড্রে গ্রোমিকোও বক্তব্য রাখলেন। এরপর স্থায়ী কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে টানা ৬ ঘণ্টা বক্তব্য রাখলেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত মালেক। ফলে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগেই পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় ও বিজয় নিশ্চিত হয়। আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বসে উদযাপন করছি মহান স্বাধীনতার স্বাদ। সবুজ বাতাসে বুক ভরা নিঃশ্বাস নিয়ে অনুভব করছি বাংলার মাটির মমতা। এ আমাদের পরম পাওয়া, পরম স্বাধীনতা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়