মুক্তিযুদ্ধের কবি ও কবিতা

আগের সংবাদ

তারেক মাসুদের জন্মদিনে যে আয়োজন

পরের সংবাদ

কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

মাহবুবুল হক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ২:১৯ অপরাহ্ণ

বাঙালি জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভ‚মিকা বৈপ্লবিক যুগান্তরের সম্ভাবনায় তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের অনিঃশেষ চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাপক আকারে উদ্ভাসিত। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যসহ সব শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় সত্তায়, আমাদের অনন্ত রক্তের ভেতরে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ। এই আবেগের ফলে আমাদের সাহিত্যে নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়েছে এবং অনাদিকাল প্রবাহিত থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সাহিত্যের অবদান নিয়ে এবারের সংখ্যা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই ঘটনা হঠাৎ করে রাতারাতি সংঘটিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই দশকের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস। প্রথমে সেই ইতিহাসের দিকে এক পলক নজর দেয়া দরকার।
আপনারা সবাই জানেন, ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের মধ্য দিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়। অবিভক্ত বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ব বাংলাকে জুড়ে দেয়া হয় হাজার মাইল দূরবর্তী পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে। এরপর পূর্ব বাংলা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হয়। পরিণত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের ক্ষেত্রে।
পাকিস্তান সরকার প্রথম থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর জোর করে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে রক্তাক্ত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সূচিত হয় ভাষা আন্দোলনের বিজয়। ধর্মীয় চেতনাকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেতে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তা বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকাশে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পর শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রযাত্রা। এতে ভীত হয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ প্রচারে সচেষ্ট হয়। পাশাপাশি এ দেশকে রাজনৈতিকভাবে পদানত, সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গুকরণ ও অর্থনৈতিকভাবে শোষণের নীতি-অবস্থান অব্যাহত রাখে।
এই অবস্থায় ষাটের দশকজুড়ে পূর্ব বাংলায় সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ক্রমে জোরদার হয়ে উঠতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়া হয়। এই অবস্থায় আন্দোলন আরো তীব্রতা লাভ করে। ছাত্রসমাজ ও গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার বাধ্য হয় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে।
এতে আন্দোলন আরো তুঙ্গে ওঠে। সামরিক একনায়ক লৌহমানব আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তী সামরিক একনায়ক ইয়াহিয়া খান আন্দোলন থামাতে ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা দেখা দেয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা হীন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। বাইরে লোক দেখানো আলাপ-আলোচনা চালিয়ে সময় ক্ষেপণ করে ভেতরে ভেতরে তারা সামরিক হামলা চালানোর জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে।
এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঘোষণা করেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের মুখে ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। সে রাতেই শুরু হয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।
সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ। চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়।
সারাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী দখলদারি কায়েম করতে থাকে। তাদের নির্মম অত্যাচারের মুখে প্রায় এক কোটি লোক বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়।
অন্যদিকে অস্থায়ী সরকার গঠন করে দশটি সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। হাজার হাজার ছাত্র-যুবা ভারতে এসে ট্রেনিং নিয়ে গেরিলা যুদ্ধে যোগ দেয়। তারা দেশের ভেতরে ঢুকে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা তৎপরতা শুরু করে। এই অবস্থায় জনবিচ্ছিন্ন হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দালালরা আলবদর, রাজাকার ইত্যাদি বাহিনী গড়ে তোলে। পাকিস্তানি সেনারা তাদের সহায়তা নিয়ে সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। কিন্তু অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ মানুষের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম জোরদার করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
নিরুপায় পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত যৌথ বাহিনী প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ শুরু করলে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের বুকে জন্ম লাভ করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের এই মহান মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বনে রচিত হয়েছে বহু গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও সংগীত। বাংলাদেশের সাহিত্যে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করাই এ প্রবন্ধের লক্ষ্য।

দুই.
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্ত স্নাত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে আমাদের যে বিপুল সাহিত্যের ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে তাতে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে উপন্যাস। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভ‚মিতে রচিত উপন্যাসের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এগুলোর অনেকগুলো পুরোপুরি শিল্প সফল হয়তো হয়নি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, অনুভূতি ও সে সময়ের রক্তাক্ত অধ্যায়ের নানা চিত্রে সেগুলো সমুজ্জ্বল।
সত্তরের দশকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর বহুমাত্রিক ছবি পাওয়া যায়। একদিকে একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা, নির্বিচার লুণ্ঠন, ব্যাপক ধ্বংসলীলা, নির্মম নারী ধর্ষণ ও নিষ্ঠুর অত্যাচারের ফলে দেশের ভেতরে কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তাহীন সন্ত্রস্ত অবরুদ্ধ জীবন এবং মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত অসহায় মানুষের দলে দলে দেশত্যাগ করে পালিয়ে বাঁচা, অন্যদিকে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রাম ও অসীম আত্মত্যাগ সত্তরের দশকের বাংলাদেশের উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য উপাদান হয়ে আছে। এসব ঘটনা নানা উপন্যাসে নানাভাবে প্রতিফলিত ও চিত্রিত হয়েছে।
প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় আনোয়ার পাশার (১৯২৮-১৯৭১) রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩) উপন্যাসের কথা। এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। এটি রচিত হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে। আত্মজৈবনিক এ উপন্যাসে উঠে এসেছে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত প্রগতিশীল আন্দোলনের কেন্দ্রভ‚মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেই সঙ্গে আন্দোলনে উত্তাল ঢাকা শহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর পৈশাচিক আক্রমণ, তাণ্ডবলীলা ও গণহত্যার চিত্র। সমস্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীনের প্রত্যক্ষ বর্ণনা রীতিতে। একাত্তরের যন্ত্রণাক্লিষ্ট দিনগুলোর পাশাপাশি এ উপন্যাসে উঠে এসেছে দীপ্ত যৌবনের স্বপ্নিল সম্ভাবনা। উপন্যাসের নায়ক সুদীপ্ত শাহীন আসলে লেখক অনোয়ার পাশারই প্রতিভাস।
প্রায় একই সময়ে শওকত ওসমান রচনা করেন জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১) উপন্যাসটি। এ উপন্যাসের গাজী রহমানও পেশায় শিক্ষক। এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তাণ্ডবলীলার বিবরণ। বীভৎস অবস্থায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে লাখ লাখ মানুষের সাথে গাজী রহমানও দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এ উপন্যাসে হানাদার বাহিনীর তাণ্ডব লীলায় বিধ্বস্ত স্বদেশকে তাঁর মনে হয়েছে জাহান্নাম বা নরক। নিরাপদ আশ্রয় ও বাঁচার আশায় এই দেশ ত্যাগের সময় তিনি দেখেছেন হানাদার বাহিনীর জ্বালিয়ে দেয়া গ্রাম, শুনেছেন হানাদারদের নির্বিচার হত্যা ও গুলির শিকার সাধারণ গ্রামবাসীর কথা।
একই ধরনের উপন্যাস শওকত আলীর যাত্রা (১৯৭৬)। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নের ঘটনা স্থান পেয়েছে। বিবৃত ঘটনার সময়কাল ২৫ মার্চ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ হামলার পর ঢাকা শহর ছেড়ে দলে দলে মানুষ নৌকায় করে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে পালাতে শুরু করে গ্রামের দিকে। লক্ষ্যহীন তাদের যাত্রা। উপন্যাসের মূল চরিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রায়হান সপরিবারে আশ্রয় নেন পথে পড়া গ্রামের একটি স্কুলে। কিন্তু হানাদার বাহিনী গ্রাম অভিমুখে এগোতে থাকলে তারা ওই আশ্রয় ছাড়তে বাধ্য হন। তারা জানেন না তাদের এই যাত্রার শেষ কোথায়। উপন্যাসে মধ্যবিত্ত মানুষের দোদুল্যমান মনোভঙ্গি ফুটিয়ে তোলায় ব্রতী হয়েছেন লেখক।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের ব্যাপক আত্মত্যাগ ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে তার প্রতিফলন ঘটেছে খণ্ডিতভাবে। বীরত্বের ভূমিকার চেয়ে হানাদার বাহিনীর হাতে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে কোনো কোনো উপন্যাসে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় শওকত ওসমানের নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩) উপন্যাসের কথা। এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে নারী নির্যাতনের মর্মন্তুদ কাহিনী। সিভিল সাপ্লাইয়ের গোডাউনে প্রায় একশ নারীকে ধরে এনে উলঙ্গ করে রেখেছিল হানাদাররা। এখানেই নির্যাতনের শিকার হয় পাঁচজন নারী। তাদের অতীত জীবনালেখ্য, তাদের বন্দি জীবনের মর্মন্তুদ ঘটনাকে তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসে। সবুজ বনে সদাচঞ্চল হরিণীদের ওপর ক্ষুধাতুর নেকড়ের ভয়াল থাবা বিস্তারের সাদৃশ্যে এ উপন্যাসের নামকরণ করা হয়েছে নেকড়ে অরণ্য।
এই ধারাতেই বিবেচ্য সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮১) উপন্যাসটি। এ উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে বিলকিস নামের এক নারীকে নিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তার পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি হারায়। তার স্বামী নিখোঁজ হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে পরিচয় হয় প্রদীপকুমার তথা সিরাজের। পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন তাদের গুলিতে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ দাফনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তখন রাতের অন্ধকারে লাশগুলো দাফন করতে গিয়ে তারা পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে বিলকিস প্রতিবাদে অবিচল থাকে।
রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর (১৯৭৮) উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাতে লাঞ্ছিত ভাগ্যাহত বাঙালি নারী ইয়াসমিনের জীবনের ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার অপরাধে তাদের পরিবারের সবাইকে পাকিস্তানিরা হত্যা করে। উচ্চশিক্ষিত ইয়াসমিনকে হত্যা না করে তারা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখে। সেখানে তার ওপর তারা পাশবিক অত্যাচার চালায়। ছয় মাসের দুঃসহ অত্যাচার ও বন্দিজীবন শেষে দেশ স্বাধীন হলে ইয়াসমিনের ঠাঁই হয় নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সরকার নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের ঘোষণা দিলেও স্বাধীন দেশে সে সম্মানযোগ্য মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে কোনো কোনো উপন্যাসে। হানাদার বাহিনীর নারী লোলুপতার ঘৃণ্য চেহারাকে শওকত ওসমান ফুটিয়ে তুলেছেন তার দুই সৈনিক (১৯৭৩) উপন্যাসে। এ উপন্যাসে দুই সামরিক অফিসার পাকিস্তানের সমর্থক একজন মুসলিম লীগপন্থি চেয়ারম্যানের বাড়িতে পরম আতিথেয়তা লাভের পর তার কলেজপড়ুয়া দুই মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। নিজের চোখের সামনে মেয়েদের তুলে নিতে দেখে অসহায় বাবা তীব্র গ্লানিতে আত্মহত্যা করে।
শওকত ওসমানের জলাঙ্গী (১৯৭৪) উপন্যাসের বিষয়বস্তুতেও এমনটি দেখা যায়। এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার প্রেমিকার ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা। এদের হাত-পা বেঁধে গলায় পাথর ঝুলিয়ে মেঘনা নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। এরা নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তাদের অবিচলিত দেশপ্রেমকে মহিমান্বিত করেছে।
হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের চিত্র রয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন (১৯৮১) উপন্যাসেও। এ উপন্যাসের নায়ক একজন কবি। কাকতালীয়ভাবে তার নাম নজরুল এবং বাড়ি বর্ধমানে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবি খ্যাতিকে হানাদার বাহিনী তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে চায়। এই নজরুল যে বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম নন, এ কথা বারবার বললেও তারা তা মানতে রাজি হয় না। তারা নজরুলকে পাকিস্তানের পক্ষে কবিতা লেখার জন্য চাপ দেয়। তাদের পক্ষে বিবৃতি দেয়ার জন্য তার ওপর নির্যাতন চালায়। কিন্তু নজরুল অসহ্য নীল যন্ত্রণার বিষ সয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে প্রাণ দেবে তবু পাকিস্তানিদের কাছে নতি স্বীকার করবে না। নজরুল চরিত্রের এই দৃঢ়তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মহিমান্বিত করে।
কোনো কোনো উপন্যাসে ফুটে উঠেছে শত্রু-কবলিত ঢাকা শহরের চিত্র। রশীদ হায়দারের খাঁচা (১৯৭৩) উপন্যাসে শত্রু-কবলিত এই নগরীর তিনটি ফ্ল্যাটের মানুষের অবরুদ্ধ জীবনকে খাঁচার প্রতীকে তুলে ধরা হয়েছে। এ উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মতৎপরতার প্রতি মুগ্ধ আবেগের প্রকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারায় নায়কের মর্মবেদনাও ফুটে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকা নগরীর নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবনচিত্র পাওয়া যায় রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য (১৯৭৪) উপন্যাসেও। এ উপন্যাসে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কাহিনীকে কেন্দ্র করে বর্ণিত হয়েছে অবাঙালি ও রাজাকারদের লুটপাট-অত্যাচার, ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা তৎপরতার ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধে ভারতসহ বৈদেশিক শক্তিগুলোর ভ‚মিকা ইত্যাদি। উপন্যাসটি শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে। এ উপন্যাসে পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক একটি ছবি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা প্রথমে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে হলেও ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। এই যুদ্ধে গ্রামের সাধারণ মানুষের ছিল স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণ। গ্রামীণ পটভ‚মিতে মুক্তিযুদ্ধের ছবি আমরা পাই কয়েকটি উপন্যাসে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় (১৯৭৪) ও সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬)।
আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রাম জীবনের ছবি চিত্রিত হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে একটি গ্রামের নানা ধর্মের নানা সামাজিক স্তরের অসহায় নরনারী কয়েকটি নৌকায় করে পালিয়ে যেতে থাকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে। তারা পেছনে ফেলে আসে নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি। আতঙ্কময় বিপন্ন বর্তমান তাদের কুরে কুরে খায়। আর তাদের যাত্রা অনিশ্চিত অকূল ভবিষ্যতের দিকে। যাত্রাপথে তারা সর্বত্র প্রত্যক্ষ করে হানাদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মমতা ও নৃশংসতার নানা চিহ্ন।
সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) উপন্যাসের পটভূমিও মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রাম। এ উপন্যাসে দেশের জন্য গ্রামবাংলার এক সাধারণ মায়ের অসামান্য অবদানের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারায় গ্রামীণ জীবনে সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধের উন্মাদনা। এই উন্মাদনায় পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত মা তার প্রাণপ্রতিম সন্তানের জীবন উৎসর্গ করে মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নেয়।
সারাসরি মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় না করে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির চিত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে কিছু উপন্যাসে। যেমন, মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন (১৯৭৬) উপন্যাসে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশের আত্মকেন্দ্রিক জীবনের ছবি আঁকা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। আত্মসুখসন্ধানী নায়ক চরিত্র খোকা যুদ্ধ শুরু হলে এক আত্মীয়ের বাসায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘তখন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকা চলছে শহরময়। জানালার ফাঁকে চোখ রাখলেই দেখা যায় চতুর্দিকে ছত্রখান মৃতদেহ, ছিন্নভিন্ন, ঝাঁঝরা; শহরজুড়ে দাউ দাউ জ্বলছে আগুন, তপ্ত বাতাসের হলকায় দগ্ধ মানুষ আর বারুদের কটু গন্ধ।’ (মাহমুদুল হক, জীবন আমার বোন, ঢাকা, ১৯৭৬, পৃ. ১৫৫)
বাড়ি ফেরার পর খোকা পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতনের ভয়াবহ পটভূমিতে বাকশক্তিরহিত বোনকে নিয়ে হাজার হাজার নরনারীর জনস্রোতের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিতে যায়। কিন্তু সেখানে পাকিস্তানি মিলিটারিদের আক্রমণ শুরু হয়। বোনকে ফেলে রেখে খোকা পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে মধ্যবিত্ত স্তরের এক শ্রেণির বাঙালির মনোবৃত্তি তুলে ধরাই এখানে লেখকের উদ্দিষ্ট।
এই ধারায় আরো উল্লেখযোগ্য আহমদ ছফার ওঙ্কার (১৯৭৫) উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে একটি বোবা মেয়ের কাহিনীর সঙ্গে মিশে গেছে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের রাজনৈতিক ঘটনাবলি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং গণমিছিলের উত্তাল জোয়ারে বোবা মেয়ের রক্তাক্ত জাগরণ। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি প্রতীকী তাৎপর্যে বিভাসিত।
কোনো কোনো উপন্যাসে প্রধান হয়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা। এই তৎপরতার সনিষ্ঠ উপস্থাপন ঘটেছে হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া (১৯৭৬) উপন্যাসে। এ উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী-নিয়ন্ত্রিত একটি থানা আক্রমণ করে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। তাদের এই গেরিলা অভিযানের সূত্রে কাহিনীতে আনুষঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের গ্রামজীবনে মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতের নানা প্রসঙ্গ। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মনোজগতের ভাবনার সঙ্গে মিশেছে বাইরের বাস্তবতা।

তিন.
সত্তরের দশকের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। প্রথমত, অধিকাংশ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ছবির পরিবর্তে আংশিক ও খণ্ড খণ্ড ছবি ধরা পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক রূপায়ণ ঘটেছে এমন উপন্যাস সত্তরের দশকে রচিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ লেখকই সমাজের মধ্য স্তরের প্রতিনিধি। তাই তাদের লেখায় তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মানস প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটেছে বেশি। তৃতীয়ত, মহান মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের গৌরবময় ভ‚মিকার সার্বিক প্রতিফলন দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে অংশ নিলেও তাদের সেই ভ‚মিকা সত্তরের উপন্যাসে তেমন লক্ষ করা যায় না। চতুর্থত, সমাজের মধ্যস্তরের মধ্যে রাজনীতি-সচেতনতা সত্তে¡ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভ‚মিকা পালনে তাদের দ্বিধান্বিত অবস্থানই প্রধান হয়ে উঠেছে লেখকদের চোখে। পঞ্চমত, মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের মরণজয়ী তৎপরতার ঘটনা তেমন প্রতিফলিত হয়নি সত্তরের দশকের উপন্যাসে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া। ষষ্ঠত, কয়েকটি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের পটভ‚মি বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রিত হলেও কোনো কোনো লেখকের হাতে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা, মধ্যবিত্তের আত্মসুখকাতরতা ও ব্যক্তিবোধের রূপায়ণে যত্নশীলতা লক্ষণীয়। মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন, রশীদ করিমের আমার যত গ্লানি ইত্যাদি উপন্যাস এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সপ্তমত, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী রূপায়ণের দিকে নজর দিয়েছেন কোনো কোনো লেখক। রশীদ হায়দারের খাঁচা, আহমদ ছফার ওঙ্কার উপন্যাস এ পর্যায়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সত্তরের দশকের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মহান অধ্যায়কে সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলায় লেখকদের অবদান কম নয়। পরবর্তী দশকগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব উপন্যাস রচিত হয়েছে সে ক্ষেত্রে এই দশকের উপন্যাস সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছে।