রশীদ মৃধার খোয়াব

আগের সংবাদ

চরণদাসী

পরের সংবাদ

বীরাঙ্গনার মেয়ে

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ , ৯:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ , ৯:১৮ অপরাহ্ণ

চারদিকে হইচই আর চিৎকার। আগুন… আগুন…। যে যেদিকে পারছে, পালিয়ে যাচ্ছে। ভয়াল তা-ব দেখে আঁতকে উঠে নুরজাহান। তার চোখের সামনেই সবকিছু ল-ভ- হয়ে যাচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখা আসমানের সঙ্গেই যেন মিশে গেল। মা-বাবা, দুটি তরতাজা ভাইয়ের শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল নরপশুরা। সবেমাত্র উনিশে পা দেয়া মায়াবতী নুরজাহান অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে রইল। রাক্ষসদের লোলুপ দৃষ্টি এখন তার ওপর। জোরপূর্বক নুরজাহানকে গাড়ি তুলে ক্যাম্পের দিকে নিয়ে গেল এবং ওরা ইচ্ছে মতো পালাক্রমে কয়েক মাস ভোগ করল ওর নরম শরীর। বলতে গেলে অনাহারে বিবস্ত্র শরীরে এই কটা মাস তার কাছে দোজখের চেয়ে কম কিছু ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা হামলা চালিয়ে রহমতগঞ্জের মিলিটারি ক্যাম্প ল-ভ- করে দেয়। পাকবাহিনী প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়ে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ মুক্তিবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়। এই ক্যাম্পে মূলত মধ্যবয়সী নারী ও যুবতিদের আটকে রেখে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হতো। ওই নির্যাতিতাদের একজন নুরজাহান। ক্যাম্পে আটককৃতদের উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধারা যার যার ঠিকানা মতো পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে যার কোনো কিছুই নেই, সেই নুরজাহান আর নিজ ঠিকানায় যেতে চাচ্ছে না। যাবেই বা কোথায়? কে আর আছে? সবকিছুই মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। মধ্যবয়সী মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার নিজ কন্যার স্নেহে নুরজাহানকে নিয়ে গেলেন নিজের শূন্য বাড়িতে। আকাশের কালো মেঘ কেটে ১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয় নতুন ভোরের রক্তিম সূর্য। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল একটি নতুন দেশ, লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জনের পর সাধারণ মানুষ হারানোর বেদনা ভুলে যখন আনন্দে আত্মহারা, তখনো বিষাদে ভরে যাচ্ছে কারো কারো বুকের পাঁজর। নীল কষ্টের কশাঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অবস্থা গর্ভবতী নুরজাহানের। পাপীদের পাপের ফসল তার গর্ভে দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একদিন সন্ধ্যায় দীর্ঘ প্রসব যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। নুরজাহান সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখতে না চাইলেও আলী হায়দার ফুটফুটে শিশু কন্যাকে কোলে তুলে নিয়ে নাম দিলেন উম্মে সালমা পুতুল। গ্রামবাসী জানে, এই নুরজাহানকে আর্মির ক্যাম্প থেকে এনে আশ্রয় দিয়েছে আলী হায়দার। পুতুল ওই নরপশুদের পাপের ফসল, জারজ সন্তান। সমাজের কেউ নুরজাহান ও পুতুলকে মেনে নিতে পারল না। মা-মেয়েকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিতে আলী হায়দারকে দিনের পর দিন চাপ দিতে থাকে গ্রামবাসী। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দারকে নিয়ে কুৎসা রটাতেও দ্বিধা করেনি। একবার প্রহসনের বিচার বসিয়ে তাকে জুতাপেটা এবং নুরজাহানের মাথার চুল কেটে দেন সমাজপতিরা। এত লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে মাত্র দেড় বছরের পুতুলকে রেখে রাতের আঁধারে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে নুরজাহান। গ্রামে তার জানাজা ও কবর দেয়া যায়নি। দূরের এক জঙ্গলে আলী হায়দার নিজে একাই কবর দিয়ে আসেন। তখন মাতৃহারা এমন দুধের শিশুকে লালন-পালন করা আলীর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের জন্য অনেক বিদেশি এনজিও এবং দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে কাজ করতে আসেন। তাদেরই একজন রাশিয়ান জন পিটার। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে নুরজাহানের করুণ গল্প শুনে উনি পুতুলকে দত্তক নিতে আগ্রহী হলেন। পুতুলকে নিজের সন্তানের মর্যাদা দিয়ে ফিরে গেলেন নিজ দেশে। তিনি পুতুলের নতুন নাম দিলেন সোফিয়া। দেখতে দেখতে ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে, সোফিয়াও অনেক বড় হয়েছে। রাশিয়ায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে সে এখন জাতিসংঘের ইউনিসেফে কর্মরত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর গরিব শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। এবার সে বদলি হয় বাংলাদেশে। এই সংবাদ জেনে জন পিটারের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই পুরনো স্মৃতি, যা আজো সোফিয়ার কাছে অজানা। বয়সের ভারে তিনিও নুয়ে পড়েছেন, কবে কখন ভবলীলা সাঙ্গ করেন। তাই এবার মনস্থির করলেন সোফিয়াকে গোপন সত্যটা তিনি জানাবেন। তাই তিনি একটা চিঠি লিখে সোফিয়ার হাতে দিয়ে বললেন, এই চিঠিতে একটা গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। সে যেন তার মৃত্যুর পর এই চিঠিটা পড়ে, তার আগে নয়। বাংলাদেশে কর্মরত অবস্থায় সোফিয়ার কাছে পিতা পিটারের মৃত্যুর খবর আসে। পিতার মৃত্যু শোকে দু’চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে থাকে। এমন সময় মনে পড়ে সেই চিঠির কথা। চিঠিটা পড়ে সবকিছুই তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না, যাকে এতদিন নিজের বাবা বলে জানতো, তিনি কিনা তার আসল বাবা নন। চিঠিতে পিটার তার শেষ ইচ্ছের কথায় লিখেছিলেন, সোফিয়া যেন বাংলাদেশের অসহায় শিশুদের জন্য বাকিটা জীবন কাজ করে যায়। পিটারের শেষ ইচ্ছার প্রতি মর্যাদা দিতে এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে গরির শিশুদের কল্যাণে নিরন্তর ছুটে চলাই সোফিয়ার বর্তমান কাজ। যে কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে নুরজাহান জীবন যুদ্ধে হেরে যায়, সেই কলঙ্ক-ই সোফিয়ার কাছে আজ অহঙ্কার। সোফিয়া এখন বুক চেতিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে থাকে, আমি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এক বীরাঙ্গনা নারীর গর্বিত মেয়ে। রামকৃষ্ণ মিশন রোড, হবিগঞ্জ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়