চট্টগ্রামে টিসিবির পেঁয়াজ আদালত হয়ে নিলামে

আগের সংবাদ

ভারতের পুলিশের গুলিতে চার ধর্ষক নিহত

পরের সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধু

স্থাপনা-স্মৃতিফলক কতদূর

ঝর্ণা মনি :

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর শাহবাগে যেখানে জাতীয় শিশু পার্কটি রয়েছে, সেখানে ছিল নৌকার আদলে একটি মঞ্চ। মঞ্চটি তৈরি করেছিলেন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে অসীম অবদানের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান বঙ্গবন্ধু। ইন্দিরা গান্ধীর আগমনকে সম্মান জানানোর জন্যই মঞ্চটি নির্মিত হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই ইন্দিরা মঞ্চে নেহেরু কন্যাকে রাজকীয় সংবর্ধনার পাশাপাশি বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সেই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয় ইন্দিরা মঞ্চটি। সেখানে নির্মাণ হয় শিশু পার্ক।

স্বাধীনতার ৪০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানায় বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে তিনশ জনকে সম্মাননা জানানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো তিনশ জন বন্ধুকে সম্মাননা জানানো হবে। বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি তাদের নামে স্থাপনা এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করার দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকরা। তারা জানান, ভারত পাশে না থাকলে বিজয় প্রলম্বিত হতো। ১ কোটি শরণার্থীর আশ্রয়, খাবার-চিকিৎসার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল তারা। বিশ্ব জনমত গঠনে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা অসামান্য। কিন্তু তার নামে রাজধানীতে কোনো স্থাপনা নেই। হয়নি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ। যদিও ২০১১ সালের ২৫ জুলাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধীনতার সম্মাননা’ দেয়া হয় ইন্দিরাকে। তার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী।

গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতেই ইন্দিরা গান্ধী, রণাঙ্গনের নায়ক জগজিৎ সিং অরোরা, একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক ওডারল্যান্ড, আমেরিকান কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাড, জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যাড, সিনেটর এডওয়ার্ড, ফ্রান্সের জাতীয় বীর আর্দ্রে মার্লোসহ মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধুদের নামে স্থাপনা এবং সড়কের নামকরণ করা হলে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে বিশ্বের তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে।

সালাম আজাদের ‘কন্ট্রিবিউশন অফ ইন্ডিয়া ইন দি ওয়ার অফ লিবারেশন অফ বাংলাদেশ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এক হাজার ৫০০ ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। ২০১০ সালের দিকে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্যদের সম্মাননা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই সময় লে. জে. বিজয় কুমার সিংহের নেতৃত্বে ভারতীয় একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এলে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম ঘোষণা দেন, তাদের সম্মানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হবে। যেখানে নিহত সৈনিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ঘোষণাতেই আটকে রয়েছে এ উদ্যোগ।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণেরও পরিকল্পনা করছে সরকার। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই স্মৃতিফলক নির্মাণ হবে বলে ভোরের কাগজকে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, আরো আগেই এ পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু নানাবিধ কারণে এত দেরিতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে এদেশে ছুটে এসেছিলেন সিনেটর এডওয়ার্ড। আগরতলা শরণার্থী শিবির দেখেছেন ঘুরে ঘুরে। স্বাধীনতার পরপরই আবার এসেছেন। ঐতিহাসিক যে বটগাছটি পাকিরা ধ্বংস করেছিল, সেখানে বর্তমান বটগাছটি তার লাগানো। আমেরিকান দূতাবাসের রাস্তাটি সিনেটর এডওয়ার্ডের নামেই করা উচিত। একইভাবে চট্টগ্রামে গোয়েঙ্কারের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হতে পারে। তিনি যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন। বয়সের ভারে ন্যূব্জ ফ্রান্সের জাতীয় বীর আর্দ্রে মার্লো বলেছিলেন আমি উর্দি পড়ে বাংলাদেশের পক্ষে লড়ব। বারিধারায় রোড নাম্বার এক, দুইয়ের পরিবর্তে বিদেশি বন্ধুদের নামে করা যায়। বিদেশের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রায় পাঁচ দশকেও তাদের সম্মানে এই উদ্যোগটি না নেয়ায় হতাশ গবেষকরা। এ জন্য সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন তারা।

এ ব্যাপারে একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, দেড় যুগ ধরে ৬ ডিসেম্বর আমরা ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির বার্ষিকী পালন করি। একই দিনে ভারত এবং ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের গতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ভারতের স্বীকৃতি। ভারত স্বীকৃতি না দিলে মুক্তিযুদ্ধে হয়তো আমাদের আরো দীর্ঘকাল লড়তে হতো। এই স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বৈধতা আদায়ে একটি চাপ তৈরি হয়। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলও চাঙ্গা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের এই গবেষক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মহান বন্ধু ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী।

দুই বছর আগে ইন্দিরা গান্ধীর জন্মশত বর্ষ পালনের সময় আমাদের দাবি ছিল রাজধানীর একটা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম তার নামে করার জন্য। কিন্তু কেন যেন সরকার এক্ষেত্রে উদাসীন। তুরস্কের জাতির পিতা কামাল আতাতুর্কের নামে সড়ক আছে। ঠিক আছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তো তুরস্ক ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। যে ইন্দিরা গান্ধীর কারণে ৯ মাসে আমরা বিজয় পেয়েছি তার নামে একটা স্থাপনা না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব করেছিলাম গুলশান কূটনৈতিক পাড়াটা যা গুলমান এভিনিউ নামে পরিচিত সেটি ‘ইন্দিরা গান্ধী এভিনিউ’ নামে করার জন্য।

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সম্মতও হয়েছিলেন। ভারতীয় দূতাবাসের সড়কটি বিজয়ের আরেক নায়ক রণাঙ্গনের জগজিৎ সিং অরোরার নামে করার কথা হয়েছিল। আনিসুল হকের মৃত্যুতে এই উদ্যোগ থেমে যায়। তিনি বলেন, এই কাজটি করলে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো বাড়বে। এ ছাড়া বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রনায়কদের নামে কোনো সড়কের নামকরণ করলে আমাদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরো বাড়বে। সেই দেশের তরুণ প্রজন্ম যখন জানবে ঢাকাতে তাদের রাষ্ট্রনায়কদের নামে রাস্তার নামকরণ আছে আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বহির্বিশে^র জানার আগ্রহ বাড়বে। সারা বিশে^র প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ-তিতিক্ষা-বীরত্বগাঁথা ছড়িয়ে দিতে পারব। আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু সবকিছুর জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত জরুরি।

ওয়ার ক্রাইমস্ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের প্রধান ডা. এম এ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, একাত্তরের এপ্রিলে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে চোখের সামনে আমার দুই সহযোদ্ধা ভারতীয় ক্যাপ্টেন রানা এবং ক্যাপ্টেন মালহোত্রা শহীদ হন। ভারতীয় শহীদদের পরিবার কেমন আছে আমরা তা জানি না। একবারও তাদের খোঁজ নিইনি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এজন্য ২০০৪ সালে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে আমি একটি চিঠি লিখি। সোনিয়া গান্ধী ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে আমাকে চিঠির উত্তরও দেন। চিঠিটি আমি সযতনে রেখে দিয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধের এই গবেষক বলেন, ২০০৩ সাল থেকে বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানানো, তাদের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্থাপনা এবং নামকরণের জন্য আমরা আন্দোলন করছি। অন্য দেশের জন্য তারা নির্ধিদ্বায় নিজের মূল্যবান প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। এর কোনো মূল্য হয় না। তাদের প্রতি সম্মান জানানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু তাদের নামে কোনো স্থাপনা, সড়কের নামকরণ করা হলে কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হতে পারব।

ডিসি