রুম্পা হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

আগের সংবাদ

টিকেট কেটে শো দেখার অভ্যাস করতে হবে

পরের সংবাদ

কারাগারেও জঙ্গি জাল!

ইমরান রহমান :

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ , ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

দেশের বিভিন্ন কারাগারে কীভাবে রাখা হয় দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের? তাদের কি বিশেষ সেলে রাখা হয়; নাকি সাধারণ কয়েদিদের মতোই রাখা হয়- এসব প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। কারা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পৃথক সেলেই রাখা হয় জঙ্গিদের। প্রতি কক্ষে থাকেন কমপক্ষে ৩ জন জঙ্গি। আলাদা আলাদা সংগঠনের জঙ্গিদের রাখা হয় আলাদাভাবে। কয়েকদিন পর পর কক্ষ পরিবর্তনও করা হয়। তবে কারা অভ্যন্তরে প্রতিদিন দুই দফা একত্র হওয়ার সুযোগ রয়েছে জঙ্গিদের। আর এভাবেই গড়ে উঠছে তাদের নেটওয়ার্ক। ক্রমেই শঙ্কার কারণ হয়ে উঠছে কারাবন্দি জঙ্গিরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারে মেলামেশার সুযোগ থাকায় ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে জঙ্গিরা, যা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ জন্য জঙ্গিদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া উচিত কারা কর্তৃপক্ষের। সেই সঙ্গে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। যদিও তহবিল সংকটের অজুহাতে কাউন্সেলিং করা হয় না।

কারাগার সূত্র জানায়, সাধারণ বন্দিদের মতো সুযোগ-সুবিধা পান না জঙ্গিরা। জঙ্গি হিসেবে কারাগারে আসার পরই তাকে আলাদা সেলে নেয়া হয়। ওই সেলে শুধু জঙ্গিরাই থাকেন। প্রতিটি আলাদা আলাদা সংগঠনের জঙ্গিদের পাশাপাশি কক্ষে রাখা হয়। প্রতি কক্ষে রাখা হয় কমপক্ষে ৩ জন জঙ্গি। কিছু দিন পর পর পরিবর্তন করা হয় কক্ষ। ফলে কোনো কক্ষে একজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি থাকলে একই কক্ষে থাকার সময় অন্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। শেখানো হয় বিশেষ সাংকেতিক ভাষা। তারা যখন কক্ষ পরিবর্তন করেন তখন তাদের মাধ্যমেই অন্যদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়। কথা বলা হয় ইশারায়।

সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকালে কয়েদি জঙ্গিরা ঘুম থেকে ওঠার পর প্রতি কক্ষে খাবার পৌঁছে দেয়া হয়। এরপর দিনের একটি বিশেষ সময় সূর্যের আলোয় হাঁটার সুযোগ দেয়া হয় জঙ্গিদের। তখন একে অপরের সঙ্গে দেখা করা ও কথা বলার সুযোগ পান। এরপর খাওয়ার সময়ও একে অপরের সান্নিধ্য পান তারা। মূলত এই দুই সময়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা একে অপরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। শিষ্যদের বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়। এ ছাড়া অবকাঠামোগত কারণে প্রতিটি কক্ষ ও ভবন কাছাকাছি হওয়ায় জোরে আওয়াজ করে এবং গোপনীয় ইশারায় কথা বলাবলি করেন তারা। এদিকে কারাগারে থাকা জঙ্গিদের কাছে বাইরে থেকেও তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহের অজুহাতে তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। যদিও কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, জঙ্গিদের বেলায় এ ধরনের সুযোগ নেই। সাক্ষাতের সময় সাক্ষাৎকারীর সব তথ্য জেনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতিতে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়। আর বাইরে থেকে কাপড়সহ কোনো কিছু পাঠানো হলে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেই সেগুলো সংশ্লিষ্ট জঙ্গিকে পাঠানো হয়।

কারা সদর দপ্তর সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর কারাগার ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সারাদেশের বিভিন্ন কারাগারে ৫৫৯ জন জঙ্গি রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৭৮ জন জেএমবির, হিজবুত তাহরীরের ৮, হরকাতুল জিহাদের ৩৮ ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৩৫ জন। যার মধ্যে অন্তত ৫০ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গি বলে জানা গেছে। এদের নেতৃত্বেই ভয়ঙ্কর জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে কারাগারে। যারা পরবর্তীতে জামিনে বের হয়ে কারাগার থেকে পাওয়া নির্দেশ ও প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন নাশকতায় অংশ নেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কারাগারের দুইজন সিনিয়র জেল সুপার ভোরের কাগজকে বলেন, যেহেতু জঙ্গিরা আর সবার থেকে আলাদা ধরনের বন্দি; সে জন্য তাদের আলাদা সেলে রাখা হয়। প্রতি কক্ষে কমপক্ষে ৩ জন জঙ্গি থাকেন। এমনিতে তাদের মেলামেশা করার সুযোগ খুবই কম। তবে খাবার দেয়ার সময় এবং দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে রোদে হাঁটতে দেয়ার সময় তারা পরস্পর মিলিত হতে পারেন। এ সময় তাদের ওপর পর্যবেক্ষণ রাখা হলেও তাদের কথাবার্তা তেমন বোঝা যায় না। এ ছাড়া অবকাঠামোগত কারণে সব ভবন পাশাপাশি হওয়ায় বারান্দায় এসে ইশারাতেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। যা কারারক্ষিদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

সূত্র জানায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বকুল সেলে রাখা হয় জঙ্গিদের। তবে, দুর্ধর্ষ কোনো জঙ্গিকে এখানে বেশি দিন রাখা হয় না। কয়েকদিন পার না হতেই পাঠিয়ে দেয়া হয় কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি সেলে। হাই সিকিউরিটি সেলের জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, সারাদেশের সব কারাগার থেকে হাই সিকিউরিটি কারাগার ভিন্ন। এখানে একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। এক সময় রোদে হাঁটার ব্যবস্থা থাকলেও এখন আর নেই। আর খাবারও সবার রুমে পৌঁছে দেয়া হয়। তবে, আদালতে হাজিরার জন্য যদি একই দিনে তারিখ পড়ে তাহলে তারা একসঙ্গে যাওয়ার সুযোগ পান। এ সময় কোনো আলাপ-আলোচনা করে থাকলে আমাদের কিছু করার থাকে না।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, কারাগারে মেলামেশার সুযোগ থাকায় জঙ্গিদের মধ্যে যে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে সেটি আমাদের জন্য এলার্মিং। কারণ জামিন পাওয়ার পর এই নেটওয়ার্ট সম্পৃক্ত হয়। যা সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এ ছাড়া টাকা দিলেই কারাগারে সব সুযোগ-সুবিধা মেলে, এ অভিযোগ পুরনো। এই প্রেক্ষাপট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কারাবন্দি জঙ্গিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলো কাউন্সেলিং করতে পারলে আমরা কেন পারব না। এ বিষয়ে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

কারাগারে জঙ্গিদের মেলামেশার সুযোগের বিষয়ে কথা বলতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুব উল ইসলাম, সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী, কারা অধিদপ্তরের ডেপুটি কারা মহাপরিদর্শক টিপু সুলতান ও কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।