ত্যাগী

আগের সংবাদ

রাত্রির যাত্রী

পরের সংবাদ

ছাপ

রহিমা আক্তার মৌ,ঢাকা

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ , ৩:৫২ অপরাহ্ণ

রিয়াকে যখন আমি পড়াতে শুরু করি তখন ও ক্লাস সেভেনে আর আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। আমাদের পরিচয় সেই চার-পাঁচ বছর আগে। ঠিক পারিবারিকভাবেও নয়, আবার বন্ধুদের মাধ্যমেও না। আমরা পাশাপাশি স্কুলে পড়তাম। গার্লস স্কুল মানেই আমাদের একটা ভয়ের জায়গা। এটা আমাদের পক্ষ থেকে নয়, অভিভাবকদের পক্ষ থেকে। রিয়া আর আমাদের বাসাও ছিল পাশাপাশি। আমি আর অনিক ভাইয়া থাকতাম বাবার সঙ্গে। সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। তেমন কিছুই মনে নেই, তবে মায়ের সঙ্গে আমার কয়েকটা স্মৃতি চোখের কোনায় ভাসে।

মা হারা দুই ভাই বাবার কাছেই বেড়ে উঠেছি। বাবা সবসময় আমাদের বুঝাতো, যেন অবাধ্য না হই। মানুষের চোখেও যেন খারাপ না হই। অনেকটা সে কারণেই গার্লস স্কুলের দিকে তাকাতাম না। বাসা থেকে স্কুলে যাবার পথেই পড়ত রিয়াদের বাসা। যাওয়া-আসার সময় রিয়ার আম্মু সালেহা আন্টি দেখলেই বাসায় ডেকে নিয়ে যেতেন। নিজের হাতে বানানো মজার মজার খাবার খাওয়াতেন। ওই সময় অনেক গল্পও করতেন। মায়ের স্মৃতি তো খুব অল্প মনে আছে। তাই সালেহা আন্টির স্নেহ মমতাগুলোকে নিয়েই আমি কল্পনার জগতে ভাসতাম।

এভাবেই যাচ্ছিল দিন। রিয়ার সঙ্গে তেমন কথা হতো না। মনে হতো আমি সালেহা আন্টির কাছেই আসি। কিন্তু বিষয়টা হতে পারত এরকম যে, রিয়ার জন্যই আমার ও বাসায় যাওয়া হচ্ছে। নিজের ইচ্ছায় খুব কম যেতাম ওদের বাসায়। এমন কোনোদিন যায়নি যে আন্টি আমায় দেখেছে অথচ ডাকেনি। নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে আবার চুপে চুপে বলতেন- বাসায় গিয়ে কিন্তু বাবাকে বলবি না।
আমিও ঠিক কথাটা মেনে নিতাম। তবে বাবা ঠিকই বুঝতেন।

২.
রিয়া সেই ক্লাস টু থেকে সেভেনে উঠল। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বেড়াতে যাই চাচার বাসায়। ফিরে এলেই সালেহা আন্টি রিয়াকে পড়ানোর দায়িত্ব দেন আমায়। আমিও না করতে পারিনি। পড়ার খরচ বাড়ছে, নিজে কিছু করতে পারলে ভালোই হয়।
বৃষ্টিতে ভিজতে খুবই পছন্দ করত রিয়া, এজন্য আন্টি ওকে অনেক বকাও দিতেন। কিন্তু সে তা শোনেই না। আমাদের বাসায় পাশেই একটা জায়গা ছিল বেলে মাটির। ওই এলাকার এমন সমান্তরাল বেলে মাটির জায়গা অনেক ছিল। বৃষ্টির সময় কেউ সেখানে হাঁটাহাঁটি করলে সুন্দর পায়ের ছাপ পড়ত। বৃষ্টির সময় বাসায় থাকলে আমি সেখানে যেতাম, নিজের পায়ের ছাপ সেখানে দিয়ে খুব আনন্দ পেতাম। মাঝে মাঝে আমি অদ্ভুত একটা পায়ের ছাপ সেখানে দেখতে পেতাম। কিন্তু কার পায়ের ছাপ তা খুঁজে পেতাম না।
সালেহা আন্টি মাঝে মাঝে গল্পের ছলে আমায় বলতেন- তোকে অন্য কোথাও যেতে দিব না, জামাই করে রেখে দিব।
আমি হাসতাম। এক সময় রিয়াকে আমার ভালো লাগতে শুরু করে। কিন্তু কখনো ওর সঙ্গে তেমন কোনো আচরণ করিনি। আর রিয়াও ছিল চুপচাপ। পড়ার দরকার সে পড়ত, এর বাইরে তেমন কোনো কথাই হতো না। অন্য মেয়েদের চেয়ে রিয়া অনেকটা চাপা স্বভাবের ছিল। অবশ্য এটা আমার বেলায়ও প্রযোজ্য।

৩.
সালেহা আন্টির মুখে জামাই করে রাখার কথা কয়েকবার শুনে একদিন আমিও বলি- ঠিক আছে, রিয়াকে যত্ন করে বড় করেন। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নিয়ে এসে ওকে বউ করে নিয়ে যাব।
হয়তো সে দিন মজা করেই বলেছি, হয়তো কথার কথা বলেছি। হয়তো ভেতরে এমন কিছু ছিল বলেই বলেছি। সালেহা আন্টি যে কি বুঝল তা আমি বুঝিনি।

কলেজের পরীক্ষা শেষ, এ শহর ছাড়তে হবে আমায়। উচ্চশিক্ষার জন্য চলে আসি রাজধানীতে। স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো। সে স্বপ্ন পূরণ হলো না। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো ভর্তি হলাম। ছুটিতে গ্রামে যেতাম, আবার বাবার কাছেও যেতাম। বাবার কাছে গেলে সালেহা আন্টিদের বাসায় যেতাম। খুব অল্প সময় থাকা হতো, কারণ ছুটি অল্প।

একবার ছুটি পেয়ে বাবার কাছে যাই, গিয়েই শুনতে পাই রিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। সে দিন মনের ভেতরে কেমন লেগেছে, তা কাউকে বলতে পারিনি। সালেহা আন্টি যখন রিয়ার বিয়ের খবর দেন আমায়, তখন উনাকে খুব খুশিই দেখেছি। বুঝতে পারি, টাকাওয়ালা ভালো পাত্র পেলে বিয়ে তো দিবেই। কিন্তু মনের মাঝে একটা কষ্টও তাড়া দেয়। রিয়াকে যখন সালেহা আন্টি অন্য কোথাও বিয়ে দিবে, তবে আমায় কেন জামাই বানানোর কথা বলত।
৪.
রিয়ার জন্যে জমানো কথা কখনো ওকে বলা হয়নি, বলতেও হয়নি। আর রিয়াও কখনো কিছু বলেনি। ধরেই নিয়েছি এ ছিল আমার নীরব ভালোবাসা। এটাকে ভালোবাসা বলা যায় কিনা তাও ভাবি মাঝে মাঝে। প্রায় বছরখানেক পর যাই বাবার কাছে, ইচ্ছে করেই যাইনি রিয়াদের বাসায়। আমি গেছি শুনেই আন্টি খবর পাঠায়। না করতে পারিনি। আমি রিয়াদের বাসায় গিয়েই শুনি রিয়াও এসেছে। তা নিয়ে আমি তেমন কোনো কৌত‚হল দেখাইনি। খুব বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। আমি আর আন্টি গল্প করছি। রিয়া বাইরে বৃষ্টিতে ভিজছে। বৃষ্টি একটু কমতেই আমি বারান্দায় আসি। হঠাৎ চোখ পড়ে বারান্দার পাশেই বেলে মাটির দিকে। সেই পায়ের ছাপ, যা আমাদের বাসার পাশে দেখতাম। আন্টিকে ডেকে জিজ্ঞেস করি- এই পায়ের ছাপ কার?
– কার আবার, আমার রিয়ার। বৃষ্টি হলে ওকে ভিজতেই হবে।
– ছাপগুলো এমন কেন?
-ও, তাই বলো। রিয়ার দুই পায়ের পাতায় দুটো শক্ত মাংস আছে। মাটিতে পা দিলেই ছাপ এমন হয়।
আন্টির কথা শুনে একটু পর বেরিয়ে যাই। এই ফাঁকে ছোট একটা চিরকুট লিখি- ‘বিকেলে স্কুল গেটে দেখা করিও।’
সেটা রিয়াকে দিয়েই চলে আসি। বিকেলে ও ঠিক স্কুল গেটে যায়।
ওকে প্রশ্ন করি- রিয়া তুমি কি আমায় ভালোবাসো?
কোনো জবাব নেই ওর মুখে।
– রিয়া আমার অগোচরে বৃষ্টির সময় তুমি আমাদের বাসার পাশে কেন আসতে?
এবারো কোনো জবাব নেই ওর মুখে।
– রিয়া আমি কি ধরে নেব তোমার নীরবতাই বলে দেয় তুমি আমায়…
বলতেই রিয়া আমায় থামিয়ে দেয়।
– প্রায়ই আমি বৃষ্টির সময় বাসার পাশে একটা অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখতে পেতাম। সেটা যে তোমার তা আজই আমি বুঝতে পারি। তুমি যখন আমাকেই ভালোবাসতে তাহলে অন্যজনকে বিয়ে করলে কেন? কেন আন্টিকে বলতে পারোনি আমার কথা।
কোনো জবাব নেই রিয়ার মুখে। দুজনে মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে থেকে বিদায় নিই। প্রশ্ন ছিল অনেক, জবাব পাইনি একটিরও।

আজ ১৫ বছর পরও বৃষ্টি শুরু হলেই রিয়াকে মনে পড়ে। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে- এখনো কি ও আগের মতো বৃষ্টিতে ভেজে? এখনো কি সেভাবে ওর পায়ের ছাপ পড়ে? এখনো রিয়া আগের মতো আমায় ভালোবাসে? আমিও কি আজো রিয়াকে…।