লজ্জা

আগের সংবাদ

যে রাতে আমার স্ত্রী

পরের সংবাদ

হৃদয়ের স্থপতি রবিউল হুসাইন

স.ম. শামসুল আলম

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ১:২৪ অপরাহ্ণ

১৯৮৭ সালের কথা। আমি একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি করি। তখন শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসের অফিস ছিল ধানমন্ডি ১৫ নম্বর সড়কে। একটি প্রজেক্টের আর্কিটেকচারাল এবং স্ট্রাকচারাল ড্রইংয়ে সামান্য গরমিল থাকায় আমাকে যেতে হলো শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসের আর্কিটেক্টের কাছে। দরজায় নাম দেখে চমকে যাই ইনিই কি তিনি? এই স্থপতি রবিউল হুসাইন কি কবি রবিউল হুসাইন? ভেতরে প্রবেশ করে ড্রইংটি নিয়ে কথা বললাম। তিনি খুব সহজেই সমাধান দিলেন। আসবার সময় বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার আপনি কি কবিতা লেখেন?
তিনি আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি কবিতা পছন্দ করেন?
বললাম, জি¦ স্যার।
তিনি বললেন, তাহলে তো আপনি মহাজ্ঞানী। আর যে কবিতা লেখে সে বদ্ধ পাগল না না, পাগল নয়, উন্মাদ।
আমি উন্মাদ আর পাগল শব্দের পার্থক্য খোঁজার চেষ্টা করি। তিনি হেসে বললেন, টুকটাক লিখি।
আমি বললাম, স্যার যদি কিছু মনে না করেন আপনাকে একটি কবিতা শোনাই।
তিনি উৎসুক হয়ে তাকাতেই শুরু করলাম কবিতা পাঠ
একটি মানুষ হাঁটতে হাঁটতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়,
তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত বের হয়
কীভাবে মাধ্যাকর্ষণহীন হতে হয় সেই কৌশল বুঝতে।

একটি মানুষ সাঁতরাতে সাঁতরাতে পাতালে ডুবে যায়,
তার দেহ থেকে বাতাসের বুদবুদ ফুটে শূন্যের ফুল হয়
পৃথিবীর গভীরে সেই কেন্দ্রবিন্দু খুঁজতে।
…………
পুরো কবিতাটি আমার মুখস্থ ছিল। শুনে তিনি তো অবাক। বললেন, আরে এ কবিতা আপনি কোথায় পেয়েছেন?
বললাম, ইত্তেফাকে বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।
: আর সেখান থেকেই আপনি মুখস্থ করেছেন?
: জি¦ স্যার।
: আমার লেখা এসব বিদঘুটে কবিতা কেউ মুখস্থ করে রাখে আমার জানা ছিল না। আপনি লেখেন নিশ্চয়ই?
লাজুক হেসে বললাম, জ্বি স্যার, একটু-আধটু।
কবি রবিউল হুসাইনের সাথে সেই প্রথম আমার পরিচয়। কিন্তু তাঁর লেখার সাথে পরিচয় ছিল ১৯৭৯ সাল থেকে। তখন আমার একটা অভ্যাস ছিল, কারো লেখা কোনো কবিতা খুব ভালো লাগলে মুখস্থ করতাম। আল মাহমুদ হোক, শামসুর রাহমান হোক অথবা বিখ্যাত কবি নন এমন অনেকের কবিতাও মুখস্থ করতাম। তো সেদিন কবি রবিউল হুসাইন ভীষণ খুশি হলেন তাঁর লেখা কবিতা আমার মুখ থেকে শুনে। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হিংসার নক্ষত্র এক’ প্রকাশিত হয়। বইটি রবিউল হুসাইনকে দিতে গেলাম তাঁর অফিসে। তিনি ভীষণ খুশি হলেন। বইটি নেড়েচেড়ে দেখলেন, কিছু কিছু পড়লেন আমার সামনেই।
এরপর অনেক বছর স্যারের সাথে দেখা হয়নি। পেশাগত কারণে আমাকে ঢাকার বাইরে, এমনকি দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। আবার যখন নতুন করে পরিচয় হলো সেটা ১৯৯৩ সাল। আমার সৌভাগ্য বলব। আমাদের কোম্পানি কচি-কাঁচা ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পেল এবং যথারীতি শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল। এ সময় তাদের অফিস ছিল জাহানারা গার্ডেন, ফার্মগেট। কচি-কাঁচা ভবনের স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন। আর আমি সেখানে গেলাম সাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। কচি-কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই তো আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশি। কারণ তিনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন। কচি-কাঁচার আসরে মাঝে মধ্যে আমার ছড়া-কবিতা-গল্প প্রকাশিত হতো এবং প্রায় নিয়মিত শাব্বীর শিশুসাহিত্য আসরে লেখা পাঠ করতে যেতাম। আমিও ভবন নির্মাণের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে পরিচিত হতে পারলাম এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারলাম কবি সুফিয়া কামাল, ড. আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, স্থপতি শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, স্থপতি রবিউল হুসাইন, কবি শামসুর রাহমান, কবি মাহবুব তালুকদার, বেগম সম্পাদক নুরজাহান বেগম, শিল্পী হাশেম খান, ড. এ টি এম শামসুল হুদা, গবেষক শামসুজ্জামান খান, কবি রুবী রহমান, ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে। কিন্তু সব সময় বেশি যোগাযোগ করতে হয়েছিল স্থপতি রবিউল হুসাইনের সঙ্গে। প্রায়ই তাঁর অফিসে আমাকে যেতে হতো কাজের প্রয়োজনে। তিনি অনেক মজা করে কথা বলতেন এবং তাঁর থেকে প্রায় ২২ বছরের ছোট হওয়া সত্ত্বেও আমাকে ‘আপনি’ বলতেন। অবশ্য অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত ‘তুমি’ বলাতে পেরেছিলাম। একদিন মজা করে বললেন, দেখ স. ম. আমার জীবন পুরোটাই সেকেন্ড হ্যান্ড।
আমি বললাম, মানে বুঝলাম না স্যার।
তিনি পাইপে টান দিয়ে হেসে বললেন, সেকেন্ড হ্যান্ড মানে সেকেন্ড হ্যান্ড। পুরো জীবন সেকেন্ড হ্যান্ড। একটা বিয়ে করলাম সেকেন্ড হ্যান্ড, একটা গাড়ি কিনলাম সেকেন্ড হ্যান্ড, বাড়িটাও সেকেন্ড হ্যান্ড। তাহলে আমার জীবন সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে গেল না?
আমার পাশে বসা স্থপতি মইনুল হোসেন আর মোস্তফা হালী কুদ্দুস হেসে ফেলেন তাঁর কথা শুনে। আমিও হাসি। জাতীয় স্মৃতি সৌধের স্থপতি মইনুল হোসেন তখন কোনো কারণে বেশ চুপচাপ থাকতেন, তবু তিনি রবিউল হুসাইনের কথায় না হেসে পারেন না।
কখনো কখনো স্যারের সামনে বসে থেকে আমাকে কিছু কিছু নকশা আদায় করে নিতে হতো। কারণ তিনি অনেক জরুরি বিষয়ও ভুলে যেতেন মাঝে মাঝে। ফলে প্রায়ই আমাকে স্যারের কাছে যেতে হতো। একদিন তিনি আমার সাথে পরামর্শ করে পেন্সিল দিয়ে রাফ ড্রইং করছেন তখন পিয়ন এসে এক ভদ্রলোকের নাম বলল, দেখা করতে চায়। তিনি অনুমতি দিলে ভদ্রলোকটি এসে একটি খাম দিলেন তাঁর হাতে। ‘ঠিক আছে’ বলে ঘাড় নাড়িয়ে ভদ্রলোকটিকে বিদায় দিয়ে খাম থেকে একটি কাগজ বের করে আমাকে বললেন সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাম স. ম.।
জিজ্ঞেস করলাম, কিসের সার্টিফিকেট স্যার?
: মাতলামির। এখন থেকে পুলিশ আর আমাকে ধরে বলতে পারবে না এই ব্যাটা, মাতলামি করিস ক্যান? এটা হলো মদ্যপানের লাইসেন্স। এখন থেকে আমি লাইসেন্সধারী মদ্যপ।
এরকম ভাষার সাথে আমি তেমন পরিচিত নই। কিন্তু স্যারের কথা বলার ভঙ্গি আমাকে আকৃষ্ট করতো সব সময়।
কচি-কাঁচা ভবনের অডিটোরিয়ামের চেয়ার কেমন হবে তা দেখতে আমরা একবার নারায়ণগঞ্জ গেলাম একটি ফাইবার গ্লাস ফ্যাক্টরিতে। একটি মাইক্রোতে দাদাভাই, রবিউল হুসাইন, সহকারী আর্কিটেক্ট সোমেন বাবু, আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার এবং আমি। যাবার পথে হঠাৎ রবিউল স্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, থামো থামো খিরা খাব। ঐ দেখ খিরা বিক্রি করছে।
গাড়ি সাইড করে থামান হলো। দাদাভাই বললেন, দেখছেন রবিউল সাহেব, যে পানিতে খিরা ধুয়ে নিয়ে কাটছে, আবার কাটার পরেও সেই পানিতে ধুচ্ছে।
দাদাভাইয়ের কথা শুনে সবাই হেসে ফেললাম। স্যার বললেন, কি যে বলেন দাদাভাই, ময়লা পানি কোনো ব্যাপার না কাদা মাখিয়ে দিলেও হজম হয়ে যাবে।
তাঁর কথার কারণে সেই খিরা সবাই খেলাম, তবে বোতলের পানিতে ধুয়ে। যাওয়া-আসার সারাপথ মজা আর মজা হলো। আনন্দে দাদাভাই গান গাইলেন গুনগুন করে। রবিউল স্যার জোক বললেন। এসব স্মৃতি কখনো ভুলতে পারব না।
কচি-কাঁচা ভবন হস্তান্তরের পর দাদাভাই আমাকে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার কার্যনির্বাহী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। ফলে পরিষদের সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বেড়ে গেল। উপদেষ্টা হিসেবে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, হাশেম খান, রবিউল হুসাইন, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহবুব তালুকদার, শিল্পী আইনুল হক মুন্না, সৈয়দ আব্দুল করিম, শ্রী নির্মলকান্তি দাশগুপ্ত, দিল মনোয়ারা মনু প্রমুখ।
১৯৯৮ সালে মুতী ভাই মারা গেলেন। দাদাভাই খুব ভেঙে পড়লেন। এই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর কবি সুফিয়া কামাল মারা গেলেন। আমরা একটি শোকসভা করব বলে প্রস্তুতি চলছে। দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। দাদাভাই শোকসভার প্রস্তুতি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ঠিক তখন অকস্মাৎ দাদাভাইও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ৩ ডিসেম্বর। এই সব শোকের মধ্যেও আমি রবিউল হুসাইনকে দেখেছি দৃঢ় মনোবল নিয়ে থাকতে। তিনি কচি-কাঁচার মেলার একজন উপদেষ্টা হিসেবে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সব সময়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সময়ও তাঁকে দেখেছি ভীষণ ব্যস্ত থাকতে। দাদাভাইয়ের মৃত্যুর পর কচি-কাঁচার মেলার পরিচালক হন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। পরিষদের সভায় আমি দাদাভাইয়ের কবর পাকা করার প্রস্তাব উত্থাপন করি এবং সিদ্ধান্ত হয় মেলার ফান্ডে টাকা নেই বলে সম্পূর্ণ খরচ আমি বহন করব আর নকশা তৈরি করে দেবেন রবিউল হুসাইন।
দিন যায়, মাস যায়, নকশা আর তৈরি হয় না। স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই তাগাদা দেই, তিনি আগের স্বভাবে বলেন, ঐ যা, ভুলে গেছি। দেখি, দু-চার দিনের মধ্যেই করে দেব।
যখন দেখলাম, আর হচ্ছে না। স্যারের সঙ্গে কথা বলে তাঁর অফিসে গিয়ে সামনে বসে থেকে নকশা তৈরি করালাম। তাঁর টেবিলের ওপর সিলিং থেকে ঝুলানো থাকে প্লাম্ব বব, পাখির পাখনা, চামড়া, ট্রাংগেল, ট্রাইস্কয়ার ইত্যাদি। আমি সেগুলো দেখি আর তিনি নকশা আঁকেন। দাদাভাইয়ের কবরটি পাকা করার পর কোনো এক মৃত্যুবার্ষিকীতে রবিউল হুসাইন দাদাভাইকে নিয়ে যুগান্তরে একটি লেখা লেখেন। সেখানে তিনি আমাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন এই কবরের নকশা করা থেকে শুরু করে কবর পাকা করা পর্যন্ত সব কৃতিত্ব আমার।
এবছর ২০১৯-এর বইমেলায় আমার ‘কিশোরসমগ্র’ বইটি প্রকাশিত হয়। বইটির উৎসর্গ পাতায় লিখেছি ‘কবি রবিউল হুসাইন আপনি আমার হৃদয়মন্দির স্থপতি।’ এই হৃদয়মন্দির স্থপতি প্রিয় মানুষটি এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন ভাবতে পারিনি। যেখানেই থাকুন স্যার, আপনি ভালো থাকুন স্যার। আপনার সৃজনশীল কর্ম কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, শিল্প সমালোচনা, স্থাপত্যকলা সব ধরনের লেখা আমাদের অনুপ্রাণিত করুক সারাজীবন। আপনি আমার হৃদয়ে যে মন্দির স্থাপন করেছেন সেটা পবিত্র থাক জনম জনম।