জেলের ভেতরে ও বাইরে চাই তদারকি

আগের সংবাদ

বাংলা ভাষা ও লিপির ক্ষেত্রে অন্যের খবরদারি মানা যায় না

পরের সংবাদ

রাজনীতির আকাশ আলো করা বার্নি স্যান্ডার্স

আলমগীর খান

নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ , ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে উপস্থিত। এখানে দুটি পথ দুদিকে চলে গেছে- উপরে ও নিচে। আগামী নির্বাচনে মার্কিন জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন পথ বাছবে। নিচের পথ অবশ্য তারা ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছে- গত নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে। আগামী নির্বাচনে এই নিম্নগামী পথ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আবার পাবে তারা। ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই নিম্নগামী যাত্রা কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, অন্য অনেক দেশকেও বিপথগামী করছে- উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে উসকে দিয়ে, আয় বৈষম্যকে উন্নয়নের প্রতীক বানিয়ে ও মানুষকে আত্মস্বার্থকামী হওয়ার প্ররোচনা দিয়ে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক মনোনয়ন পেতে লড়ছেন বার্নি স্যান্ডার্স। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষতিকারক (ডেঞ্জারাস) প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। আর স্যান্ডার্স সেই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী যিনি সবচেয়ে প্রগতিশীল, নীতিনিষ্ঠ ও গণমুখী এবং একই সঙ্গে জনপ্রিয়।

এদিক থেকে ২০২০ সালের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের মানুষ সেভাবে দেখছে একে, কিন্তু দেশটির মূলধারার গণমাধ্যম এ ব্যাপারে একবারেই নিশ্চুপ ও নিষ্প্রাণ। প্রচারমাধ্যমগুলোয় বার্নি স্যান্ডার্স উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও বাইরের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন এমন একটা ভাব করছে যেন স্যান্ডার্স কোনো বিষয় না। তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে বাস্তবতাকে ঢাকতে চেষ্টা করছে।

মূলধারার প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম চলতিপন্থার সমর্থক। তারা ওবামা-আমলের স্থিতাবস্থা কামনা করে। স্থিতাবস্থার পরিবর্তনকে তারা মেনে নিতে পারে না। ওবামা-আমলকে তারা ফিরে পেতে চায়। অথচ ওবামানীতিই ট্রাম্পের উত্থানের সহায়ক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও স্বয়ং ওবামা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে পারলেন না। হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী অভিযানে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। নিজে বলে বেড়িয়েছেন- এত যে জনপ্রিয় ওবামা তার চেয়েও এবং স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের চেয়েও হিলারি বেশি যোগ্য। অতএব তাকে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা জনগণের কর্তব্য। তবু রাজনীতিতে নবাগত ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গেলেন। ওবামাপন্থিরা তাকে কিছুতেই ঠেকাতে পারলেন না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তখন ইতিহাসের একটি মোড়ে এসে পৌঁছেছে যেখান দুটি পথ দুদিকে চলে গেছে- উপরে ও নিচে। স্থিতাবস্থা আর ইতিহাসের পছন্দ না। ইতিহাস তখন সোজা বলে দিচ্ছে- হয় ওপরে ওঠো, না হয় নিচে নামো, বাপু। সেবার ডেমোক্রেট দল বার্নি স্যান্ডার্সকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার মনোনয়ন না দেয়ায় ওপরে ওঠার পথটি এমনিতেই বন্ধ ছিল। যা হওয়ার তাই হলো- ট্রাম্প বসলেন দেশটির চালকের আসনে। এবার এ সংকট আরো স্পষ্ট আকারে উপস্থিত। মূলধারার সবাই স্থিতাবস্থার পক্ষ অবলম্বন করেছে। তারা জো বাইডেন বা এলিজাবেথ ওয়ারেন বা কামালা হ্যারিসকে চাইতে পারে, কিন্তু বার্নি স্যান্ডার্সের বেলায় না। এজন্য স্যান্ডার্সের ব্যাপারে সবাইকে একরকম নীরবতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে। গণমাধ্যমে সর্বোচ্চ জায়গা বরাদ্দ ট্রাম্পের জন্য তার কুশলী উদ্ভট কথাবার্তা ও আচরণের বরাতে। এরপর জো বাইডেনরা আসেন, কিন্তু স্যান্ডার্স অনুপস্থিত। তাকে সবসময়ই পিছিয়ে পড়া একজন প্রেসিডেন্ট-পদপ্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তার বেলায় মূল খবর হচ্ছে তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন ও বর্তমানে হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছেন। যখন কিনা বার্নির নির্বাচনী প্রচারাভিযান হয়ে উঠেছে আরো গতিশীল এবং প্রান্তিক মানুষেরা বেশি করে জড়ো হচ্ছেন তার পেছনে।

বার্নি ইতোমধ্যে সেই প্রেসিডেন্ট-পদপ্রার্থী যিনি বিশ্বব্যাপী মানুষের মন কেড়ে নিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট না হয়েও তিনি এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করেছেন যে আমেরিকার জনগণ তাকে কখনো ভুলতে পারবে না। Salon-এ (২৪ নভেম্বর ২০১৯) Matthew Rozsa লিখেছেন, ‘তিনি যদি প্রেসিডেন্ট নাও হতে পারেন, ইতিহাস বার্নি স্যান্ডার্সকে মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে রাখবে। তিনি প্রগতিশীল একটি প্রজন্মকে উসকে দিয়েছেন এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্তর্গত ঝোঁককে মৌলিকভাবে বদলে বাম দিকে কাত করেছেন। তিনি তরুণ প্রগতিশীলদের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যে বরফখন্ডের একটি দৃশ্যমান শীর্ষভাগ আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো-কোর্টেজ। তার কারণে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সবুজ নয়া চুক্তির মতো আগেকার প্রান্তিক প্রস্তাবসমূহ এখন রাজনৈতিক তর্কবিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়।’

মূলধারার গণমাধ্যম বার্নির নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তার বাম রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। কিন্তু তৃণমূলের বাস্তবতা এই আধিপত্যবাদী মনোভাবের বিপরীত। গার্ডিয়ানে (১৭ নভেম্বর) লেখা Mario Koran-এর একটি নিবন্ধের শিরোনাম : ‘ল্যাটিনো ভোটারদের মনোভাবের প্রতিফলন বার্নি স্যান্ডার্সের বক্তব্যে।’ এই শিরোনামের মাঝেই রয়েছে বাস্তবতার ছবি। মনে রাখতে হবে মার্কিন রাজনীতিতে ল্যাটিনো ভোটারদের প্রভাব বাড়ছে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল তাদের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। তবু দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যম ও নির্বাচন-বিশেষজ্ঞরা স্যান্ডার্সের নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কারণটা আমাদের জানা। স্যান্ডার্সকে নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন তার বয়স নিয়ে। এত বুড়ো মানুষ কি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন?

জ্যাকোবিন সাময়িকীতে (১৯ অক্টোবর ২০১৯) Benjamin Y. Fong ইবহলধসরহ ণ. ঋড়হম এরকম হাস্যকর প্রশ্নের বেলুন ফুটো করে দিয়ে ‘বার্নি বৃদ্ধ, তাতে কি?’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এই উদ্ভট বয়স সমস্যা নিয়ে কী বলা যায়? মূলধারার গণমাধ্যমে একে একান্তই বার্নি স্যান্ডার্সের বেলায় খাটানো হচ্ছে। অথচ অন্য প্রতিযোগীরাও একবারে মুরগির বাচ্চার মতো তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছেন না। (জো বাইডেনের বয়স ছিয়াত্তর, এলিজাবেথ ওয়ারেন সত্তর।) বাইডেনকে বিশেষ করে ভাঙাচোরা দেখায়, মনে হয় প্রাথমিক ইংরেজি ব্যাকরণ প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতাও তিনি হারিয়েছেন, আর চোখ টকটক করে, যেগুলো প্রেসিডেন্টসুলভ বৈশিষ্ট্য নয়। তবু তার স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা নিয়ে কেবলমাত্র ডানপন্থি গণমাধ্যম ছাড়া কারো দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু বার্নি হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করতে গেছেন তো নিউইয়র্ক টাইমসের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে শুরু করেছে।’

বার্নি স্যান্ডার্সকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করা হবে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাতে ব্যর্থ হয়, দুঃখজনক হবে নিশ্চয়ই, তবে মর্মান্তিক হবে না। কেননা বার্নি আজ একটি আন্দোলনের নাম- যার মূল কথা সবুজ নয়া চুক্তি, সবার জন্য স্বাস্থ্য, শ্রমিকদের অধিকার, সবার জন্য সমান সুযোগ ও বিশ্ব রাজনীতির দিক পরিবর্তন। এ আন্দোলন চলবে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোন বা না হোন। বার্নির স্লোগান : ‘আমি না। আমরা।’ মি. Fong-এর কথায় বলা যায়, ‘তরুণ ও গোবরমাথা হওয়ার চেয়ে বৃদ্ধ ও সঠিক হওয়া উত্তম।’ বার্নি স্যান্ডার্সের তুলনায় ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বেশিরভাগ প্রেসিডেন্ট-পদপ্রার্থী গোবরমাথা (শিটহেড) ছাড়া কিছুই না। অবশ্য রাজনীতিতে প্রায়ই গোবরমাথাদের নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা বেশি থাকে, যার জলজ্যান্ত প্রমাণ ট্রাম্প নিজে।

আলমগীর খান : নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক।
[email protected]

এমএইচ