সরানো হবে মহাখালী বাস টার্মিনাল

আগের সংবাদ

যাচাই করে ইন্টারনেটে তথ্য শেয়ারের আহ্বান

পরের সংবাদ

শহীদ মিনারে নাগরিক শ্রদ্ধা

অজয় রায় ছিলেন বৃহত্তর সমাজের শিক্ষক

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ , ৭:২৪ অপরাহ্ণ

শ্রদ্ধার ফুল হাতে মানুষের ঢল নেমেছিলো শহীদ মিনারে। লাইন ধরে নবীন প্রবীণ সুশৃঙ্খলভাবে এসেছিলেন দলে দলে। তাদের মধ্যে কেউ ছাত্র, কেউ সহকর্মী, কেউ বন্ধু, কেউ আত্মীয়, রক্তের সম্পর্কের যার ভেতরে অনেকের সঙ্গেই ছিল অধ্যাপক অজয় রায়ের নিবিড় সম্পর্ক। সমাজের এসব বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, অজয় রায় ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষের বাইরে একজন বৃহত্তর সমাজের শিক্ষক। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি সব সময় প্রগতিশীলতার কথা বলেছেন নির্ভয়ে অসংকোচে। স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি উদার গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলদেশের। একইসঙ্গে ছেলে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদের বিচার না হওয়ার বেদনাও ছিলো তার মধ্যে- সে কথাও জানিয়েছেন তারা। অবিলম্বে অভিজিৎ হত্যার বিচারেরও দাবি জানান তারা।

মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় মরদেহ কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে নেয়ার পর বরেণ্য এই মুক্তিযোদ্ধার কফিনে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি এ শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজনে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অজয় রায়ের নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠান। শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ ও অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ সামাদ, চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী, ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম, জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টিবোর্ডের সভাপতি শামসুজ্জামান খান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্ল্যাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদেকা হালিম প্রমুখ।

আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, শামসুন্নাহার চাঁপা, সুজিত রায় নন্দী, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ। বাংলা একাডেমির পক্ষে মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির পক্ষে সভাপতি এ এস এম মাকসুদ কামাল, ওয়ার্কার্স পার্টি, যুব মৈত্রী, ঐক্য ন্যাপের পক্ষে পংকজ ভট্টাচার্য, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), আদিবাসী ফোরাম, বাসদ (খালেকুজ্জামান), হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, ন্যাপ, গণসংহতি আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন মাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অধ্যাপক অজয় রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এক মিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, অজয় রায় তার কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭০ সালের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিশ্বজনমত গঠন করতে কাজ করেছেন। প্রথম বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন প্রবর্তনে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

তার পুত্র অভিজিৎ হত্যাকে গোটা জাতির জন্য এক মর্মান্তিক ঘটনা উল্লেখ করে পুত্রশোকে স্তব্ধ দীপনের বাবা আরো বলেন, তিনি বিচার চেয়েছিলেন। অথচ চার বছর পরে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপরই তার মৃত্যু তার মৃত্যু ঘটল। অজয় রায় আমাদের জাতীয় জীবনে অমর হয়ে থাকুন, এই কামনা করি।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। সমাজতন্ত্রে, মানুষের স্বাধীনতা আর অধিকারে বিশ্বাস করতেন। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডে তিনি প্রতিবাদ করতেন। সেটা তার ছেলে অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর আগেও। এ ধরনের মানুষ তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হলে আমাদের আক্ষেপ থাকতো না।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ৫২-এর স্মৃতির বেদীতে দাঁড়িয়ে আমরা এমন একজন মানুষকে আজ আমরা বিদায় জানাতে এসেছি, যিনি আমাদের জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠতম একজন মানুষ। যিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি শুধু শ্রেণি কক্ষের শিক্ষক ছিলেন না। তিনি শ্রেণি কক্ষের বাইরে একজন বৃহত্তর সমাজের শিক্ষক ছিলেন। তিনি যে শিক্ষা নিজে দিয়েছেন, যেটি তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি সেটা চর্চা করেছেন। এবং একই সাথে তার অনুজপ্রতীমদেরও দিক্ষিত করেছিলেন। তিনি সমতায় বিশ্বাস করতেন।অর্থনৈতিক মুক্তিতে বিশ্বাস করতেন।অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস রতেন। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করতেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, মুক্তচিন্তার জগতে তার বিশাল অবদান রয়েছে। যারা অজয় রায়কে হত্যা করতে পারেনি তারা তার পুত্রকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, অভিজিৎ সহ যদি ব্লগার হত্যার বিচার করা হতো তাহলে হলি আটিজানের মতো আমাদের দেখতে হতো না।
শাহরিয়ার কবির আরো বলেন, আজকে অজয় রায় আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন।কিন্তু তার লেখা, তার বিশাল কর্মযজ্ঞ আছে। যা নতুন প্রজন্মের কাছে বিশাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

ছেলের মরদেহ কাঁধে নিয়ে বাবার সংগ্রাম বড় কঠিন অজয় রায়কে তাই করতে হয়েছিল এমন মন্তব্য করে প্রবীণ রাজনীতিবিদ পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, তার মতো বহুমাত্রিক মানুষ কম দেখেছি। তার চলে যাওয়ায় আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যে শূন্যতা তৈরী হয়েছে তা সহজে হবে না।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, মানুষ হিসেবে তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে মানবতার পক্ষে নিজের শক্ত অবস্থান রেখেছিলেন। তিনি পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যে জ্ঞানের সাধনা করেছেন, তখন তা নিয়ে অনেকেই মাথা ঘামাননি। তিনি আমাদের একজন জাতির বিবেক হিসেবে পথ দেখিয়েছেন। আমরা একজন জাতির বিবেককে হারালাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, দেশের শিক্ষানীতি প্রণয়নে ও পাঠ্যক্রমের সংশোধনে তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের অন্যতম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আমাদের প্রবাসী শিক্ষকদের সংগঠিত করে বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা করেছিলেন। এমন যুক্তিবাদী, সমাজতান্ত্রিক, প্রজ্ঞাবান, এবং অসাধারণ পণ্ডিতের চলে যাওয়ায় আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। যা সহজে পুরণ হওয়ার নয়।

ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম বলেন, অজয় স্যারের প্রত্যক্ষ ছাত্রী ছিলাম আমি। দীর্ঘ ৫০ বছর তার সঙ্গে আমার পরিচয়, উঠাবসা। ষাটের দশকে আমরা যখন আইয়ূব-মোনায়েম খানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতাম, তখন যে কয়জন মানুষ নানা দুঃসময়ে আমাদের সহায়তা এবং প্রেরণা জোগাতেন অজয় স্যার তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে যতোগুলো প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন হয়েছে সেসব আন্দোলনে অজয় স্যার নির্ভিকভাবে ছুটে যেতেন।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, অধ্যাপক অজয় রায় একজনই তার কোনো বিকল্প নেই।বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন।

অধ্যাপক অজয় রায়ের ছোট ছেলে অনুজিৎ রায় বলেন, আমার দাদা অভিজিৎ রায়ের হত্যকারীদের বিচার হলে বাবা স্বস্তিবোধ করতেন। সেই বেদনা নিয়েই বাবা চলে গেলেন। অনুজিৎ রায় বলেন, পিতা হারানোর বেদনা আমি মর্মে মর্মে অনুভব করছি। তিনি শুধু আমার পিতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, লেখক, বুদ্ধিজীবী; সর্বোপরি একজন মুক্তচিন্তার মানুষ।

অজয় রায় সোমবার (৯ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাতে অজয় রায়ের মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়। সেখান থেকে মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় অজয় রায়ের মরদেহ নিয়ে আসা হয় তার বেইলি রোডস্থ বাসভবনে। বেলা ১১টায় অজয় রায়ের মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শহীদ মিনার থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অজয় রায়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাবির কার্জন হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেখানে বিভাগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাবির জগন্নাথ হলে। সেখান থেকেই বারডেম হাসপাতালে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

এনএম