বীরাঙ্গনার মেয়ে

আগের সংবাদ

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

পরের সংবাদ

চরণদাসী

জোবায়ের রাজু

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ , ৯:২৫ অপরাহ্ণ

বয়স্ক মানুষ হলেও ফেসবুক জিনিসটা বড্ড ভালো লাগে আলমগীর সাহেবের। রাতবিরাতে তিনি এখানে ডুবে থাকতে আনন্দ পান। বিজ্ঞানের এই অনবদ্য সৃষ্টিকে তিনি স্যালুট জানান। অবিবাহিত আলমগীর সাহেবের ফেসবুকে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ফ্রেন্ড যুক্ত হয়েছে। আর ফলোয়ার প্রায় ১৩ হাজারের কাছাকাছি। তিনি কোনো সেলিব্রেটি নন, তবুও এত ফলোয়ার। এর কারণ সম্ভবত আলমগীর সাহেবের অসাধারণ চেহারাখানা। জীবনের এই মাঝ বয়সে এসেও আলমগীর সাহেবের রূপ লাবণ্যতা এখনো বেশ ঝলমলে। তার প্রোফাইল পিকচারগুলোতে অবিশ্বাস্য লাইক আর মুগ্ধকর কমেন্টের ছড়াছড়ি।
আলমগীর সাহেবের ভালো একজন ফেসবুক ফ্রেন্ডের নাম স্বর্ণা। আজিমপুরে থাকে মেয়েটি। ইডেনের ছাত্রী। আট মাস আগে দুজনের ফেসবুকে পরিচয়। শুরু থেকেই স্বর্ণা আলমগীর সাহেবের সৌন্দর্যে মুগ্ধ। ইনবক্সে প্রথম টেক্সটা স্বর্ণাই পাঠায়- ‘বাপরে, কি চেহারা। আমি তো পুরাই ক্রাশ।’
আলমগীর সাহেব প্রথমে বিষয়টা সেভাবে আমলে নেননি। কারণ এ ধরনের টেক্সট তিনি আগেও অনেক পেয়েছেন। কিন্তু স্বর্ণার ব্যাপারটা একেবারে ভিন্ন। স্বর্ণা সত্যি সত্যি আলমগীর সাহেবের আকর্ষণীয় চেহারায় মুগ্ধ। তাইতো সে যখন তখন এই অসম বয়সের পুরুষকে ইনবক্সে নক করে যাচ্ছে। ম্যাসেঞ্জারে স্বর্ণার এত ডাকাডাকি দেখে আলমগীর সাহেব এবার মেয়েটাকে একটু গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। স্বর্ণা যখন বুঝতে পেরেছে ওই মানুষটি তাকে আগের থেকে একটু বেশিই কেয়ার করছে, তখন তার মনে খুশির এক ধরনের ঢোল বাজতে থাকে।
দিনে দিনে আলমগীর সাহেব বুঝতে পারেন এই মেয়ে আবেগ-অনুভূতির কাছে অন্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়েছে। কিন্তু তাকে এভাবে প্রশ্রয় দেয়া যায় না। উঠতি বয়সের মেয়েরা এভাবে ভুল করবেই, তাই বলে আলমগীর সাহেব তাকে বাধা দেবেন না! অবশ্যই দেবেন।
সকালবেলায় স্বর্ণার টেক্সট এসেছে- ‘হাত দিয়ে লিখে লিখে মনের ভাব প্রকাশ করা ঝামেলার। আপনার ফোন নম্বর দেন।’ মুচকি হেসে আলমগীর সাহেব নম্বর লিখে দিলেন। দুপুরবেলা কল আসে আননোন নম্বর থেকে। আলমগীর সাহেব রিসিভ করতেই ওপারের মিষ্টি রিনরিনে গলা বলে- ‘কেমন আছেন হিরো? আমি স্বর্ণা!’
দুজনের মধুর আলাপ জমে। আলমগীর সাহেব বুঝতে পারেন এই মেয়েটা সুন্দর করে কথা বলতে জানে। তারপর থেকে দুজনের মাঝেমধ্যে মোবাইলে কথা হয়।
‘আমি কখনো সাগর দেখিনি। যদি কভু সাগর দেখতে যাই, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাব।’ -স্বর্ণার এ ধরনের কথায় আলমগীর সাহেব গলে যান না। তিনি বোঝেন এই মেয়ে এখনো আবেগে বাস করছে। আবেগ কেটে গেলে সব ঘোর কেটে যাবে।
আলমগীর সাহেবের সঙ্গে মিট করার জন্যে স্বর্ণা মরিয়া হয়ে ওঠে। আলমগীর সাহেব বাসার ঠিকানা জানিয়ে দেন স্বর্ণাকে। পরদিন বিকেলবেলা কলিংবেল বাজে। মিনা দরজা খুলে দেখে বাইরে সুন্দরী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে।
– আমি স্বর্ণা। আলমগীর সাহেবের কাছে এসেছি।
– ও আচ্ছা। চাচ্চু তার ঘরেই আছেন। আসুন।
স্বর্ণা ভেতরে আসে। বেশ অভিজাত বাড়ি। দামি দামি ফার্নিচার। এরা বেশ অর্থশালী। ভাবে স্বর্ণা।
আলমগীর সাহেবের ঘরে এসে স্বর্ণা তাকে এভাবে দেখবে, ভাবতেই পারেনি। সুপুরুষ আলমগীর সাহেব হুইল চেয়ারে বসে আছেন। তার ডান পা নেই। স্বর্ণা ভুল দেখছে না তো!
মিনার পাশে দাঁড়ানো স্বর্ণাকে দেখে চিনতে পেরে মুচকি হাসলেন আলমগীর সাহেব। ফেসবুক লগআউট করতে করতে বললেন- ‘কেমন আছো মেয়ে? তুমি তো দেখতে ভারি মিষ্টি।’
স্বর্ণা হাসে। কিন্তু তার মাথায় আলমগীর সাহেবের পা নিয়ে রহস্য। মিনা বিষয়টি অনুমান করতে পেরে বলল- ‘চাচ্চু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বুলেটে পা হারিয়েছেন। এই হুইল চেয়ারেই এখন তার জীবন কাটে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। ফেসবুকে সময় কাটান। আপনার মতো ফেসবুকের অনেকেই বাসায় আসে।’
মিনার দিকে তাকিয়ে স্বর্ণা ম্লান হাসে। সে এতদিন জানতো না আলমগীর সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা। আলমগীর সাহেব স্বর্ণাকে বসতে বললেন।
দারুণ গল্প জমে ওঠে। মিনা নাস্তা-পানির ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। আলমগীর সাহেব বললেন- ‘শোনো মেয়ে, তোমার ফিলিং আমি বুঝি। বাট সেটা কোনোভাবেই পসিবল না। তোমার কেবল সূর্যোদয়, আর আমার সূর্যাস্ত। ইচ্ছে করলে তোমাকে আমার জীবনের সঙ্গে জড়াতে পারতাম, কিন্তু তা করিনি। আমার পা-বিহীন জীবনে এসে তুমি কিছুই পাবে না। হা হা হা।’ আলমগীর সাহেব হাসছেন। আর এদিকে স্বর্ণার চোখ কেবল ভিজে আসছে। অথচ কেনো ভিজে আসছে, সে মোটেও বুঝতে পারছে না।

২.
রাতে ফেসবুক ওপেন করতেই স্বর্ণার মেসেজ পান আলমগীর সাহেব। ২ ঘণ্টা আগে পাঠানো মেসেজে স্বর্ণা লিখেছে- ‘আপনার বাসা থেকে যখন আসছিলাম, সারা পথজুড়ে রিকশায় বসে অঘোরে কাঁদছিলাম। অথচ কেনো কাঁদছি, বুঝতেই পারিনি। শুধু বুঝি আমি সত্যি সত্যি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এই শহরে সন্ধ্যাবেলায় ভোরের একটি ফুল ফোটেছে, আমি সেই ফুল। নিজের সাধ্যমতো আপনাকে সৌরভ বিলাতে আমি বড় উদ্বিগ্ন। আজ জেনেছি আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশের গর্ব। আমি এই মানুষটির সেবা করতে চাই। আমি আপনার চরণদাসী হতে চাই। আমি মাঝে মাঝে আপনাকে দেখতে আসব।’
ম্লান হেসে আলমগীর সাহেব রিপ্লাই লিখলেন- ‘এসো। তোমার জন্যে আমার দরজা সব সময় খোলা। কিন্তু যে আশা নিয়ে তুমি এ ঘরে আসবে, সেটা তোমার ভুল।’
মেসেজে স্বর্ণার রিপ্লাই দেখতে ইচ্ছে করছে না আলমগীর সাহেবের। তিনি ঘুমাবেন। আজ তার শরীরটা ভালো নেই।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী