বেদনাকে বলেছি কেঁদো না

আগের সংবাদ

আবার তোরা মানুষ হ

পরের সংবাদ

হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র

শাহ ওয়ালিদ আকরাম

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ , ৭:১৯ অপরাহ্ণ

প্রকৃত শিল্পী মূলত নিজের সাথেই নিজের প্রতিযোগিতা করেন। তাই একজন শিল্পীর সাথে অপর শিল্পীর তুলনা চলে না। আমাদের বিজয়ের মাসের এই মহান ক্ষণে যদি মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত অন্যতম উল্লেখ্য চলচ্চিত্রের নাম নিই সে ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্যামল ছায়া’ এই দুটি চলচ্চিত্র অবশ্যই উচ্চারণ করতে হয়।
এখন যদি ভাবি যে ১৯৯৪ সালের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং দশ বছরের ব্যবধানে নির্মিত ২০০৪ সালের ‘শ্যামল ছায়া’ চলচ্চিত্রের ব্যবধান কী তাহলে কিছু কথা বলা যেতেই পারে।
আমরা যদি তাঁর শ্যামল ছায়া নিয়ে ভাবি প্রথমে দেখবো এর ওপেনিং শুরু হয় ক্লোজ আপ শটে একটা নৌকার কোণা ভাসছে মৃদু জলতরঙ্গে। তারপর, কাট টু কাট শটের নেপথ্যে বর্ণিত হচ্ছে এপিলগ- ‘এটি একটি নৌকা যাত্রার গল্প, ১৯৭১, আষাঢ় মাস…’। চমৎকার একটা ওপেনিং। তারপর আমরা দেখি একটি নৌকায় নানা পেশার নানা জাতের মানুষ এক হলো। একটি নৌকা যেন সমগ্র স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্র। গল্পের ভেতর দিয়ে দেখতে পাই হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব, আবার কেউ বলে মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। তারপর দেখি এক মুক্তিযোদ্ধার আগমন। একটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করে সেই নৌকার যাত্রীরা। খুব ক্লিশে অবশ্যই। কিন্তু এই চলচ্চিত্রের গল্পের মূল সুরটা খুঁজে পাওয়া যায় নদীর বুকে আর নদীর তীরে। নদীবিধৌত এই বাংলার আদি গল্পগুলোই নদীর তীর ঘেঁষে, এই গল্পের মূল নির্দেশ সহ্রমানুষকে হত্যা করেছে বর্বরভাবে পাকিস্তানিরা। ‘শ্যামল ছায়া’ কেন জানি আমাদের ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার একটা প্রকট ইশারা দেয়। এর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেলেও আজো এর বিচার পাইনি।

‘আগুনের পরশমণি’ হুমায়ূন আহমেদের প্রথম সন্তান। যার টাইটেলে উদ্দীপ্ত গান। তারপর ওপেনিং দেখেই বোঝা যায় তটস্থ ভীত এক শহরে টহলে বেরিয়েছে পাকসেনারা। এপিলগ থেকে চলে আসে সূত্রধর যে ধরিয়ে দেয় র‌্যাংকিন স্ট্রিটের একটি বাড়িতে কী হতে যাচ্ছে। একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে দেখিয়ে ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ বা ক্র্যাক প্লাটুনের অবিস্মরণীয় অপারেশনের ঘটনা। মতিন সাহেবের পরিবারে এক ঘোর বরষায় আগমন ঘটে গেরিলা যোদ্ধা বদিউল আলম বদির। শুরু হয় এক নতুন আখ্যান। মতিন সাহেবের পরিবার আসলে কিছুই নয় এটা সমগ্র শহরের অভিন্ন রূপক। শিশু অপলা গেরিলা বদিকে আপন করে পরম আত্মীয় মেনে। বদি অল্প সময়ের জন্য নিজের মায়ের কাছে যায়। সিগারেট খাবার জন্য মাকে অন্য ঘরে যাবার কথা বললে মনে পড়ে যায় এরিক মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ বা ‘দ্য রোড ব্যাক’ যুদ্ধরত সৈনিকের কথা। রোমান হিরোর মতো মুক্তিযোদ্ধারা যে তাঁদের আদর্শ বলিষ্ঠতা দিয়ে আঁকড়ে রাখছিলেন তখন, তা বর্ণিত হচ্ছে সংলাপের ঘনঘটায়। সেই সময়ের সমগ্র জাতির কাছে তাঁরা ভীষণ রোমান্টিক। কবি হুমায়ুন আজাদ এই গেরিলাকে নিয়েই লিখলেন-
‘তোমার রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসছে গোলাপ
তোমার মেশিনগানের ম্যাগাজিনে ৪৫টি গোলাপের কুঁড়ি

তোমার রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসছে ভালোবাসা
সর্বাঙ্গে তোমার প্রেম দাউদাউ জ্বলে…’

ক্লাসিক্যাল শট আর ফ্রেমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলেন এই চলচ্চিত্রে। ফিল্মিক মোমেন্ট আর গিমিক অনেক। এত রাজনৈতিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়েও তিনি নির্মাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা। ১৯৯৪ এবং ২০০৪ মোটেও এমন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যথাসময় ছিল না। এটাই হুমায়ূন আহমেদকে একটা আলাদা আসন দেয় যে উনি জানতেন শিল্প হচ্ছে বাস্তবতার এক ভীষণ রূপ। শিল্প কখনো রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা নয়।

তবে যদি একান্তই চলচ্চিত্রিক বয়ানের দিকে যাই তাহলে হুমায়ূন আহমেদ এই মুক্তিযুদ্ধের ভিজুয়াল ন্যারেটিভ দুটি ভীষণ সংলাপ ঘেঁষা। চলচ্চিত্রে ভিজুয়াল দিকটাই কাম্য। কারণ ফিল্মের সেমেওটিকস তাই বলে। দর্শকের জন্য অতি সংলাপ বা ন্যারেশন বিশেষ করে ফিকশন সিনেমায় কতটা প্রয়োজন আসলে সেটা ভাবা উচিত। একটা ইমেজ নিজেই গল্প বলবে দর্শকের মাথায়। এর জন্য ব্যাকরণমাফিক সংলাপ বাহুল্য। হুমায়ূন আহমেদের গদ্যতেও আমরা সংলাপ এবং কথোপকথনের বাহুল্য দেখি। অবশ্যই এটা তাঁর নিজস্বতা। কিন্তু চলচ্চিত্রে সংলাপের বাহুল্য মূল গল্পের স্বাদ একদম পানসে করে ফেলে। কিন্তু ‘আগুনের পরশমণি’ মাস্টারওয়ার্ক। হুমায়ূন আহমেদ এই চলচ্চিত্রের জন্যই অমর হয়ে থাকবেন নির্মাতা হিসেবে।

তবে দিন শেষে, এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র দেখতে এবং পাঠ করতে চাইলে অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্যামল ছায়া’ সম্পর্কে জানা এবং দেখা উচিত। এবং বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধনির্ভর সাহিত্য পাঠ একান্ত প্রয়োজন।

এমএইচ