ব্রিটেন নির্বাচন ও ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ

আগের সংবাদ

জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে তো?

পরের সংবাদ

পেঁয়াজ এখনো মগডালে : রহস্যটা কী?

আহমদ রফিক

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৫, ২০১৯ , ১০:২৩ অপরাহ্ণ

আমরা জানি না, অতসব সত্ত্বেও পেঁয়াজ নিয়ে বাজারের এ নৈরাজ্য কবে কাটবে? আদৌ কাটবে কিনা উৎপাদিত দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বাজারে না আসা অবধি। আসলে বড় সমস্যা হলো মজুতদারি, কালোবাজারির মতো দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে মারাত্মক ক্ষতের গায়ে হালকা মলম লাগিয়ে কিছু হবে না। আমরা জানতে চাই এনবিআর শেষ পর্যন্ত কী শনাক্ত করল
এবং সরকার অপরাধের কী ব্যবস্থা নিল।

বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজ সংকট, এর অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পরিপ্রেক্ষিতে এত তৎপরতার পর সবারই প্রত্যাশা ছিল পেঁয়াজের দাম নাগালের মধ্যে আসবে। কিন্তু এক ধাপ নেমে পরক্ষণেই সে এক লাফে আবার মগডালে চড়ে বসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অসহায়তা দেখে ক্রেতা-ভোক্তারাও অসহায় বোধ করছেন। মুনাফাবাজ সিন্ডিকেট নির্বিকার। গত ২৮ নভেম্বর এক বর্ষীয়ান গৃহিণী জানালেন, বাধ্য হয়ে তাকে ২৮০ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে হলো।

গত এক মাস ধরে আমাদের একটি মাত্রই জিজ্ঞাসা? নিকট-অতীতের ভুলভ্রান্তির মধ্যেই এই যে তড়িঘড়ি পেঁয়াজ আমদানি করা হলো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিমানে চড়ে পেঁয়াজ এলো মূল্য হ্রাসের অতীব প্রত্যাশা নিয়ে, সেসব পেঁয়াজ কোথায় গেল? বাজারে সেসব পেঁয়াজের যথেষ্ট মাত্রায় উপস্থিতিতে দাম না কমে পারে না।

সরকার পক্ষে এমন বক্তব্যও আমরা শুনেছি যে, টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ সরবরাহ করা হবে, যাতে মজুতদারির সুযোগ তৈরি হতে না পারে। ইতোমধ্যে দুই মন্ত্রীর ঘোষণা- ‘১০ দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’ কিন্তু না, পেঁয়াজ এবার নাছোড়াবান্দা। সে ভোক্তা-ক্রেতাদের চরম ভোগান্তি না দিয়ে, সেই সঙ্গে চরম মুনাফাবাজির সুযোগ তৈরি না করে মগডাল থেকে নামবে না।
সত্যি বেহাল অবস্থা শুধু ক্রেতা-ভোক্তাদেরই নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষেরও। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন- ‘দাম না কমার রহস্যটা কী?’ সরকারি কর্তৃপক্ষের তা অনুমান করতে না পারার কথা নয়। তাই দৈনিক পত্রিকাগুলোর খবরে প্রকাশ- ‘শুল্ক গোয়েন্দারা পেঁয়াজের তল্লাশিতে ও মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি রহস্য ভেদে মাঠে নেমে পড়েছেন।’
এবার আমাদের প্রত্যাশা, ভয় পেয়ে পেঁয়াজ মাটিতে নামবে। মাটিতে না হোক, অন্তত কয়েক ডাল (ধাপ) নিচে। কিন্তু না, পেঁয়াজের বাজার সেই পূর্ব অবস্থানেই, নড়াচড়ার নামটি নেই। ইতোমধ্যে বেশ কিছু পেঁয়াজ খবর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এবং সেগুলো বেশ মজাদারই নয়, সত্যেরও বেশ কাছাকাছি।

‘কাছাকাছি’ শব্দটা ঠিক হলো না, আসলে ওগুলোই বাস্তব ঘটনা, পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর মূল কারণ, যে কথা ইতোপূর্বে সবাই বলেছেন, কাগজগুলোরও মন্তব্য- ‘সিন্ডিকেট’। আমদানিকারক ও বৃহৎ ব্যবসায়ীকুল ও পাইকারি বাজার সিন্ডিকেট, যাদের মুনাফাবাজির সীমা-পরিসীমা নেই। স্বভাবতই একটি দৈনিকে খবর- ‘কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করেছে এনবিআর/৩৪১-এর প্যাঁচে পেঁয়াজ’। সঙ্গে ছোট অক্ষরে খবর- ‘১৩ আমদানিকারক শুল্ক গোয়েন্দারা মুখোমুখি হচ্ছেন’।

তাদের ভাষ্যমতে, ‘সরকারের এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এক শ্রেণির কারবারি পেঁয়াজের আক্রার বাজারকে কাজে লাগিয়ে কৌশলে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে করেছে অসাধু কর্মকাণ্ড। পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজিতে জড়িত ৩৪১টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ ঘটনাটিকেই তারা চরম ভাষায় বলেছেন- ‘৩৪১-এর প্যাঁচ’।
এ খবরটি গত ২৫ নভেম্বরের। এ সত্যটিই ইতোপূর্বে দৈনিকের পাতায় একাধিক উপসম্পাদকীয়তে উঠে এসেছিল হুঁশিয়ারি হিসেবে। ব্যবস্থা আগেই নেয়া উচিত ছিল, গুদাম অভিযান ও জিজ্ঞাসাবাদসহ একাধিক তৎপরতায়। জানি না, পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজিতে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রকট সত্যের অবশেষ পরিণাম কী হবে? তাদের এই সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ মুনাফাবাজির যথাযথ শাস্তি যদি না হয়, তাহলে সব পণ্যের বাজারই এভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হতে থাকবে।
এ ঘটনা এখানে শেষ নয়। এই অবৈধ ও অন্যায় মুনাফাবাজি প্রসঙ্গে অন্য একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনামে লেখা হয়েছে- ‘অতিরিক্ত মুনাফার ৩০০ কোটি টাকা গেল কোথায়’। এ বিষয়ে এখনো রহস্য উদঘাটিত হয়নি, হয়তো হবে জিজ্ঞাসাবাদের পরিপ্রেক্ষিতে। তবে মানুষ, বিশেষ করে রাজনীতি-সচেতন মানুষ তা অনুমান করতে পারছেন। এবং তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকারক সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। সেই কথাটির নেপথ্য সত্য হলো দুর্নীতি, যা বাংলাদেশের সমাজে ব্যাধির মতো জাল বিস্তার করে চলেছে। সহজে এই ফাঁদ থেকে মুক্তি নেই বাংলাদেশের।

দুই.
গত বিশ্বযুদ্ধের (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের) সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত, দুর্নীতিগ্রস্ত বঙ্গদেশের সমাজে কয়েকটি শব্দ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। আর সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের কবি-সাহিত্যকরা কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে তা চিরস্থায়ী করে রেখেছেন। কথাগুলো হলো মজুতদার, কালোবাজারি, চোরাকারবারি। এর পরিণাম সমাজের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। অসাধু ব্যবসায়ীকুল সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয়, এর বিস্তার ঘটেছে সমাজের সর্বাঙ্গে।

এবার পেঁয়াজ নিয়েও সেই পূর্ব আলামত ভালোভাবেই দেখা গেল। মজুতদারি এমন পর্যায়েই পৌঁছালো যে, শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের স্বনামখ্যাত খাতুনগঞ্জ আড়তের গুদাম থেকে ক’দিন আগে পচা পেঁয়াজ বাজারে বাজারে বেরিয়ে এলো, যা অখাদ্য বলা চলে। তবু কিছুসংখ্যক মেহনতি মানুষ সস্তা দামে সেগুলোই কিনেছে এমন সংবাদ দৈনিক পত্রিকার কলামে।

আর কালোবাজারির বাজার কিছুটা কমে এলেও পেঁয়াজের দুর্দিনে ঠিকই তার আলামত দেখা গেল। টিসিবি নিয়ে আমাদের সংশয় আগেও ছিল, এবার দৈনিকপত্রের খবর (২৬ নভেম্বর, ২০১৯) ‘টিসিবির পেঁয়াজ কালো বাজারে’ (সমকাল)। ঘটনার বিশদ বিবরণ নামটামসহ প্রকাশ পেয়েছে ওই পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদনে। পেঁয়াজ নিয়ে মানুষের চরম আর্থিক ভোগান্তির মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই দুর্নীতির তদন্ত হবে কি, শাস্তি হবে কি, অপরাধীদের জনবিরোধী-সমাজবিরোধী দুর্নীতিমূলক কার্যকলপের জন্য।

আমরা একাধিকবার লিখেছি, শর্ষের মধ্যে ভ‚তের অবস্থানের কথা সেক্ষেত্রে সরকারের যে কোনো প্রকার সদিচ্ছা বা তৎপরতা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই একটি দৈনিকে তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম- ‘সব পদক্ষেপে পানি ঢেলে পেঁয়াজে আগুন বাড়ছেই’। লেখা হয়েছে- ‘পেঁয়াজের কেজি আবারো ২৫০ টাকা। সরকারের নানা পদক্ষেপ ব্যর্থ করে দিয়ে সহজলভ্যতার বদলে এটি ক্রমেই আরো অধরা হয়ে পড়ছে।’
প্রতিবেদনটি দীর্ঘ, প্রায় অর্ধেক পাতাজুড়ে (কালের কণ্ঠ)। আমরা বিশদ বিবরণে যাচ্ছি না, শুধু চাই সরকার এসব ঘটনা আমলে নিয়ে অসাধু সরকারি কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন, সাধারণ ভোক্তা-ক্রেতাদের ভোগান্তির হাত থেকে বাঁচান, নিজেরাও বাঁচুন। কারণ অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ সবাই জানেন, দেশে থাকে না, কাজে লাগে না। বিদেশে পাচার হয়ে যায়।
স্বভাবতই পেঁয়াজ কেলেঙ্কারি নিয়ে সংবাদপত্রে শিরোনামের পর শিরোনাম। আগের একটি সংবাদ শিরোনাম- ‘পেঁয়াজ নৈরাজ্য ঠেকাতে সব উদ্যোগ অকার্যকর’। আমরা এ প্রতিবেদনেরও বিশদ বিবরণে যাচ্ছি না। কারণ এরপরও নভেম্বর জুড়ে পেঁয়াজ নিয়ে শুধুই অশুভ খবর-‘বিমানে এনেও সংকট কাটছে না পেঁয়াজের।’ ‘ঝাঁজ কমেনি পেঁয়াজে’/‘শীতের সবজিও চড়া’।
এর মধ্যে নতুন খবর ‘১ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ পৌঁছল চট্টগ্রাম বন্দরে।’ তাতে কী হবে? এর আগে বিমানেও এসেছিল পেঁয়াজ। কিন্তু পেঁয়াজের দাম কমেনি। আসলে গোড়ার গলদ ঠেকাতে না পারলে কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হয় না। এবার পেঁয়াজ মারাত্মকভাবে তা প্রমাণ করে দিল কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া অবধি পেঁয়াজ নিয়ে ‘কানামাছি খেলা’ বন্ধ হবে না। এবার সরকার ভেবে দেখুন, কী করবেন।
তিন.
পেঁয়াজ নিয়ে সর্বনাশা তুলকালামের ‘বিবিসির প্রতিবেদন’ ভিত্তিতে বিজ্ঞজনদের চলছে পেঁয়াজ প্রসঙ্গের পোস্টমর্টেম, গবেষকের ভঙ্গিতে। অবশ্য এটাও দরকার। যেমন দেশের মোট চাহিদা, উৎপাদন ও উৎপাদন সমস্যা, নতুন উৎপাদন পদ্ধতির উদ্ভাবন, দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া, পূর্বাহ্নে সতর্কতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। সবারই কথা, পূর্বাহ্নে সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি। কিন্তু তাই বলে মজুতদারি-কালোবাজারি অপরাধ তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। ব্যবস্থা সেখানেও নিতে হয়। তা না হলে সব আয়োজন ব্যর্থ।
এ পর্যালোচনায় অবশ্য সঠিকভাবে বলা হয়েছে, সরকার পক্ষে ‘মনিটরিং বাড়ানোর কথা, সুপার প্রফিটের সুযোগ বন্ধ করার কথা, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা ও প্রয়োজনে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার কথা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অসুস্থ মানসিকতা কি বিনা ব্যবস্থায় দূর হয়? হয় না।’
আমরা জানি না, অতসব সত্ত্বেও পেঁয়াজ নিয়ে বাজারের এ নৈরাজ্য কবে কাটবে? আদৌ কাটবে কিনা উৎপাদিত দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বাজারে না আসা অবধি। আসলে বড় সমস্যা হলো মজুতদারি, কালোবাজারির মতো দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে মারাত্মক ক্ষতের গায়ে হালকা মলম লাগিয়ে কিছু হবে না। আমরা জানতে চাই এনবিআর শেষ পর্যন্ত কী শনাক্ত করল এবং সরকার অপরাধের কী ব্যবস্থা নিল।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।