প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

আগের সংবাদ

ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ

পরের সংবাদ

আমাদের সিকদার আমিনুল হক

ফারুক মাহমুদ

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৬, ২০১৯ , ১:৪২ অপরাহ্ণ

সিকদার আমিনুল হক জীবিকার কত বিচিত্র পথে যে হেঁটেছেন, প্রকৌশল সংস্থায় চাকরি, কাপড় তৈরির কারখানা স্থাপন, পত্রিকা সম্পাদনা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হতে পারেননি। এক সময় রমনা পার্কের পূর্ব দিকে তার অফিস ছিল। অফিসে ব্যস্ততা তেমন নেই। যখন বিদেশ থেকে কেউ আসে, তাদের সঙ্গে দাপ্তরিক কাজ, ঢাকার বাইরে যাওয়া ইত্যাদি। অন্য সময়টা অফিসেই ছোটখাটো কাজের মধ্যে কাটে। ওই অফিসে যখনই গেছি, অধিকাংশ দিনই দেখেছি, সিকদার আমিনুল হক তার টেবিলে বসে মাথা গুঁজে, গভীর মনোযোগে লিখছেন। অনুমান করা যায়, কবিতা লিখছেন। কবিতা নিয়ে তার এমন মগ্নতা সব সময়ই দেখেছি। এমনও দেখা গেছে, তার বাসায় জমাট আড্ডা চলছে, হঠাৎ সিকদার ভাই অন্য ঘরে চলে গেছেন। আবিষ্কার করেছি, পাশে, তার লেখার ঘরে খাতায় মাথা গুঁজে লিখছেন। পত্রিকায় যখন কাজ করতেন, হাজারটা ঝামেলার মধ্যেও অন্যমনস্কতায় ডুবে আছেন, লিখছেন, হয়তো কবিতাই। তার প্রাত্যহিকতার সব কিছুর সঙ্গে কবিতা জড়িয়ে থাকতো। লিখতেন রুলটানা খাতায়। কাটাকুটি, যাকে বলে পরিমার্জনা করতেন। তার কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি, একই কবিতা কয়েকবার লিখেছেন। শব্দ, বাক্য, স্তবক পরিবর্তন হচ্ছে। আবার কোনো কোনো লেখা দেখেছি একেবারে নিটোল, একটা শব্দেরও পরিবর্তন নেই। একই তারিখ একাধিক কবিতা লেখার উদাহরণ পাওয়া গেছে। একটা সময়ের পাণ্ডুলিপিতে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই কবিতা লিখেছেন। তার কবিতার একটি সিরিজ আছে, ছোট ছোট কবিতা, ‘প্রতিদিন ঘুমের আগে’। শোনা যায়, বিছানায় যাওয়ার আগে তার শেষ কাজ ছিল দু-চার ছত্র কবিতা লেখা। তিনি আমাদের বলতেনও, প্রত্যেক কবিরই উচিত, প্রতিদিন অন্তত এক ছত্র হলেও কবিতা লেখা। খাওয়ার টেবিলের মতোই আবশ্যক লেখার টেবিলে বসা। সিকদার আমিনুল হক যে এসব কথা মান্য করতেন, তা তার লেখার বিপুলতা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।
ব্যক্তিগতভাবে তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ অনেকেরই হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক সিকদার আমিনুল হককে কাছ থেকে দেখার-জানার সুযোগ হয়েছে আমাদের কয়েকজনের। তিনি সাপ্তাহিক বিপ্লব-এর সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি দীর্ঘায়ু লাভ করেনি। কিন্তু বিপ্লবের সামান্য সময়টা আমাদের কয়েকজনের জীবনের উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময়। গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি। আমি তখন সাপ্তাহিক স্বদেশ নামের একটি পত্রিকায় কাজ করি। পত্রিকার অফিস ছিল পুরানা পল্টন। জাকি উদ্দিন আহমদ এবং মোশারফ হোসেন (সাবেক সংসদ সদস্য, প্রয়াত) ছিলেন স্বদেশের মালিক। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রফিক ভূঁইয়া। (প্রয়াত) সাংবাদিক, কলামিস্ট আখতারুল আলম এবং সাংবাদিক-কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ নিজেদের কর্মস্থলের কাজ শেষ করে আসতেন স্বদেশ অফিসে। আকতার আলমই আমাকে ওষুধ কোম্পানির চাকরি ছাড়িয়ে স্বদেশে এনেছিলেন। এর মধ্যে একদিন সিকদার আমিনুল হক জরুরি খবর পাঠালেন, আজই দেখা করতে হবে। গেলাম তার ৪৮, এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। সরাসরিই বললেন, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরুচ্ছে, তিনি সম্পাদক, আমাকেও থাকতে হবে। থাকা মানে শুধু চাকরি করার জন্য চাকরি নয়, দায়িত্ব নিয়ে কাগজটা বের করতে হবে। নিমরাজি হলাম। স্বদেশ তখন বাজার কাটতি পত্রিকা। পত্রিকায় আমার অবস্থান, বেতনপাতি মন্দ না। নতুন পত্রিকা বের করার ঝুঁকি এসব মাথায় নড়াচড়া করছিল। শেষ পর্যন্ত সাহস করে নেমে পড়লাম বিপ্লব বের করার কাজে। সিকদার আমিনুল হক আমাকে অপার স্বাধীনতা দিলেন পত্রিকা প্রকাশের সার্বিক পরিকল্পনা তৈরির। পত্রিকার মালিক ছিলেন সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী মাঈদুল ইসলাম মুকুল। পত্রিকার অফিস খোঁজা শুরু হলো, পাওয়াও গেল সেগুনবাগিচায়। পুরনো ধাঁচের বনেদি বাড়ি। কথাবার্তা চ‚ড়ান্ত হওয়ার পর আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল বাড়িটা একবার দেখে আসতে। গেলাম। বাড়ির বাসিন্দারা চলে গেলেও তাদের পরিত্যক্ত নানা জিনিসপাতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বাড়ির আদল, ছোট্ট বগান, পরিত্যক্ত ভাঙা আসবাবপত্রে আভিজাত্যের ছাপ। বাড়িটা আমার খুব পছন্দ হলো। মনে আছে, দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলাম। ওই বাড়িতে সাপ্তাহিক বিপ্লব এবং বর্তমানে বন্ধ, দৈনিক দেশ-এর অফিস বসেছিল। ওই বাড়িটি পরবর্তীতে লাভ করেছিল ঐতিহাসিক মর্যাদা। আগারগাঁও স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ছিল সেগুনবাগিচার ওই বাড়িতে।
কবিতা লেখার বিষয়টি সিকদার আমিনুল হক খুবই মর্যাদার জায়গা থেকে দেখতেন। একটি গল্প বলি : বিপ্লব পত্রিকায় একজন অফিস সহকারী, মণীন্দ্র। শুনেছি, তার প্রেমিকা তাকে দাগা দিয়ে ভিনদেশি হয়েছে। মনের দুঃখে সব ছেড়েছুড়ে মণীন্দ্র পত্রিকায় চাকরি নিয়েছেন। সে নাকি রাত জেগে ‘কবিতা’ লেখে। লাল চোখ, দিনের বেলায় ঢুলতে থাকে। তার কবিতা লেখার খাতাটি সিকদার ভাইয়ের হাতে চলে আসে। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে দেখলেন। আমাদের দেখালেন। স্থূল আবেগের অতিশয় কাঁচা লেখাজোখা। মণীন্দ্রকে দিয়ে যে কবিতা লেখা হবে না, এটা সহজেই বোঝা গেল। তাকে ডেকে, খুব সহানুভ‚তি দেখিয়ে সিকদার ভাই বলে দিলেন, কবিতা লেখা সহজ কাজ নয়। মণীন্দ্র আর কবিতা লেখেননি। বিরহ-বেদনার কথা ভুলে কাজে মনোযোগী হলেন।
বেঁচে থাকার শেষের এক যুগেরও বেশি সময় সিকদার আমিনুল হক লেখালেখি ছাড়া জীবিকা-সংলগ্ন কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এ সময়টায় তার সঙ্গে আমার দেখা হতো প্রায় প্রতিদিন, সকালে, সন্ধ্যায়। থাকতেন এলিফ্যান্ট রোডের বড়িতে। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের নিজস্ব বাড়িতে মাসুদা আমিন অর্থাৎ জলি ভাবি একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রিন্সিপাল। এক সময় প্রতিষ্ঠানটি উঠে যায়। পরে ওই বাড়িটায় আমি ছাপাছাপির কারখানা করেছিলাম। ওই জীবিকালয়ে যেতে-আসতে সিকদার ভাইয়ের বাড়ি পড়ে। সকালের ছোট্ট চা-আড্ডা আর সান্ধ্য আড্ডায় আমি ছিলাম নিয়মিত সদস্য। অনেকেই আসতেন। আড্ডা চলত। দেখেছি, জমাট আড্ডা থেকে সাময়িক ছিটকে গেছেন সিকদার ভাই। পাশের পড়ার ঘরে টেবিলে মাথা গুঁজে লিখছেন। আবার আড্ডায় ফিরেছেন। হয়তো আড্ডার মধ্যেই কবিতার কোনো বিষয় মাথায় এসেছে, লিখে রেখেছেন, যদি না আবার হারিয়ে যায়! সিকদার ভাই সব সময় কবিতার ঘোরের মধ্যে থাকতেন, কবিতায় থাকতেন। বিপুলপ্রজ কবি ছিলেন তিনি। তার বেঁচে থাকা খুব বেশি দীর্ঘ সময় ছিল না। এর মধ্যেই তার প্রকাশিত কাব্য ২৩টি। এর মধ্যে দুটি প্রবন্ধ, একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা, একটি ছড়া এবং অগ্রন্থিত প্রকাশিত কবিতার বই রয়েছে। কবির মৃত্যুর পর, মিনার মনসুরের সম্পাদনায় দুখণ্ডে বেরিয়েছে সিকদার আমিনুল হকের রচনাবলী। ওগুলোতে ধারণ করা আছে ৭৮৪টি কবিতা। পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার অনেক কবিতা। অপ্রকাশিত কবিতা যে নেই, তা নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে না। সিকদার আমিনুল হকের অগ্রন্থিত অপ্রকাশিত কবিতা নামে আমি একটি বই সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখেছি, তার এমন কবিতার সংখ্যাও বিপুল। এর সামান্যই ওই বইয়ে স্থান পেয়েছে। অনেক বছর হয়ে গেল, তার রেখে যাওয়া কোনো পাণ্ডুলিপির সন্ধান আমাদের জানা হয়নি। তার যে কবি-চরিত্র, তা জেনে অনুমান করা যেতে পারে, অপ্রকাশিত, অগ্রন্থিত কবিতা বা পাণ্ডুলিপি থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ‘প্রতিদিন ঘুমের আগে’ শিরোনামে যে কবিতাগুলো লিখতেন, সেগুলোর খোঁজ পাওয়া দরকার। কবির প্রাত্যহিকতার কাব্যিক প্রকাশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগটি পেলে বাংলা কবিতার পাঠকেরই লাভ হতো। এক সময় সিকদার আমিনুল হক দৈনিক ইত্তেফাক এবং তার সম্পাদিত বিপ্লবে কলাম লিখেছেন। ‘উড়ন্ত যোগাযোগ’ শীর্ষক বিপ্লবের কলামটি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। এগুলো নিয়েও একটা বই হতে পারে। তার প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে একটা বই হয়েছে এবার হলো না গান মৃত্যুচিন্তা ও অন্যান্য প্রবন্ধ। বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয় নিয়ে লেখা রচনার সংকলন। চিন্তার বিভিন্নতা ও বহুমাত্রিকতার সন্নিবেশে তার লেখাগুলো পাঠকভাবনায় নতুনত্বের সূত্রপাত করবে। কবির জন্মদিনে শ্রদ্ধা ভালোবাসা।