কৃষক বাঁচাতে মাঠে সরকার

আগের সংবাদ

স্বাধীনতাবিরোধীদের কবর সংসদ থেকে সরবে কবে?

পরের সংবাদ

অধরা এক অঙ্কের সুদহার

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৫, ২০১৯ , ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

অধরা রয়ে গেল ব্যাংক ঋণে এক অঙ্কের সুদহার। উল্টো ঋণের ওপর সুদের হার বেড়েই চলেছে। অনেক ব্যাংক আবার ঘোষণা দিয়েই ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করছে। এর মধ্যে লাগামছাড়া ক্রেডিট কার্ডের সুদ। ফলে ঋণের প্রত্যাশিত নয়ছয় সুদের হার কাগজে কলমেই থাকছে। চলতি বাজেটে ঋণ ও  আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা থাকলেও সেটিও মানেনি ব্যাংকগুলো। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি দেশের সব ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সুদহার কমাতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সুদহার কমাতে মুদ্রাবাজার পর্যালোচনা জরুরি বলে আলোচনা করা হয়। এ জন্য ঋণ ও আমানতের পরিমাণ ও সুদহারসহ বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়। এগুলো হাতে পেলে তা যাচাই-বাছাই করে সুদহার কমানোর করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও এবিবি চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে কি করা যেতে পারে এ বিষয়ে প্রথম মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ঋণ ও আমানতের সুদহার কি অবস্থায় আছে, কোনো খাতে কত টাকা ঋণ আছে ও আমানত আসছে, এ ছাড়া কোন খাতে কত টাকা ঋণের সুদ ধার্য আছে, এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং তা যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর মুদ্রাবাজার পর্যালোচনার পর কমিটি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে বৈঠকে অংশ নেয়া কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সরওয়ার ও এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেন।

এ বিষয়ে কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ জানান, সুদহার হঠাৎ করে একেবারে কমানো যাবে না। আমরা চেষ্টা করছি সুদহার আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে। তিনি বলেন, ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে একেবারে তিন শতাংশে আনাটা কঠিন। কারণ এখন যাদের ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ আছে তাদের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা লাভ থাকবে না। অন্যদিকে ৬ শতাংশ হারে সরকারি আমানত ব্যাংকগুলো পাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় হয় প্রায় ৯ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আমরা ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার এক অংকের ওপর দেখতে চাই না। পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ ও আমানতের সুদের হার এক অংকে নামিয়ে না আনলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে সুদহার কমাতে রাজি হচ্ছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কার্যরত ৫৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে অধিকাংশই এখনও দুই অঙ্কের সুদ নিচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণে সুদ নিয়েছে ১২ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ। দুটি ব্যাংক ১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদে এসএমই ঋণ দিয়েছে। বাড়ি-গাড়ি কেনার ঋণে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ সুদ নিচ্ছে ব্যাংক। ক্রেডিট কার্ডে অধিকাংশ ব্যাংকের সুদহার রয়েছে ১৮ থেকে ২৭ শতাংশ। সরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলো অবশ্য উৎপাদনশীল খাতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। তবে ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং নানা জটিলতার কারণে অনেক সময় উদ্যোক্তারা সরকারি ব্যাংকে যেতে আগ্রহ দেখান না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুদহার নিম্নমুখী ধারায় রাখতে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতে সুদহারের সর্বোচ্চ গড় ব্যবধান ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা রয়েছে। আবার উচ্চ সাজসজ্জায় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে খরচ কমানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ঋণের সুদহারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে বছরে এক শতাংশের বেশি সুদ না বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়। অন্য এক নির্দেশনার মাধ্যমে অন্য যে কোনো ঋণের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি সুদ নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে বেশিরভাগ ব্যাংক এসব নির্দেশনা মানছে না।

এদিকে ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিক কমছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে ঋণ প্রবৃদ্ধির ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ হয়েছে। আগের মাস সেপ্টেম্বর ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে। এর আগে আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। জুলাই শেষে ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মে মাসে যা ছিল ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস এপ্রিলে ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, মার্চে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ।