সপ্তম স্বর্ণ জয় বাংলাদেশের

আগের সংবাদ

ত্যাগী

পরের সংবাদ

আলুর ঘাটি

সৈয়দা ইয়াসমিন আরা,জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক, আমেরিকা

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯ , ৩:৩৩ অপরাহ্ণ

আমি আর পলি দুই বান্ধবী। দুজনের মাঝে একেবারে অন্তরাত্মার টান। যেমন হয় দুই বোনে বোনে। তো যা কিছুই রান্না হোক, দুজনে একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করবোই। এই যেমন পলির রান্না করা মাছ মনির খুব প্রিয়। পলি মাছ রান্না করলে, একবাটি চালান হবেই আমার কাছে। তেমনি আমার হাতের প্রিয় কিছু রান্না পলির কাছে চালান যাবেই। এমনি এক চালাচালির ভিতর ঘটে গেল সেই বিখ্যাত ঘটনা!

আমার দেশের বাড়ি বগুড়া। বগুড়ার একটি বিশেষ রান্না আলুর ঘণ্ট (আঞ্চলিক ভাষায় বলে আলুর ঘাটি)। এই আলুর ঘাটি পলির খুব প্রিয়। এক সন্ধ্যারাত্রিতে আমি আলুর ঘাটি রান্না করে, পলির ঘরের উদ্দেশে যাওয়ার জন্য যেই না দরজা খুলেছি, অমনি আগে থেকেই দরজায় ওতপেতে থাকা এক স্প্যানিশ যুবক একহাত দিয়ে বুকে ধাক্কা মেরে আমাকে আবার ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। বেকুব ব্যাটা জানে না, আমি শুধু অশরীরী জিন-ভ‚ত ডরাই, মানুষরূপী ভয়ঙ্কর পিচাশকে কখনোই ভয় পাই না। এদের প্রতিহত করার মনের জোর নিয়েই আমি চলি। তুই কোন ছ্যারা রে? তোর কি অবস্থা করি দ্যাখ এবার…
যুবকটির ধাক্কা খেয়ে আমি এক মুহূর্তের ভেতর বুঝে ফেলেছি কি ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। মনে মনে আল্লাহকে ভরসা করে আমার কেরামতি দেখানো শুরু করলাম বেচারা স্প্যানিশ ছ্যাঁরার উপর। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া- এক্কেবারে খাস বাংলায় গালিগালাজ। যেকোনো জাতি বিশেষ মুহূর্তে কিন্তু মাতৃভাষার গালির প্রতি ভীষণ টান অনুভব করে। আমিও তাই করলাম, ওই ওই করোস কি, মাগো, বাবাগো, অমুক বাচ্চা… তমুক বাচ্চা…। ওই হারামি তুই কেএএএ… এক্কেবারে সেইরকম একটা চিল্লান।
এর পাশাপাশি আমিও গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওই ছ্যাঁরাকে দিলাম পাল্টা ধাক্কা। ওই ছ্যাঁরা হয়তো ভেবেছিল অবলা নারী ধাক্কাতেই কাইত হয়ে যাবে, তারপর তার পৈশাচিকতার নমুনা পেশ করবে। তাই নাকি রে? এমন আহ্লাদী আশা নিয়ে এসেছো? তোর এই আশার ওপর আজ আমি আলুর ঘাটি ঢালবো রে বাছাধন। মৃত্যু পর্যন্ত শিউরে শিউরে উঠবি আমাকে স্মরণ করে। যুবকটি আমার আচমকা ধাক্কা সামলাতে না পেরে পিছনে টালমাটাল হতে হতে আমি ঝেড়ে দিলাম এক লাথি। ব্যাস ছ্যাঁরা ধপাস করে ফ্লোরে যেই না বসে পড়েছে, অমনি সদ্য চুলা থেকে নামানো টাটকা গরম আলুর ঘাটি ব্যাটার মুখের বরাবর ছুড়ে পরিবেশন করলাম। নে, এবার গরম গরম আলুর ঘাটি খ্যা।
তারপরই দরজা বন্ধ করে ৯১১ নম্বরে কল। বদ্ধ দরজাতে তখন ভীষণ ধুমাধুম বাড়ি আর ধাক্কা চলছে। কারণ হলো, মহাশয় একা অতিথি হয়ে আমার বাড়ি আলুর ঘাটি খেতে আসেনি, সঙ্গে ছিল আরেকজন। উনি নাকি লিফটের কাছে পাহারারত অবস্থায় ছিলেন এবং দুজনের কাছেই পিস্তল ছিল। এইসব আমি পরে পুলিশ থেকে জেনেছি। যাই হোক, ৯১১ নম্বরে কল করার পর আমি যখন হরহর করে তাদের ঘটনা বলে সাহায্যর আবেদন করছি, তারাও শুনতে পাচ্ছিল দরজায় ভীষণভাবে করাঘাতের শব্দ। ১০ মিনিট যায়নি, দরজার ওপাশ থেকে পুলিশের কণ্ঠ পেলাম। ম্যাম চিন্তার কিছু নাই, তুমি নিশ্চিন্তে দরজা খুলতে পারো, আমরা পুলিশ। আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, এত তাড়াতাড়ি পুলিশ আসবে কোথা থেকে? ৯১১ ওয়ালাদের পুুুুনরায় পুলিশের উপস্থিতির কথা জানালাম। তারাও বললো অসুবিধা নাই, তুমি নিশ্চিন্তে দরজা খুলতে পারো, তারা সত্যিকারের পুলিশ, তোমাকে সাহায্য করতে এসেছে।
আমি দরজা খোলার পর যে দৃশ্য দেখলাম, একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। একটা না, দুটি বলদ সেখানে ত্রাহি চিৎকার করছে। একটা গরম আলুর ঘাটিতে ঝলসানো পোড়া মুখ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে চোখ বন্ধ করে গ্যাঁ গঁ্যঁ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করছে। অন্যজনকে পুলিশ পিছমোড়া হ্যান্ডকাফ পরিয়ে উপুড় করে শুইয়ে রেখে তার ওপর সোয়ারি হয়ে পিস্তল তাক করে বসে আছে। এমন দৃশ্য দেখে আমি বেশ মজা পেয়ে বলে উঠলাম, ওয়াও! আরো ২-৩ জন ছেলেমেয়ে ওদের ঘিরে আছে। তারা সবাই সিভিল পোশাকে পুলিশ। মুহূর্তে ধুপধাপ আওয়াজে সিঁড়ি বেয়ে কম করে ৮-১০ পুলিশ এসে হাজির। যার ওপর পুলিশ সোয়ারি ছিল, আমি ঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালি আর অগ্নিঝরা দুই চোখে তার সে কি ঘৃণা। মুহূর্ত মাত্র দেরি না করে সোয়ারী পুলিশ তার মাথায় পিস্তলের বাঁট দিয়ে দিল এক গোত্তা, অমনি একটা থ্যাক করে আওয়াজ। হারামীর নাক-মুখ এক্কেবারে থ্যাঁতলা। পুলিশ আমাকে দুইজনের মুখ দর্শন করিয়ে বললো- তুমি এবার তোমার ঘরে চলে যাও, আমরা এদের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে চললাম। পুলিশদের ধন্যবাদ দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
দুই দিন পর আমার ফোনে কোর্ট থেকে কল আসল। আমার পক্ষ হয়ে পুলিশ সেই দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিল। কোর্ট থেকে সরকারি যে উকিল আমার পক্ষ হয়ে লড়বে, সে আমার সহযোগিতা চেয়েছিল। আমার সাফ জবাব, আমি কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না, এত সময় আমার নেই। তোমাদের যা মনে চায়, তাই করো তাদের নিয়ে। অবশ্য শেষমেশ একটু মিচকা দুষ্টামি করতে ছাড়লাম না। আমি বললাম, ওদের এমন জরিমানা করো, যাতে সারাজীবন জরিমানা শোধ করতে করতে ফক্কিন্নি হয়ে যায়। যার মুখ ঝলসিয়ে বেগুনপোড়ার রূপ দিয়েছি, সে যেন ইহকালে কসমেটিক সার্জারি করে আর চাঁদবদনী হতে না পারে। আমার কথা শুনে উকিলের হা হা করে সে কি হাসি। বলে, তুমি তো খুব ফানি। এক সপ্তাহ পরে আমার ঠিকানায় কোর্ট থেকে নোটিস এলো, তাদের সাজা হয়েছে এবং আগামী এক বছর আমি পুলিশ প্রটেকশনে থাকব। তারা বা তাদের কোনো সঙ্গী যেন আমার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি- আমাদের দেশের মেয়েরা যদি বুকে কিছুটা সাহস ধারণ করে চলত, তবে অযাচিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কত্তো সহজ হতো। আরে তুমি মেয়ে আর ওরা ছেলে। আল্লাহ দুজনকে সমান বুদ্ধি, বিবেক, হাত-পা দিয়েছেন। মেয়েদের গায়ের জোর কম হলেও বুদ্ধির জোর তো আছে। কেন আমি পারব না, আমি বেচারি, আমি অবলা, চিন্তা করে নিজেকে ধংস করব? আল্লাহু আমার সঙ্গে আছেন, অন্যায় প্রতিহত করার জন্য উনি সব সময় আমাকে সাহায্য করবেনই। এই বিশ্বাস ভরসা করে চললে বাংলার মেয়েরা সাফল্য পাবেই। বুকে সাহস আর বুদ্ধি থাকলে সামান্য আলুর ঘাটিই অনেক বড় অস্ত্র হয়ে উঠে, হি.. হি.. হি…