স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

আগের সংবাদ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

পরের সংবাদ

সুরবালা

রফিকুল নাজিম

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

চা বাগানের ৬নং লাইনে একটা লাশ পড়ে আছে। ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার লাশ। চা শ্রমিকরা হৈ হৈ রৈ রৈ করে সেদিকেই ছুটছে। পুরো বাগানে শোকের মাতম পড়েছে যেন। সুরবালা আর নেই। ঘাসের ওপর পড়ে আছে তার শূন্য খাঁচা। সুরবালার মুখের কাছে ভনভন করছে কয়েকটা মাছি। মুহূর্তেই বেশ লোকের জমায়েত হয়ে গেল। হরিদাসী একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল, ‘বুড়িটা মরেই বাঁচলো গো!’ নৃপেন কয়েক ঢোক চোলাইমদ পেটে চালান দিতে দিতে গান ধরল, ‘ওলো সই, তোর যা ছিল নিলাম কেড়ে/ওলো সই, আয় ঘর বানামু বাগান ছেড়ে।’ সকালের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আসছে পুলিশ, সাংবাদিক ও প্রশাসনের হর্তাকর্তারা। আজ শুধু সুরবালার দিন। একজন পুলিশ লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বার্ধক্যজনিত মৃত্যু। তবুও পোস্টমর্টেম করা জরুরি। তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। সুরবালা এই প্রথম চা বাগানটা পেছনে রেখে চলে যাচ্ছে। চা গাছগুলো কেমন নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আহা রে জীবন!

২.
২৬ মার্চ, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সেদিন অনেকে মায়ের আঁচল ছেড়ে ধরেছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। প্রেমিক তার হাতের ফুল ফেলে ধরেছিল এলএমজি। সেদিন কৃষক লাঙল ছেড়ে ধরেছিল স্টেনগান। সেদিন ছাত্ররাও কলম ছেড়ে হাতে নিয়েছিল বন্দুক। শিক্ষকের হাতেও ছিল চকের পরিবর্তে গ্রেনেড। সেদিন চা শ্রমিক সুসেনও দুটি পাতা একটি কুঁড়ি ফেলে হাতে তুলে নিয়েছিল অটোমেটেড রাইফেল। হ্যাঁ সুসেন বড়াই। ১৬ বছরের টগবগে কিশোর। প্রাণ চাঞ্চল্যে সুসেন যেন বন্য হরিণের মতন। যুদ্ধে যাওয়ার রাতে সুরবালার হাতে একটা চিরকুট দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সুসেন বলেছিল, ‘তুই পালারে সুরবালা। ওপারে চলে যা। ভোরে জলেশ্বরীরা যাবে। তুই চলে যাস।’ সেই রাতে সুরবালা কোনো মায়ার বন্ধনের উছিলায়, চোখের জলে আটকাতে পারেনি সুসেনকে। চোখের জলেই বিদায় দিয়েছিল তাকে। সেই রাতে সুসেন ৬নং লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল। সুরবালা সেই দৃশ্য একা দেখেছিল।

৩.
নভেম্বর, ১৯৭১। বাগানে ভটভট করে এগিয়ে এলো কয়েকটা জলপাই রংয়ের জিপগাড়ি। খাকি পোশাক পরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বড়বাবুর ডাকবাংলোয় স্থাপন করল ওদের ক্যাম্প। লেফট রাইট করতে করতে ওরা হাঁটে। ওদের খেদমতে জহির মোল্লা নিজেকে উৎসর্গ করেছে স্বর্গ পাওয়ার আশায়। বাগান প্রায় জনশূন্য। লাইনগুলোও ফাঁকা। চায়ের কচিপাতাগুলো বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে অযত্নে। সুরবালা ছোটবাবুর বাংলোয় টুকটাক কাজ করে। ঘর ঝাড়– দেয়। ধোয়ামোছা করে। ছোটবাবুর ঘরেই ঠাঁই হয়েছে মা-বাপহীন সুরবালার। ছোটবাবুর কাছেই বর্ণের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। সুরবালা গোপনে আড়ালে চিরকুটটা পড়ে আর একলা একা হাসে। এক সন্ধ্যায় ছোটবাবুর চায়ের নিমন্ত্রণ রাখতে মেজরসহ ৪-৫ জন সৈন্য এলো। চা পর্ব শেষ করে চলে যাওয়ার সময় কি জানি মনে করে মেজর সাব উনুনঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন সুরবালাকে। ১৩ বছরের সুরবালা। মেজর চিৎকার করে বলল, এহি খুব সুরুত লাড়কি হে।
সুরবালাকে টেনেহিঁচড়ে নিতে চাইলে ছোটবাবু পায়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল, হুজুর, এহি ছোটকা আদমি হে। ছোড় দো, হুজুর। মেজরের ইশারায় ছোটবাবুর বুকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করল অপর দুই সৈনিক। জোর করে জিপগাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সুরবালাকে। সদ্য জবাই করা মুরগির মতোই ভয়ে থরথর করে কাঁপছে আর কাঁদছে সুরবালা। তারপর সুরবালার ওই ছোট্ট শরীরের ওপর সারারাত চলল নির্যাতন। ক্ষতবিক্ষত যোনি থেকে ঝরল রক্ত। সেই রক্তে ভিজে গেল মাটি। বাগানের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হলো সুরবালার আর্তচিৎকার।
৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ক্যাম্পের এখানে-সেখানে কুকুরের মতো পাক হানাদারদের সারি সারি লাশ পড়ে আছে। অর্ধমৃত সুরবালা টলতে টলতে বের হয়ে আসে ক্যাম্প থেকে। তখনো থেমে থেমে গুলি হচ্ছিল। সুরবালা ৬নং লাইন ধরে পালাতে থাকে। হঠাৎ সামনেই দেখে একটা লাশ পড়ে আছে। লাশটা উল্টিয়ে দেখে। তারপরই সু…সে…ন… বলে প্রচ- এক চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় সুরবালা। তারপর থেকেই সে পাগল। অর্ধনগ্ন হয়ে সারা বাগান একা একা হাঁটতো। সবচেয়ে বেশি ৬নং লাইনে বসে বসে কাঁদতো আর বুক চাপড়াতো। আমৃত্যু সে আর কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেনি।

৪.
উপজেলা চত্বরে একটা কফিনে শুয়ে আছে সুরবালা। জাতির সবচেয়ে দামি জিনিসে আজ মোড়া সে। জাতীয় পতাকায় ঢাকা তার ৪৮ বছরের অর্ধনগ্ন শরীর। একজন বীরাঙ্গনাকে পুলিশ সদস্যরাও রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য প্রস্তুত। এদিকে প্রস্তুত ক্যামেরা হাতে টিভিওয়ালারা ও খবরের কাগজওয়ালারা। দামি দামি ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে চিৎকার করে উঠে সুরবালার আত্মা!

মাধবপুর, হবিগঞ্জ