হৃদয়ের স্থপতি রবিউল হুসাইন

আগের সংবাদ

প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

পরের সংবাদ

যে রাতে আমার স্ত্রী

আন্দালিব রাশদী

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ১:৩১ অপরাহ্ণ

[গতসংখ্যার পর]
শবনম বলে, শার্ট না পরলেও চলবে।
অবন্তী শবনমকে বলে, বোকা মেয়ে, মেয়ে মানুষের সামনে ছেলেদের শার্ট পরতে হয় আর ছেলে মানুষের সামনে ছোট মেয়েদেরও জামা পরতে হয় এটাই নিয়ম।
শবনম জিজ্ঞেস করল, এই নিয়ম তুমি কোথায় শিখলে। রানু ফুপু বলেছে। আমার রানু ফুপু অনেক নিয়ম জানে।
তাহলে আমারও কতোগুলো নিয়ম শিখতে হবে, এই বলে শবনম তার জাদুর ব্যাগ থেকে একটার পর একটা জিনিস বের করে অবন্তীকে দিতে শুরু করল। ব্যাগ থেকে বের হলো এক সেট রঙ পেন্সিল, একটা বাটি ডল, ছোট টেডি বিয়ার, মিস্টার বিন-এর একটা সিডি, এক হালি কমলা, তিনটা জুস প্যাকেটÑ স্ট্রবেরি, বø্যাকবেরি এবং ক্র্যাচবেরি, একটা ছাতা, মিল্ক চকোলেট, তিন প্যাকেট চিপস, মার্শশেলো চকোলেট, ওয়েফার বিস্কুট, পেন্সিল এবং শার্পনার।
অবন্তী বলল, আরও একটা জিনিস দিলেও কোনো লাভ নেই, বাবা না বললে আমি কিছুই নেবো না। অবন্তী এবং শবনম একই সঙ্গে আমার দিকে তাকায়। আমি ইশারায় অবন্তীকে বলি, সমস্যা নেই, নিতে পারো।
অবন্তী এবার জিনিসগুলো সোফার উপর রেখে আমার কাছে এসে কানে মুখ লাগিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি হ্যাঁ বলেছ না না বলেছ?
আমি বলি, হ্যাঁ বলেছি।
অবন্তী আবার জিনিসগুলো এক এক করে হাতে নেয়, আবার সোফায় নামিয়ে রাখে; শেষ পর্যন্ত বলে, আমি ছাতা, মিস্টার বিন আর পেন্সিল শার্পনার ছাড়া কিছুই নেব না। বাকিগুলো নিয়ে যাও, অন্য বেবিদের একটা একটা করে দিয়ো।
শবনম বলে, আমি তো সব তোমার জন্য এনেছি।
অবন্তী বলল, তাতে সমস্যা কী? একটা একটা করে দেবে। বাচ্চারা গিফট পেলে খুশি হয়।
অবন্তী বলে মার্ক্সের অর্থনীতি পড়ার আগেই মেয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন শিখে গেছে।
রানু ফিস ফিস করে আমাকে বলল, অতিথি কি দুপুর খাবে? তাহলে একটা মুরগি বের করে রান্না করব। নতুবা চা ও সন্দেস দেব। টি-ব্যাগ দেওয়া যাবে না, মাত্র একটা আছে।
আমি বললাম, একটু ভেবে বলি।
সবসুদ্ধ পাঁচ মিনিটের মধ্যে অবন্তী আমাকে বলল, আমি কি আন্টির সাথে শিশুপার্ক যেতে পারি?
আমি বলি, রাস্তাঘাটের যে অবস্থা এবং যে গরম।
শবনম বলে, আমি অবন্তীর জন্য আমার বাবার এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়ি নিয়ে এসেছি।
অবন্তী আবার বলে, আমি কি গাড়িতে উঠে শিশুপার্ক যেতে পারি?
আমি একবার শবনমের দিকে, একবার অবন্তীর দিকে তাকিয়ে বলি পাবো।
অবন্তী উচ্ছ্বাস প্রকাশের সদ্য শেখা একটি শব্দ ‘ইয়াহু’ বলে চেঁচিয়ে আমাকে জাপটে ধরে বলে, থ্যাঙ্ক ইউ বাবা।
শবনম আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার অনুমতি পেয়ে শবনম তার খুশিটা তো প্রকাশ করতে পারল। কিন্তু আমার খুশিটা কেমন করে প্রকাশ করব?
চার.
পরের শুক্রবার শবনম আরো সকাল সকাল এলো। রানুকে বলল, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি সবার জন্য পরোটা, মুরগির ভুনা, সবজি আর মুগের ডাল নিয়ে এসেছি। গরম-গরমই আছে, খেতে দেরি হলে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নেওয়া যাবে।
ততোক্ষণে চোখ কচলাতে কচলাতে সদ্য ঘুমভাঙা অবন্তী এসে হাজির হয়। মাইক্রোওয়েভ শব্দটা তার কানে ঢুকে থাকতে পারে। অবন্তী বলে, লাভ নেই। আমাদের মাইক্রো নষ্ট। ভেতরে খাবার দিলে আরও ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
অবন্তী বলে, অবশ্য ভালো করে দাঁত ব্রাশ না করে আমি কিছু খাবো না। ভালো করে দাঁত ব্রাশ করতে হয়, এটাই নিয়ম।
অবন্তী যখন বাথরুমে ঢুকবে সে জানে তার সিটকিনি লাগানো নিষেধ। সকালের ব্যাপারটা আমাকে করতে হয়। কমোডের কাছে একটি ছোট মোড়া থাকে, সেখানে পা ঠেকিয়ে রাখে। তারপর এক সময় জোরে চিৎকার করে, বাবা এখন ওয়াশ করে দাও।
আমি নিষ্ঠার সাথে এ কাজটা করি।
অবন্তী যখন ডাকল আমি আসছি, বলে মেয়ের কাছে চলে যাই, ওয়াশ করি, একটি পরিষ্কার পুরোনো তোয়ালেতে সামনে পেছনে মুছি, তারপর পেন্টটা পরিয়ে দিই।
তার হাতে পেস্ট লাগানো ব্রাশ তুলে দিই। অবন্তী আগে টুথাপেস্ট খেয়ে ফেলত।
অবন্তী ব্রাশ হাতে বেরিয়ে আসে। শবনমকে বলে দাঁতগুলো ব্রাশ করে দাও তো।
অবন্তীকে কোলে বসিয়ে ব্রাশ করে, বেসিনে নিয়ে কুলি করায়, চোখ-মুখ মুছে দেয়, নিজের ব্যাগ থেকে চিরুনি বের করে তার চুলে আঁচড়ায়।
আমরা তিনজন আমি, অবন্তী ও শবনম এক সাথে নাস্তা করি। অবন্তী বলে, ডালটা বেশি মজা, আমি বলি, সবজিটা। রানুর চাহনি দেখে বুঝতে পারি এরকম বাইরের একজন মহিলাকে এতোটা প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হচ্ছে না, তার আনা নাস্তা খাওয়াও সম্মানের ব্যাপার হচ্ছে না।
আমি আর রানুর চোখের দিকে তাকাচ্ছি না। তার পরবর্তী চাহনি আমাকে কি বলবে এটা তো স্পষ্ট। কাজে মেয়েরা এভাবেই ঘরে ঢুকে সবাইকে এটা খাইয়ে অজ্ঞান করে সব লুটেপুটে নিয়ে যায়। রানু সম্ভবত শেষ পর্যন্ত রয়ে যাওয়া খাবারের সামান্যও স্পর্শ করবে না। রানু অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে চায় না।
আমি নাস্তার পর এক কাপ ব্ল্যাক কফি খাই। শবনম খায় চা। রানু কাপ ভর্তি গরম পানি এনে দেয়, আমি নিই কফি, শবনম নিজেরটাতে টি-ব্যাগ ডুবিয়ে দেয়।
শবনম অবন্তীর সাথে ফিসফিস করে কথা বলে।
অবন্তী নিজের চেয়ার থেকে নেমে আমাকে বলে, বাবা তোমার কোলে বসে খাবো।
আমি কোলে তুলে নিই। অবন্তী বেশ স্পষ্ট করেই বলে, আচ্ছা বাবা আমি কি ফ্যান্টাসি ডিংডং যেতে পারি।
আমি বলি ফ্যান্টাসি ডিংডং আবার কি? কোথাও একটা গোলযোগ হয়ে থাকতে পারে এই আশঙ্কায় অবন্তী শবনমের দিকে তাকায়।
শবনম বলে, অবন্তী বলেছে ফ্যান্টাসি কিংডম। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি, সমস্যা নেই। অবন্তী বলে, হ্যাঁ বাবা সমস্যা নেই, গাড়ির ভেতরে খুবই ঠাণ্ডা, শীত লাগে।
আজকে শীত লাগবে না, চিন্তা করো না।
অবন্তী বলে, বুঝলে বাবা আজকে শীত লাগবে না। আমি কি তাহলে যেতে পারি?
আমি বলি, তোমার ইচ্ছে।
আমার ইচ্ছে যাবো।
কিন্তু কোথাও পানিতে নামতে পারবে না।
আচ্ছা।
শবনম বলে, আপনিও চলুন না। আমরা পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসব। আমি কিছু বলার আগে অবন্তী বলল, বাবা খুবই ব্যস্ত। বাবার সময় নেই, তাই না বাবা।
আমি বললাম, অবন্তী ঠিক বলেছে।
অবন্তী তার পানির ফ্ল্যাক্সটি গলায় ঝুলিয়ে নেয়, দুজন আমাকে বাই বলে বেরিয়ে পড়ে।

পাঁচ.
ঋতুর সাথে আমার আনুষ্ঠানিক ছাড়াছাড়ি হয়নি। বড় ধরনের কোনো ঝগড়াও নয়। এটা ঠিক আমাদের বয়সের ব্যবধান একটু বেশিই ছিল। শবনমের সাথে কতো হবে চার-পাঁচ বছর। ঋতু ঠিক এগার বছর তিন মাসের ছোট। আমি ঋতুদের কলেজের টিচার। কলেজটি তেমন ভালো নয়; সরকারি বিশ^বিদ্যালয়, বড় বড় কলেজ এগুলোতে চান্স না পাওয়ার পর অবশিষ্ট যারা থাকে তাদের একটি অংশ চড়া ফি দিয়ে এখানে ভর্তি হয়। শিক্ষকদের ব্যাপারটাও তাই। আমাদের অধিকাংশই ভালো কোনো কলেজে চান্স পাইনি। আমাদের প্রিন্সিপাল ডক্টর হুদাল্লিল মুত্তাকিন ভুয়া পিএইচডি একরকম একটি প্রচারণা আছে। আমাদের একই ধরণা। বিদ্যার কোনো দ্যুতি তার দেখিনি, সোনায় বাঁধানো উপরের পাটির একটি দাঁত কখনো কখনো চকচক করে উঠতে দেখেছি। তিনি আগামীতে বেসরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন, ঘোষণা দিয়েছেন। ঋতু আমারই ছাত্রী।
ঋতুর বাবা কলেজ গভর্নিং বোর্ডের মেম্বার। তিনি যখন মেয়ের জন্য প্রতি ঘণ্টা পাঁচশ টাকা হিসেবে মাসে আট দিন চার হাজার টাকায় আমাকে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করতে চাইলেন আমি না বলিনি মূলত তিনটি কারণে : প্রথমত, বাড়তি চার হাজার টাকা আমাকে যথেষ্ট প্রলুব্ধ করেছে, আমার পুরোনো আমলের ল্যাপটপের একটা রিপ্লেসমেন্ট দরকার, টাকাটা কাজে লাগবে, দ্বিতীয়ত, আমি কখনো প্রাইভেট টিউটর হিসেবে কাউকে পড়াইনি, এই অভিজ্ঞতার তো দরকার; তৃতীয়ত, ঋতুর মতো প্রাণচঞ্চল একটি মেয়ের সান্নিধ্য কে না চাইবে, আমিও চাই।

আমি অর্থনীতি পড়াই। অর্থনীতি হচ্ছে বিমর্ষ বিজ্ঞান। ঋতুদের বাড়িতে প্রথমদিন এ কথাটির পুনরাবৃত্তি করি। ঋতু বলে এটা ঠিক নয়, স্যার। আপনার ক্লাসে আমার মন ভালো হয়ে যায়।
আমি অর্থনীতির মৌলিক ধরণাগুলো দিতে থাকি। চাহিদা ও যোগানের কথা বলি। চাহিদা স্থিতিস্থাপকতার কথা বলি। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা শুনাই; কি কতোটা উন্নয়ন জরুরি সে কথা বোঝাতে চেষ্টা করি।
ঋতু বলে, বেশি করে টাকা ছেপে গরিবদের দিয়ে দিলেই তো তারা আর গরিব থাকবে না। সরকার এ কাজটা কেন করে না? তাছাড়া স্যার একটা কথা আপনাকে মানতেই হবে, গরিবরা বেশি খায়। আমাদের বুয়া জহুরা বেগম একবেলায় যত ভাত পায়, তাতে আমার দু’দিন চলে যাবে।
আমি জিজ্ঞেস করি, জহুরা বেগম কি চকোলেট খায়? থাই স্যুপ খায়? স্যান্ডউইচ খায়? ফুচকা খায়?
ঋতু বলে, পাবে কোথায়?
আমি বলি, সে জন্যই ভাত একটু বেশি খেতে হয়।
তাই বলে এতো বেশি?
তুমি দু’দিনে খাবার পেছনে যে টাকা খরচ করো তাতে জহুরা বেগমের এক মাস চলে যাবে।
ঋতু জিজ্ঞেস করে, স্যার আপনি কি কমিউনিস্ট?
ভালো কমিউনস্ট নই, সে রকম হলে তোমার বদলে বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াতাম এবং বিনে পয়সায়।
তারপর কি বস্তির একটা মেয়েকে বিয়ে করতেন?
আমি চুপ করে থাকি।
বলেন না, স্যার।
আমি বলি, একচেটিয়া বাজার বলতে কি বোঝ?
ঋতু বলে, স্যার আপনি অ্যাভয়েড করছেন।
আমি বলি, এরপর যেদিন আসব পূর্ণ-প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিয়ে আলোচনা করবে। এটা পরীক্ষায় আসবে।
ঋতু বস্তির ঘোর থেকে বের হতে পারে না। বলে, স্যার, আমি ভালো করেই জানি আপনি বস্তির সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটিকে বিয়ে করতেন না, এমনকি ভালোবাসলেও তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে আসতেন, কারণ আপনি ভালো কমিউনিস্ট নন।
আমি অস্বস্তি বোধ করি। আমি জানি একটা খারাপ কলেজের গড়পড়তা মানের ছাত্রী ঋতু মিথ্যে বলছে না। সমস্যাটা মনুষ্যত্বের, সমস্যাটা শ্রেণি ব্যবস্থার। কার্ল মার্ক্স বলেননি। আমি শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বললেও আমি নিজে শ্রেণির দেয়ালে আটকে আছি। নতুবা আমাদের কলেজের শ্যামবরণ ক্ষীণ কোমর সুট পরে মেয়েটিকে প্রপোজ করছি না কেন? তাকে তো আমার ভালোই লাগে। আমার ভেতরের দ্ব›দ্বকে আরো খুঁচিয়ে দিচ্ছে এই মেয়েটি।
ঋতুকে বললাম, তোমাকে পড়াবার জন্য তোমার বাবা আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। আমার পড়ানোর ধরনটা যদি তোমার ভালো না লাগে বলে দাও, আমি ছেড়ে দিচ্ছি। আমি পড়ানোর পরও যদি পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পাও এটা আমার জন্য খুব বিব্রতকর হবে।
ঋতু বলল, আমার পড়াশোনা করতে একটুও ভালো লাগে না। একচেটিয়া বাজার, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভ‚মিকা, বাণিজ্যের ভারসাম্য এসব শিখে, মুখস্ত করে আমার কি লাভ?
তোমার কি পড়তে লাগে? সেটাই পড়ো।
ঋতু বলল, বললাম তো আমার কিছুই পড়তে ইচ্ছে করে না।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসও না?
না, এসব বানানো, গাঁজাখোরি গল্প পড়ে কেন সময় নষ্ট করব? তাহলে কি করবে?
সেটাই তো বলব বলব করছি।
কি বলবে, বলো।
স্যার, আমি বিয়ে করব, সংসার করব, টুইন বেবির মা হবো।
আমি বললাম ধ্যাৎ। (চলবে)