টেকনাফে রোহিঙ্গা শিবিরে গোলাগুলি, নিহত ১

আগের সংবাদ

ডিএসইতে মূলধন নেই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা

পরের সংবাদ

১৫ হাজার ‘বীর নিবাস’

ঝর্ণা মনি

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৮, ২০১৯ , ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে।’ প্রায় পাঁচ দশক আগে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে ‘পতাকা’ ছিনিয়ে আনলেও ভূমিহীন মনুমিয়াদের অনেকেই এখনো ভূমিহীন। সারাদেশের ভ‚মিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটু মাথা গোজার ঠাঁই করে দিতে ২০১২ সালে ‘ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প’ হাতে নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। প্রথম পর্যায়ে দুই হাজার ৯৬২টি বাসস্থান নির্মাণ ও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষে গৃহ পাবেন ১৫ হাজার বীর। ইতোমধ্যে বাসস্থানের ডিজাইন হয়েছে এবং তা চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মাণাধীন আবাসন প্রকল্পে ‘বীর নিবাস’ শিরোনামে ১৪ হাজার একতলা ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রত্যেক জেলা-উপজেলায় এই বহুতল আবাসিক ভবন হবে। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বর্তমানে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ উদ্যোগটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে দুই হাজার ২৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। চার ডিসিমাল জমির ওপর ৯০০ স্কয়ার ফুট আয়তনের একেকটি ভবনের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ভবনগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের উপহার দেবেন। প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে তিনটি বেডরুম, একটি ড্রইং-কাম ডাইনিং রুম, দুইটি বাথরুমসহ বারান্দা। তবে যেসব জেলা বা উপজেলায় তিন বা ততধিক ভবনের প্রয়োজন হবে সেখানে আবাসন কমপ্লেক্স নির্মাণ করে অন্যান্য সুবিধাদি যেমন অভ্যন্তরীণ সড়ক, লাইটিং ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। মূল খাস জমির ওপর ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে। তবে যেসব উপজেলায় খাস জমি পাওয়া না যায় সেখানে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপহার হিসেবে এসব বাড়ি দেয়া হবে। এ ছাড়া দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তাৎক্ষণিক বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়ার লক্ষ্যে সব উপজেলা সরকারি হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের অনুক‚লে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সব জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ ও সব উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প দুটির অগ্রগতি সন্তোষজনক। বাকি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সগুলো যথাসময়ে শেষ করা হবে।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের অসচ্ছল থাকাটা রাষ্ট্রের জন্য ‘লজ্জার’ আখ্যায়িত করেছেন আদালত। এ ব্যাপারে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, সারাদেশে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ দেয়া অব্যাহত রয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যুদ্ধাহত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা নির্দিষ্ট কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দের জন্য আবেদন করলে প্রচলিত বিধি বিধান অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।এরআগে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে প্রথম অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য বাজেটে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্ধ রাখা হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদকে জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীভাতা ও উৎসব ভাতার পাশাপাশি বার্ষিক দুই হাজার টাকা হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিজয় দিবস উপলক্ষে জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে বিশেষ সম্মানীভাতা দেয়া হবে।

সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকরা। জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করছে। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, আলবদর-আলশামসদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধীরা একদিকে একাত্তরে দেশের সম্পদ লুট করেছে অন্যদিকে পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার বিভিন্ন সময়ে হাজার কোটি টাকার বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছে। এদের অনেকেরই শাস্তি কার্যকর হয়েছে। এখন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আমাদের অসচ্ছল বীরদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে সমস্যা কোথায়?

ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান ডা. এম এ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রাখা বীরযোদ্ধাদের অনেকেই এখনো ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করেন। অথচ স্বাধীনতাবিরোধিতা কোটি কোটি টাকার মালিক। টাকার দাপটে তারা এখনো উদ্ধ্যতপূর্ণ আচরণ করে। এটি আমাদের জন্য জাতীয় লজ্জা। যতদ্রুত আমরা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থার উন্নয়ন না করতে পারব, ততদিন দায়মুক্ত হতে পারব না।