সভাপতি আশরাফ সম্পাদক মাকসুদ

আগের সংবাদ

ডিসেম্বরের স্মৃতি

পরের সংবাদ

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন মুখ আসছে?

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ , ৬:৩৬ অপরাহ্ণ

নির্জীব রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই একক শক্তি। যেভাবে হোক আর যে যে কারণে হোক তাদের দখলে সবকিছু। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ক্যারিশমা আর নেতৃত্বের গুণে তারা যে সুফল ভোগ করছে তা নিশ্চিত। মাঠ থেকে উচ্চপর্যায়ে নেতাদের কী ভ‚মিকা বা তারা আসলে কতটা সক্রিয় কী করেন, সেটাও জানে না কেউ। দেশে গিয়ে দেখলাম মানুষ সম্পূর্ণ রাজনীতিবিমুখ। নানা বিষয়ে তাদের মতপার্থক্য বা রাগ-ক্রোধ থাকলেও রাজনীতি সমাধান দিতে পারবে বলে মনে করে না কেউ। এমন রাজনীতিবিমুখ সমাজ আমি কোনো দেশে দেখিনি। যেসব উন্নত দেশকে আমরা রাজনীতিহীন বলে মনে করি তার একটিতে বসবাস আমার। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কথাটা পুরো সত্য নয়। কারণ মানুষ এখানে রাজনীতি মানে মিছিল-মিটিং বা সভা মনে করে না। কিন্তু ভোটের বাক্সে ঠিক জানিয়ে দেয় কী তার মতামত। বুঝিয়ে দেয় কাকে তারা চায় আর কাকে চায় না। সে জায়গাটাও দেশে এখন আস্থায় নেই। ভোট নিয়ে রঙ্গ-প্রহসন ছাড়া কারো মুখে কোনো কথা শুনিনি। এমন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগই একমাত্র দল। বিরোধী দল না থাকায় তারা নিজেরা নিজেরা মাঝে মাঝে মারামারি করে। চেয়ার-টেবিল ভাঙে। যেন দেখে মনে হয় না আছে। এখনো রাজনীতি আছে। তো এই দলের সাধারণ সম্পাদক তার কাজ ও মাঠপর্যায়ে দৌড়াদৌড়ির জন্য এক সময় শিরোনামে থাকতেন। শারীরিক কারণে তিনি একটু দমলেও তার কথাই মিডিয়াতে শোনা যায় বেশি। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নতুন মুখ আসবে জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসবে কিনা তা দলীয় সভাপতির এখতিয়ার।’ এই হলো তার নতুন বক্তব্য।
নতুন মুখ আসুক আর পুরনো মুখ থাকুক গণতন্ত্র বা রাজনীতির কী লাভ-লোকসান হবে বোঝা মুশকিল। আওয়ামী লীগের দলগত ভ‚মিকার চেয়েও মানুষ দেখছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন। তবে এটা ঠিক ঐতিহ্যবাহী এই দলের শীর্ষ যে কোনো পদের রদবদল বা কে এলো, কে গেল তা বিষয় বটে। এর আগে আমরা সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষকে দেখেছি সাধারণ সম্পাদক পদে। কম কথা বলতেন। সব বিষয়ে মতামত দিতেন না। কিন্তু আমরা জানি হেফাজতের সময় যখন মতিঝিলকে ঘিরে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র ফলবতী করার পথে, যখন মানুষ ঠিক বুঝতে পারছিল না আসলে কাল সকালে কী হবে, যখন এরশাদও পল্টি খেয়ে মতিঝিলে আগত লোকজনকে শরবত-পানি পান করানোর ঘোষণা দিলেন, তখন তার ভ‚মিকা ছিল বলিষ্ঠ। নেতা কে? কাকে আমরা বলি নেতা? শাস্ত্রে বলে যিনি বিপদের সময় স্থির, যিনি জানেন তিনি কী করছেন, যিনি বিরূপ ও প্রতিক‚ল পরিবেশে নড়েন না, তিনিই নেতা। আশরাফ ভাই তেমন একজন মানুষ, যিনি কথা কম কাজ বেশিতে বিশ্বাসী। তার একটা কথা মনে পড়ে। তিনি শেখ হাসিনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মানুষ ও দেশকে জানিয়েছিলেন তাদের রক্তে বেইমানি নেই। আর তারা জানেন না কীভাবে তা করতে হয়। এটা চার জাতীয় নেতার পরিবার বারবার প্রমাণ করেছে। অপমান বা অবহেলার পরও তারা দল ছেড়ে যাননি। সৈয়দ আশরাফ আরো একটা কথা বলে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থক এমনকি বিরোধীদেরও চমকে দিয়েছিলেন। তার মতে, আওয়ামী লীগ একটি অনুভ‚তির নাম। আপনি যদি ইতিহাস আর অতীতের দিকে তাকান এর কোনো বিকল্প পাবেন না। আশরাফ ভাই প্রগলভ কিংবা সব বিষয়ে বলতেন না বলেই যখন বলতেন খাঁটি কথা বলতেন। বলা হয়ে থাকে সব ভালো তার শেষ ভালো যার। তার জানাজায় মানুষের ঢলের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি আমরা। সাধারণত সরকারি দলের নেতাদের প্রতি মানুষ অতটা সহানুভ‚তিশীল থাকে না। কিন্তু তার বেলায় সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল।
কথাগুলো বললাম এই কারণে সামনে আওয়ামী লীগ কাকে সম্পাদক নির্বাচিত করবে বা দল কাকে চাইবে সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন মানুষ খুব বেশি সন্তুষ্ট নয়। তারা নানা কারণে তেতে আছে। রাজনীতিহীন সমাজে দল বা মতামতে কিছু যায় আসে না বলে চুপ থাকে। আর কোনোভাবেই উন্নয়ন ও অগ্রগতি ব্যাহত হোক সেটা তারা চায় না। কিন্তু এর মানে এই না যে তারা কিছু দেখে না। তারা খুব ভালো জানে আর বোঝে কে বা কারা কথা বলে মন গলাতে চায়। সে কথাগুলো বারবার বলতে বলতে এমন এক জায়গায় চলে এসেছে মানুষ শুনলেই টিভির চ্যানেল বদলে দেয়। আওয়ামী লীগের মতো দল যদি এভাবে নেতাদের জনমনে ক্রোধের শিকার হতে দেয় তাদের ভবিষ্যৎ কী এমন থাকবে? আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কী চায় বা কী তাদের মনোভাব, তা কি আমলে নেবে তারা? আমাদের দেশের রাজনীতিতে যে কোনো দলই মূলত কর্মীদের কথা শোনে না। আর শুনলেও কেয়ার করে না। এটা উপমহাদেশেও সত্য।
ভারতে গণতন্ত্র থাক আর যাই থাক কংগ্রেস এখনো গান্ধী পরিবার, বলা উচিত নেহরু পরিবারেই সীমাবদ্ধ। পাকিস্তানে সত্যিকার অর্থে যে রাজনৈতিক দল সেই পিপলস পার্টিও পরিবারের বাইরে ভাবতে পারেনি। তার ফল কিন্তু সবাই দেখছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ভরাডুবি ঠেকাতে পারেনি কংগ্রেস। বেনজিরের পর পিপলস পার্টির অবস্থাও ঠিক তেমন। আমাদের দেশে ছায়া দল হলেও বিএনপিই মূলত বিরোধী দল। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর সে দলের একজন নেতাও নেই যার কথায় মানুষ জাগতে পারে। বরং ক’দিন আগে দেখলাম যেখানে তাদের মহাসচিব ও অন্য নেতারা বলছেন এখনই সময়। এক দফা আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, সেখানে মওদুদ আহমেদ বলেছেন- এখনো তার সময় হয়নি। বুঝুন এবার। কোন দলে যে কে ঘাপটি মেরে আছে বা থাকে, সেটা বোঝাই এখন মুশকিলের ব্যাপার। এ ছাড়া দলের সব ডিসিশন যদি বিলেত থেকে আসে আর সে লোকটি যদি অপরাধের দায়ে দেশে আসতে না পারে সে দলের ভবিষ্যৎ কোথায়? কেন মানুষ তাদের সমর্থন করবে?
অন্যদিকে রাজনীতিতে আমাদের দেশ ও সমাজে কেউ বিদায় নেয় না। হয় তাকে যেতে হয় নয়তো তাকে সরানো হয়। জোরজবরদস্তি বা চাপের মুখে ছাড়া কেউ যায়নি কোনোকালে। সেখানে আওয়ামী লীগ কেন ব্যতিক্রম হবে। তাদের ভরসা একটাই শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা। তিনি ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নিতে জানেন বলে তারা এখনো বিপদের মুখে পড়ছে না। তাই এটা মানতেই হবে মানুষের আগ্রহ থাকবে তার নির্দেশের প্রতি। বদলে যাওয়া কোনো মুখ আসবে না একই মুখ আসবে আবার। দেশ ও রাজনীতির তাতে কতটা উপকার হবে জানি না। তবে এটা ঠিক, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে এটা বড় খবর। কেন যে বড় খবর সেটাও অবশ্য এখন বোঝা যাচ্ছে না। তবে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন ইঙ্গিত দিলেন নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটতে পারে বলে অনুমান করা যায়।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

এমএইচ