পরিচয় থেকে পরিণয়

আগের সংবাদ

পেট্রোবাংলা ভবনে আগুন

পরের সংবাদ

ক্যামেরার জাদুকর মাহফুজুর রহমান

মেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ , ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

চলচ্চিত্র পরিচালক অথবা চিত্রনাট্যকারের কল্পিত ভাবনার দৃশ্যপট সিদ্ধহস্তে ক্যামেরায় ফুটিয়ে তোলার নিপুণ কারিগর চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান। বলতে গেলে, তিনি ছিলেন ক্যামেরার জাদুকর। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি চিত্রগ্রহণে আগ্রহী হন। বাবার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে তার চিত্রগ্রহণে হাতেখড়ি। চিত্রগ্রহণ শেখার উদ্দেশ্যে তিনি প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক জহির রায়হানের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবির সেটে গিয়েছিলেন। এছাড়া রফিকুল বারী চৌধুরী ও আবদুল লতিফ বাচ্চুর কাছ থেকে চিত্রগ্রহণের বিভিন্ন বিষয় শিখেছেন।

১৯৬৬ সালে ক্যামেরা শিক্ষানবিস হিসেবে চলচ্চিত্রে তার আগমন। সিনেমাটোগ্রাফারের পাশাপাশি মাহফুজুর রহমান খান একজন অভিনেতা ও প্রযোজকও ছিলেন। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘আমার জন্মভ‚মি’। পরবর্তী সময়ে তিনি একালের নায়ক, আলোছায়াসহ আরো বেশকিছু সিনেমাতেও অভিনয় করেন। ১৯৭২ সালে আবুল বাশার চুন্নু পরিচালিত ‘কাচের স্বর্গ’ সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে প্রধান সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে মেহেরবানু, হারানো মানিক, সখী তুমি কার, জোকার, আপন ভাই, গাঁয়ের ছেলে, ভাই ভাই, জীবন মৃত্যু, দোস্তী, ঝুমকা, সুখে থাকো, বদনাম, কালো গোলাপ, তালাক, অভিযান, নির্দোষ, সৎভাই, তিনকন্যা, তওবা, চাপা ডাঙ্গার বউ, আনন্দ অশ্রু, হাজার বছর ধরে, স্বপ্নডানায়, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেটুপুত্র কমলা, আগুনের পরশমনিসহ অসংখ্য সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন।

নায়ক রাজ রাজ্জাকের ‘অভিযান’ সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভ‚ষিত হন। মাহফুজুর রহমান সবসময়ই ভীষণ শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন তার গুরু আব্দুল লতিফ বাচ্চু, সাধন রায়, রফিকুল বারী চৌধুরী ও কিউ জামানের প্রতি। অভিযানের পর মাহফুজুর রহমান খান সহযাত্রী, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, হাজার বছর ধরে, আমার আছে জল, বৃত্তের বাইরে, ঘেটুপুত্র কমলা, আমার আছে জল, পদ্ম পাতার জল সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভ‚ষিত হন। তিনি সর্বশেষ অপূর্ব রানা পরিচালিত ‘উন্মাদ’ সিনেমার কাজ করছিলেন। গত ৩ নভেম্বর তিনি এই সিনেমার সর্বশেষ শুটিংয়ে অংশ নেন। মাহফুজুর রহমান খান চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণের জন্য ১০ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ৮ বার বাচসাস এবং একবার বিশেষ বিভাগে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেন। প্রয়াত নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে তিনি ক্যামেরার পেছনে ছিলেন।

এই কিংবদন্তি ১৯৪৯ সালের ১০ মে পুরান ঢাকার হেকিম হাবিবুর রহমান রোডে এক বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম হাকিম ইরতিজা-উর-রহমান খান ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তার দাদা হাকিম হাবিবুর রহমান খানের নামানুসারেই রোডের নামকরণ করা হয়েছিল। তার চাচা ই আর খান (ইরতিফা-উর-রহমান খান) ১৯৬০-৮০ এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের একজন খ্যাতনামা পরিচালক ও প্রযোজক ছিলেন। তাছাড়া প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক সহোদর এহতেশাম ও মুস্তাফিজ তার ফুফাতো ভাই। মাহফুজুর রহমান খানের স্ত্রী ড. নিরাফাত আলম শিপ্রা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০০১ সালের ২৭ আগস্ট মারা যান। দাম্পত্য জীবনে তারা নিঃসন্তান ছিলেন।

লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনকে বিদায় বলে এবার চলে গেলেন ক্যামেরার এই জাদুকর। গত বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টা ২৬ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। গত ২৫ নভেম্বর রাতে মাহফুজুর রহমান খান অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা তাকে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। অনেকদিন ধরে ডায়াবেটিস ও ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।

শুক্রবার ( ৬ ডিসেম্বর) তার প্রথম জানাজার নামাজ বাদ জুমা চকবাজার শাহী মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিকাল ৩টায় শেষবারের মতো তাকে আনা হয় এফডিসিতে। এখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। এফডিসিতে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় কিংবদন্তি এই চিত্রগ্রাহককে। তিনি চলে গেলেও চলচ্চিত্র ইতিহাসে থেকে যাবে তার শিল্পময় জীবনগাথা।

এসআর