সুরবালা

আগের সংবাদ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শিল্পকলার আয়োজন

পরের সংবাদ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ , ১০:২৩ অপরাহ্ণ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সকালে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি ছিল। ছিল আলোচনাসভা, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন, শোকযাত্রা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, মিলাদ মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয়ের দুই দিন আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে দেশের মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে। শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) দিবসটি উপলক্ষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধেও মানুষের ঢল নামে সূর্যোদয়ের আগেই।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এক স্মরণ সভা আয়োজন করেছে। সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও মানবতাবাদী নেত্রী এডভোকেট সুলতানা কামাল, বীরমুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির, বীর প্রতীক এবং একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীর কন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহম্মদ।

সুলতানা কামাল বলেন, যারা আমাকে সমাজসেবা করার দীক্ষা দিয়েছিলেন, তাদের অনেকের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে দেখেছি। আজকে তাদেরকে নিয়ে কথা বলা আমার জন্য অনেক বেদনার। মুক্তিযুদ্ধটা হয়েছিলো সবার মুক্তির জন্য একটা সম্মিলিত সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে রূপান্তরে যে মানুষটি ভূমিকা রেখেছিলো তিনি আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদী নেতা ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, আমার বাবা ছিলেন বিলেত ফেরত একজন চোখের ডাক্তার। শুধুমাত্র দেশকে ভালোবেসে, দেশের কল্যাণের জন্য এ দেশের মানুষের চিকিৎসার করার জন্য তিনি সুদূর বিলেত থেকে চলে আসেন। কিন্তু আমার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করে রাজাকার-আলবদর বাহিনী।
তিনি বলেন, আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। আমাদেরকে শত্রু-মিত্র চিনতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে দমন করার দায়িত্ব আমাদেরই।

লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য জাগ্রত হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে পাকিস্তান বাহিনী যখন বুঝতে শুরু করে যে তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না, তখন তারা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দূর্বল এবং পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। এরপর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামের নতুন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। তাই ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে পাওয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে কেননা দেশকে উন্নয়নের দায়িত্ব আমাদের সকলের।

বাংলা একাডেমির আয়োজন
শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সকাল ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ বুদ্ধিজীবী সমাধিস্থল, মিরপুরস্থ শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়।
বিকেলে একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে একক বক্তৃতানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সৈয়দ হাসান ইমামের কণ্ঠে কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও আবুল হাসানের মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যার কারণ এবং গণহত্যাকারীদের বিচার’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন বিশিষ্ট লেখক শাহরিয়ার কবির। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

একক বক্তা শাহরিয়ার কবির বলেন, একাত্তরে বুদ্ধিজীবীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে যে নৃশংসতায় হত্যা করা হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা মেলা কঠিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছে, তবে তা ছিল ছয় বছরব্যাপী একাধিক মহাদেশে চলমান যুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যা আর বাংলাদেশে নয় মাসে মাত্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তা নজিরবিহীন। অতিসম্প্রতি আমরা জাতীয় গণহত্যা দিবস পালন শুরু করলেও একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে এখনও সক্ষম হইনি।

তিনি বলেন, একাত্তরে বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তি পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করলেও সেসব দেশের গণমাধ্যম পাকিস্তানি গণহত্যার সংবাদ ও ছবি প্রকাশ করে এই গণহত্যার ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান এবং এর সুবিধাভোগী চক্র নানাভাবে গণহত্যার ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এজন্য যেমন একাত্তরের পাক বর্বর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে আমাদের তৎপর হতে হবে তেমনি গণহত্যা অস্বীকারকে
আনিসুজ্জামান বলেন, ১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হলেও একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয় সে বছর মার্চে, ডিসেম্বরে তা তীব্র আকার ধারণ করে; নির্মম নৃশংসতায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করা হয়। দেশের জন্য একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ কখনই বিস্মৃত হবার নয়।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, বাংলা একাডেমির সঙ্গে একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবীদের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তাঁদের প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবেই একাডেমির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাংলা একাডেমি শহিদ বুদ্ধজীবীদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে প্রকাশ করেছে শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ, শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থ, নবপর্যায়ে পুর্নবিন্যস্ত চারটি খ-ে স্মৃতি : ১৯৭১ এবং শহিদ বুদ্ধিজীবীদের রচনাসমগ্র। আমাদের স্মৃতিতে শহিদ বুদ্ধিজীবীরা চিরজাগ্রত থাকবেন তাঁদের অগ্রবর্তী চিন্তা এবং সাহসী কর্মে।