যে রাতে আমার স্ত্রী

আগের সংবাদ

আমাদের সিকদার আমিনুল হক

পরের সংবাদ

প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ১:৩৭ অপরাহ্ণ

[ পর্ব : দুই ]

আজাদ ও আমীনেরা একই সমস্যা নিয়ে কথা বলবে কিন্তু একসঙ্গে বসবে না। একে অপরকে কিঞ্চিৎ সমালোচনার সুযোগ রাখা আর কী।
ঠিক আছে আপনারা আমাকে ব্রিফ করুন।
আমীন আমাকে বাংলাদেশ কম্যুনিটির সমস্যাগুলো জানিয়ে বলে, কাল বিকেলে হোটেলের হলরুমে সবাইকে ডেকেছি। আপনি তাদের মুখ থেকেও অনেক কিছু সরাসরি জানবেন স্যার।
সবাইকে ডেকেছেন সবাই আসবে তো?
আজাদ সাহেবদের বলেছি। বলল তো আসবে।
একটি ফোন এলো। আজাদের। সে তার লোকজন নিয়ে প্যালেশিয়ার লবিতে। দেখা করতে চায়। বললাম, আগামীকাল বিকেলে কম্যুনিটি মিটিং। জানেন তো মনে হয়। সেখানে আসুন। সবাই মিলে কথা বলা যাবে।
জানি স্যার। কিন্তু আমি আসতে পারব না। কাল বিকেলের শিফটে আমার ডিউটি।
রবিবারেও ডিউটি।
সিকিউরিটির কাজ স্যার ছুটির দিনও শিফট পড়ে।
আমীনদের বিদায় করে আজাদদের ডাকি। বলি, অল্প কয়েকজন মানুষ আমরা এখানে। কীসের এত সমস্যা?
এক হিসেবে কোনো সমস্যাই নেই। আমাদের দিক হতে তো নাই-ই। ব্যক্তিগত-সামাজিক সব ধরনের মেলামেশাই চলছে। তবে স্যার প্রবলেম ওই একটাই। বাঙালিদের দুটো সংগঠন।
বাংলাদেশিরা পালাওয়ে যেসব সমস্যার সম্মুখীন সে সম্পর্কে আমি ম্যানিলা থাকতেই খোঁজ করেছি। আমীনও এ নিয়ে আমাকে ধারণা দিয়েছে। আজাদের কাছ থেকে তাই নতুন কিছু শুনতে পাই না। বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে এখানে আছে বাংলাদেশিরা। (১) ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার; (২) নিয়মিত বেতন না পাওয়া; (৩) চুক্তি শেষে দেশে ফেরার সময় ফিরতি টিকেট না পাওয়া; (৪) ছুটি শেষে দেশ থেকে ফেরার সময় পালাওয়ে পুনরায় ঢুকতে না পারা। বিশেষ করে টিকেট থাকা সত্তে¡ও ম্যানিলাতে কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইন্সের বোর্ডিংয়ে অস্বীকৃতি; (৫) কাজ বদলের সুযোগ না থাকা; (৬) মিডিয়াতে বাংলাদেশিদের সম্পর্কে অপপ্রচার যাতে করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো যায়; (৭) তাদের সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে ব্যাপক সুপারি চুরির অভিযোগ এবং (৮) ধর্মীয় আচার পালনে কোনো মসজিদ না থাকা।
পালাও সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশিদের সে দেশে প্রবেশের বেলায় কোনো ভিসা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ বর্তমানে কালো তালিকাভুক্ত একটি দেশ। যদিও কালো তালিকাভুক্তির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। কালো তালিকাভুক্ত একটি দেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে পালাওয়ে আমার প্রবেশ সহজ হয়নি। সে সম্পর্কে আমি সুবিধামতো বয়ানের ইচ্ছে রাখি।
শনিবার থাকায় অনেকেরই ছুটি ছিল। প্রায় সারাদিন ধরে তাই প্রবাসী বাঙালিরা হোটেল প্যালেশিয়াতে আসতে থাকে। সবাই সমস্যা নিয়ে নয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত কৌত‚হলে তাদের রাষ্ট্রদূতকে এক নজর দেখার ইচ্ছায়। কেউবা নিমন্ত্রণ জানাতে। দুপুরের পর এলো দুজন। আমি সবে লাঞ্চ করে রুমে ফিরেছি। প্যালেশিয়ার আশপাশে অনেক রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড শপ। আমীন, আজাদদের দেয়া তথ্যানুযায়ী আমি গেলাম তাজ-এ। তাজ ভারতীয় রেস্টুরেন্ট। এর অন্যতম কর্ণধার কেরালার উদ্যমী তরুণ রবার্ট স্কারিয়া। অপরাহ্ন হয়ে যাওয়ায় তাজ বন্ধ পেলাম। ফাস্টফুড খেয়ে ঘরে ফিরতেই ওই দুজন হাজির। পরনে হাফপ্যান্ট। মলিন। পায়ে স্যান্ডেল। রাবারের। তাও জীর্ণ। মনে হলো কঠোর পরিশ্রমে শরীর তাদের তামাটে হয়ে গেছে।
দু-চারটে কথা বিনিময়ের পর বলল, ভাই, আপনাকে আমারা দাওয়াত দিতে এসেছি। আজ সন্ধ্যায় যদি আপনি রাজি থাকেন। বেশি কিছু না, এই কয়েকজন আমরা একসঙ্গে খাব।
আরো কিছু নিমন্ত্রণ যেমন বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন, বাংলাদেশ এসোসিয়েসনের পক্ষ থেকে থাকায় তাদের দাওয়াত কবুল করা সম্ভব হলো না। আমীন, আজাদদের নিমন্ত্রণও আমি এখন অবধি গ্রহণ করিনি। বলেছি তারা দুই গ্রুপ মিলে করলে সানন্দে অংশ নেব।
ছেলে দুজন বিদায়ের পর এলো শরীফ। আমার খোঁজখবর নিতে এসেছে সে। শরীফ বেশ চৌকস। ভদ্র ছেলে। আমার কাছে ওর কোনো প্রয়োজন নেই। সে আমাকে তাদের অতিথি বিবেচনায় একটু সুবিধা-অসুবিধা দেখতে এসেছে। জিগ্যেস করল, ছেলে দুটো কী বলল, স্যার?
কেন?
‘লবিতে দেখা হয়েছিল আমাদের। জানাল আপনার কাছে যাবে। আমি আগে থেকেই লবিতে ছিলাম। আপনি বিশ্রাম নিচ্ছেন ভেবে আসিনি।’
তুমি ওদের চেন?
না স্যার।
কী বলেছে তারা তোমাকে।
বলল আপনাকে দাওয়াত করবে। নতুন জায়গায় আপনার খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট।
ও।
স্যার, আপনি কিছু মনে নিয়েন না। কাল মিটিংয়ে আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হবে আপনার। তখন দেখবেন শিক্ষিত অশিক্ষিত কত রকমের বাঙালি আমরা আছি এখানে। কত রকমের তাদের কথা। এই দুইটা তাদেরই মতো। ভাবছে বললেই আপনি ওদের পেছনে হাঁটা শুরু করবেন। স্যার মাইন্ড করেন নাই তো?
আমি কিছু মনে করিনি। আর মাইন্ড করার কিছু নাইও তো।
শনিবার বিকেলে আমার সর্বশেষ গেস্ট ছিলেন পালাওয়ের ওমবাডস্্ম্যান মি. মোসেস উলুডং এবং প্রাক্তন সিনেটর মি. সান্তি আসানোমা। তারা উভয়েই বাংলাদেশিদের শুভাকাক্সক্ষী এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। যখনই কোনো সমস্যা হয় তখনি বাংলাদেশিরা সাহায্যের জন্য তাদের শরণাপন্ন হয়। আমি পালাও এসেছি জেনে তারা হোটেল স্যুইটে দেখা করতে এলেন। তারা আসবেন তা আমি আগে থেকেই জানতাম। নিজের রুমে তাই ফরমাল পোশাকে অপেক্ষা করছিলাম। তারা হাজির হলেন হাফ প্যান্ট পরে। মাথায় দুজনেরই হ্যাট। হ্যাটের আবশ্যকতা আমি দুপুরের পর খেতে বেরিয়েই বুঝেছি। এখানকার রোদ খুব চড়া। খুব তীব্রভাবে মুখে লাগে। সূর্যের এত তেজ এর আগে কোথায়ও আমি এভাবে অনুভব করিনি। প্রখর রোদে মনে হয় সারা কোরোর ঝাঁ ঝাঁ করছে।
আমাকে আনুষ্ঠানিক পোশাকে দেখে মি. উলুডং বললেন, স্যরি, আজ তো ছুটির দিন। আমরা ভেবেছিলাম তুমিও আমাদের মতো ক্যাজুয়াল পোশাকে থাকবে।
হ্যাঁ, ঘরোয়া পোশাকে থাকতে পারলেই আরামদায়ক হতো। কিন্তু তা আর পারছি কই। সারাদিনই কেউ না কেউ আসছে সবার সঙ্গেই কথা বলতে হচ্ছে। তোমরাও আসছ জেনে আর পোশাক খুলিনি। যে পোশাকে আছ ফিল্ ফ্রি। আমার কোনো অসুবিধা নেই।
তাদের সঙ্গে আলাপে বুঝতে পারি বহুদিন ধরেই তারা বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশিদের অসুবিধাগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা স্পষ্ট। উলুডং বলল, এসব সমস্যার জন্য আমি তোমার লোকজনদের দোষ দেখি না। নিয়মিত বেতন না পেলে তারা কাজ বদল করতে চাইবেই। ছুটিতে দেশে গিয়ে আর চাকরিতে ফিরতে পারবে না তাই হয় নাকি!
আর চুক্তিও যখন বলবৎ। কিছু অবৈধ বাংলাদেশি এখানে আছে কিন্তু তারা তো দালালদের খপ্পরে পড়ে পরিস্থিতির শিকার। তাদের ভুল বুঝিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
আমি বুঝতে পারি এই ভুল বোঝানটা সহজ। পালাওয়ের মুদ্রা এখন অবধি ডলার। মাত্র আটশ মাইল দূরে গুয়াম ইউএস টেরিটরিজ। পালাওয়ের সর্বত্রই মার্কিনিদের প্রভাব। তার সরকার ব্যবস্থা, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, লেফট হ্যান্ড ড্রাইভিং, প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্যাপিটাল ভবন সবখানেই যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ। ভাগ্যান্বেষী কোনো ইমিগ্রান্ট ওয়ার্কারের কাছে তা আমেরিকা বলে ভ্রম হতেই পারে। পালাও পৌঁছে যাওয়ার মানে এক প্রকার আমেরিকা পৌঁছে যাওয়া বৈ তো নয়।
ব্যক্তিগতভাবে তুমি যে সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে পেরেছ সেজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এর বাইরে আমার বড় প্রশ্ন হলো তোমরা আমাদের ভিসার বেলায় এমবার্গো দিলে কেন। এর তো কোনো কারণ খুঁজে পাই না।
আমাদের লোকসংখ্যা তো কম। সে তুলনায় মনে হচ্ছিল বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তাই এই নিষেধাজ্ঞা। আমার মনে হয় এটি সাময়িক।
উত্তর দিল সিনেটর সান্তি আসানোমা। আমি কিছু বলার আগেই উলুডং বলল, তুমি চাইলে এ নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে পার।
তা কি সম্ভব?
আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। তিনি এখন দেশের বাইরে। ফিরলে তোমাকে অগ্রগতি জানাব।
প্রেসিডেন্ট যদি সদয় সম্মতি দেন আমি তাকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।
উলুডংকে প্রস্তাব করি।
তোমার আমন্ত্রণ আমি প্রেসিডেন্টকে পৌঁছে দেব। গ্রহণ করা না করা তার প্রিভিলেজ।
আমি জানি মি. ওমবাডস্ম্যান।
মি. ওমবাডস্ম্যান নয়, বলো উলুডং। উই আর ফ্রেন্ডস্।
অবশ্যই।
আমি রুমের মিনি বার থেকে তাদের ঠাণ্ডা বিয়ার বের করে দেই। পালাওয়ে উৎপাদিত বিয়ার। রুস্টার। ক্যানের গায়ে লাল মোরগের ছবি। উলুডং ও সান্তি তা সবিনয়ে সরিয়ে রেখে বলেন আজ সন্ধ্যার আগে তারা তা স্পর্শ করবে না। আমি জোর করি না। শুধু এশীয় আতিথেয়তা নিয়ে তাদের সামান্য বয়ান করি।
উলুডং বলে, মাই ফ্রেন্ড, এবার একটি কাজের কথা বলি।
অবশ্যই এবং নিঃসঙ্কোচে।
আমাদের ফ্রেন্ড সিনেটর সান্তি অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশিদের কল্যাণে কাজ করছে। তোমাদের তো এখানে কোনো দূতাবাস নেই অদূর ভবিষ্যতে তার সম্ভাবনাও দেখছি না। এ অবস্থায় সিনেটর সান্তি পালাওয়ে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল হিসেবে কাজ করতে চায়।
আমি অবশ্য এ ধরনের প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবে তা আমার কাছে অবিবেচ্য মনে হলো না। বললাম, অবশ্যই, কেন নয়। কাগজপত্র দিলে আমি তা সুপারিশসহ বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করব। তবে তোমরা তো জান চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের।
সিনেটর সান্তি বললেন তিনি তার বায়োডাটা অন্যান্য ক্রেডিনসিয়ালসহ আমার রুমে পৌঁছে দেবেন। উলুডং সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত। তার সম্পাদিত ‘টায়ে বিলাউ’ সপ্তাহে দুদিন বেরোয়। ফটোগ্রাফার সঙ্গে এসেছিল। বলল, অনুমতি পেলে ফটোগ্রাফারকে ডাকব আমার পত্রিকার জন্য তোমার ছবি নিতে।
সহাস্যে উত্তর দিলাম, ইয়েস, উইথ প্লেজার।

(চলবে)