ভুটান-ভারতের স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধে আস্থা এনেছিল

আগের সংবাদ

কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

পরের সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধের কবি ও কবিতা

ফরিদ আহমদ দুলাল

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ২:১০ অপরাহ্ণ

শ্যামল বদ্বীপভূমি বঙ্গদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধকেই বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা ও অর্জন বলে চিহ্নিত করা যায় দ্বিধাহীন চিত্তে। একটি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগ একবারই ঘটে। ১৯৭১-এর সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন, সর্বকালের জন্য তারা জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। আটল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভ‚মিতে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অদ্যাবধি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সৃষ্টি আমাদের ভাণ্ডারে যুক্ত হয়নি বলে প্রায়শই আক্ষেপ শোনা যায়। বিদগ্ধজনের আক্ষেপ একেবারে অমূলক নয় এ কথা সবাই যেমন মানি; পাশাপাশি এ কথাও তো ঠিক ইতোমধ্যে যতটা প্রাপ্তি ঘটেছে তা কিছুতেই অকিঞ্চিৎকর নয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই আগামীতে নিশ্চয়ই আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা বাঙালির শৌর্য-বীর্য আর আত্মত্যাগের পটভ‚মিতে পাবো উত্তীর্ণ কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক সব। নতুন প্রজন্ম যখন সে কাজে ব্রতী হবে তখন তার হাতে থাকবে না জীবন্ত উপাত্ত, তাকে তখন ইতিহাস ঘেঁটে গবেষণা করে তথ্য-উপাত্ত খুঁজে নিতে হবে। কাজটি কঠিন হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবানও হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই।
কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের কলম ও তুলি চিরকাল শান্তির সপক্ষে উচ্চকিত থেকেছে, যুদ্ধ-হানাহানি-রক্তপাতের বিরুদ্ধে তারা থেকেছে সোচ্চার; মানবতাবিরোধী সমস্ত রক্তপাতের বিরুদ্ধে কবির কলম দ্বিধাহীন চিত্তে সরব হয়েছে সভ্যতার প্রত্যুষ থেকে। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, মানবতা যখন হয়েছে ভ‚লুণ্ঠিত, বাংলাদেশের কবিকুল তখন নিঃশঙ্কচিত্তে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে পৃথিবীর দেশে দেশে কবিরা কবিতা লিখেছেন এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথাও সমান সত্য, বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের কবিদের লেখা কবিতা যৌক্তিক কারণেই স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত এবং ভিন্ন মাত্রাযুক্ত। ১৯৭১-এ বাঙালি যেমন প্রাণের আবেগ নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, বাংলাদেশের প্রাগ্রসর কবিদের প্রতিটি উচ্চারণও তেমনি দেশমাতৃকার প্রেমে ছিল নিবেদিত। ভিয়েতনাম-লাওস-কম্বোডিয়া-লেবানন-ইরান-ইরাক-প্যালেস্টাইন-আফগানিস্তান-এর যুদ্ধ আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কবিরা বিভিন্ন সময় কবিতা লিখেছেন; কিন্তু ১৯৭১-এর যুদ্ধ আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকা; নিজেদের মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, স্বজনের সারি সারি লাশ। আমাদের সে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে দুর্বৃত্ত দানবের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের জীবনপণ লড়াই। ১৯৭১-এর যুদ্ধে একদিকে প্রেম অন্যদিকে প্রবল ঘৃণা। একদিকে বিভীষিকাময় যুদ্ধের নয় মাস অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর জীবনে নতুন সংগ্রাম। যুদ্ধের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত। সঙ্গত কারণেই যুদ্ধ শেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন যুদ্ধের দীর্ঘ লড়াই। আমাদের যুদ্ধের কবিতা তাই ১৯৭১-এর যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুদ্ধ বিস্তৃত হয়েছে আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশকেও। ১৯৭১-এর যুদ্ধে যেমন শিল্পী-কবিরা সরাসরি যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে পরবর্তী কালের শিল্পী-কবিরাও ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে মুক্তির জন্য সমানভাবে অংশগ্রহণ করেছেন নতুন যুদ্ধে।
১৯৭১-এর যুদ্ধ-উপাখ্যান লিখতে কবি যেমন লিখেছেন
কি খবর আর লিখিয়া পাঠাব, বৌ ছেলেমেয়ে লয়ে,
আছি প্রস্তুত কার আগে কেবা যাইবো যে যমালয়ে।
আছি প্রস্তুত চোখে দেখিবারে নারীর শ্লীলতাহানি,
আছি প্রস্তুত কখন পুড়িবে পৈতৃক বাড়িখানা।
প্রতিটি ঘণ্টা আসিছে যাইছে খুনে রঞ্জিত হয়ে,
প্রতিদিন আসে ভয়াবহ কত কাহিনীর জ্বালা বয়ে।
চোখের সামনে দেখছি মৃত্যু জালিমের হুঙ্কারে,
জ্বলিতে দেখেছি শহর পল্লী আগুনের ফুৎকারে।
(খবর \ জসীমউদ্দীন)
পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে অন্য কবির দৃপ্ত উচ্চারণ
রক্ত চোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া
আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয়
কণ্ঠনালীর খুনপিয়াসী ছুরি,
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে
কেউটে সাপের ঝাঁপি।
মুক্তিযুদ্ধের কবি ও কবিতা

আমার হাতেই নিলাম আমার
নির্ভরতার চাবি;
তুমি আমার আকাশ থেকে
সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো।
(বাংলা ছাড়ো \ সিকান্দার আবু জাফর)
যুদ্ধোত্তর কালের নতুন যুদ্ধে কবি লিখেন নতুন কবিতা, নির্মলেন্দু গুণ যখন লিখেন
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন,
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল
হৃদয়ে লাগিল দোলা
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা
কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।
(স্বাধীনতা-এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো \ নির্মলেন্দু গুণ)

আমাদের চোখে তখন ১৯৭১-এর ৭ মার্চের সেই উত্তাল জনসমুদ্রের ছবি ভেসে ওঠে, মুহূর্তে আমরা চলে যাই ১৯৭১-এর মার্চে। আবার ১৯৭৫-পরবর্তী দুঃসময়ে যখন জাতিকে বিভ্রান্ত করে পাকিস্তানি মডেল বানাবার পাঁয়তারা চলছে, তখনো কবির কলম উচ্চকিত হয়েছে
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে,
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিল,
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার।
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ-যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী
স্বাধীনতা একি তবে নষ্ট জন্ম?
(বাতাসে লাশের গন্ধ \ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ)

১৯৭১-এ যুদ্ধকালে যারা যুদ্ধের কবিতা লিখেছেন তাদের সবাই সত্তর পূর্বকালের কবি, চল্লিশ-পঞ্চাশ অথবা ষাটের কেউ কেউ। কারো কবিতায় সরাসরি এসেছে যুদ্ধের কথা কারো কবিতায় দেশপ্রেমের মোড়কে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কে যুদ্ধের পরোক্ষ কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি; কিন্তু সরাসরি যুদ্ধের কবিতা পাই তখন, যখন কবি লিখেন
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্টদাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্য, হে স্বাধীনতা।
(তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা \ শামসুর রাহমান)
মহান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যুদ্ধভাসান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঋদ্ধ কবিতা প্রধানত রচিত হয়েছে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। যুদ্ধোত্তরকালের যুদ্ধের কবিতা এবং চেতনাঋদ্ধ কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন বাংলাদেশের অসংখ্য কবি, দু’চারজন ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতা লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক যখন লিখেন
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখেল্লায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমারই দেশে এ আমারই দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
(নূরলদীনের সারা জীবন \ সৈয়দ শামসুল হক)
নূরলদীনের কথা পড়তে পড়তে আমাদের মনে পড়ে যেতে থাকে ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’। বিজয়ী হওয়ার পরও যারা শৃঙ্খলিত-অসহায়, জন্মের পর যারা বিকলাঙ্গ থাকার ভয়ে আড়ষ্ট, আমরা যেন সেই দুর্ভাগা জাতির সন্তান। আমার বিজয় ছিনতাই করে নেয় পরাজিত শত্রু রা, লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন পতাকা ওড়ে পরাজিত শত্রু র গাড়িতে। বিজয়ের প্রায় অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও তাই একজন মুক্তিযোদ্ধা কবিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঋদ্ধ কবিকে লিখতে হয় মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। তেমনি একজন কবি মাশুক চৌধুরী। মাশুক চৌধুরীর কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি উদ্ধৃতি দিচ্ছি
জাগ্রত চেতনার পৌরুষে বিদ্ধ আমার জননী
জন্মভূমি এই বাংলাদেশ
আসন্ন প্রসবা নীল
বালিকার মতো জন্ম দিক বোধ ও বোধির
সচেতন সন্তান। আমার জননীর অন্ধকার
ছিন্ন করে উজ্জ্বল পাখীরা, দিবসের দিকে থাক:
যেমন একটি মাছরাঙা নদীর নিরাওয়াজ
তরল তলপেট ফুঁড়ে রৌদ্রের মতো উড়ে যায়,
ঈপ্সিত মৎস্য নিয়ে উড়ে যায় সঙ্গিনীর ঘরে।
(জননী ১৯৭১ \ মাশুক চৌধুরী)
রাজনীতির বিভিন্ন ধারায় অবস্থান নিয়ে চিন্তা-চেতনায় নানান বৈপরীত্যে অবস্থান করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোনো কবির প্রকাশ্য বিরোধ দৃষ্টিতে পড়েনি। যুদ্ধোত্তরকালে দীর্ঘদিন দেশ যখন পেছনের দিকে হেঁটেছে; যখন দেশে এমন কী সরকারও পরোক্ষে মুক্তিযুদ্ধে চেতনার বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়েছে; তখনো প্রকাশ্যে সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই কথা বলেছে; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে পরবর্তীকালে স্বল্পসংখ্যক যেসব কবি-সাহিত্যিক ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে করমর্দন করেছে, যারা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীস্বার্থ সিদ্ধির জন্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সাথে আঁতাত করেছেন; কিংবা যারা সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সভ্য এবং কবিতাচর্চায় নিয়োজিত, তারাও কেউ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেননি। গোড়াতেই বলেছি ১৯৭১-এর যুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বুকে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, সে ক্ষত সহজে মুছে যাবার নয়; এবং সে কারণেই বাংলাদেশের কবিকুল লিখে চলেছেন মুক্তির কবিতা। কবিরাই যথার্থ মনে রেখেছেনে, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!’ ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করলেও ক্ষুধা-দারিদ্র্য-ধর্মান্ধতা-অন্ধতা-কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্তি আসেনি বাঙালির; আসেনি সাংস্কৃতিক মুক্তিও; তাই বাংলার কবিকুল লিখে চলেছেন মুক্তির কবিতা। আমরা নিচে আরো কয়েকজন কবির কিছু পঙ্ক্তি উদ্ধার করছি
“আমার সম্বল শুধু একটি পতাকা/ তা আমাকে সাহস জোগায়/ জোগায় ক্ষমতা/ আমি সমুখ সমরে ডাকি / আদিগন্ত দুর্নীতিকে ….’ (আমার সম্বল \ অরুণাভ সরকার);
জনাকীর্ণ সমাবেশে আমি খুঁজি একজন রাসেলের মুখ,
প্রেমের লিপিকা পড়ি জেনেভার জুরিদের কাছে
পৃথিবীর ইতিহাস থেকে কলঙ্কিত পৃষ্ঠাগুলো রেখে
চলে আসি কানাডার বিশাল মিছিলে স্লোগান শোনাতে।
মানুষের জয় হোক, নিপীড়িত জনগণ জয়ী হোক অন্তিম সমরে।
(রিপোর্ট ১৯৭১ \ আসাদ চৌধুরী)
তোমাদের পূর্বপুরুষেরা আলিঙ্গন করেছে মৃত্যুকে
শৌর্য-বীর্যের স্পর্ধায়
আর তোমরা কূপমণ্ডুক হয়ে ডুবে আছো
পঙ্কে ভুল ইতিহাসের ডোবায়।
(বধ্যভূমি \ ফরিদ আহমদ দুলাল)
এভাবেই বাঙালির মুক্তির আকাক্সক্ষা পরম্পরা হয়ে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের কবিদের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে।
ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের কষ্ট দেশের প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি গ্রামে-মহল্লায়, বাঙালির ঘরে ঘরে। সন্তানহারা মায়ের হাহাকার প্রতিটি মায়ের বুকে; সম্ভ্রম হারানো বোনের চিৎকার প্রতিটি ভায়ের বুকে; প্রতিটি নারীর দীর্ঘশ্বাসে! এত কান্না এত হাহাকার এত দীর্ঘশ্বাসের কষ্ট এত রক্তের ধারা চাইলে মুছে ফেলা যায় না। তাই যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের কবিরা তাঁদের কবিতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা উচ্চারণ করেছেন। কখনো ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কখনো কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে, কখনোবা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। চাইলে সহস্র কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে আমার এ বক্তব্যকে সমর্থন জোগাতে পারি; কিন্তু আমি চাইবো পাঠক নিজ দায়িত্বে খুঁজে পড়ে নেবেন কোন কবিতা বাঙালির মুক্তির সপক্ষে সোচ্চার। দলান্ধ এবং চেতনান্ধ যারা, যারা হাতের আঙুল আয়নায় দেখতে চায়; সেইসব মূর্খদের জন্য করুণা প্রকাশ ছাড়া আপাত বিকল্প দেখছি না।