শিক্ষার্থী আন্দোলন বৃথা গেছে

আগের সংবাদ

প্রচারণায় আধুনিকতা, এগিয়ে ক্লিন ইমেজ

পরের সংবাদ

স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে শতাধিক স্থাপনা

ঝর্ণা মনি:

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২, ২০১৯ , ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

‘সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, ঘর ভেঙ্গে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে,/যশোর রোডের দু’ধারে মানুষ এত এত লোক শুধু কেন মরে?/শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শিশু মরে গেল,/যশোর রোডের যুদ্ধক্ষেত্রে ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো/কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,/আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে/ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ,/মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালো রাত কবে হবে শেষ।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অনবদ্য দলিল মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সাড়া জাগানো কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর এই চরণগুলো আজো চোখে জল আনে। পাঠ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাত্তরের বিভীষিকাময় স্মৃতি, ঐতিহাসিক যশোর রোডের লাখ লাখ শরণার্থীর মানবেতর জীবনযাপন, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, ধর্ষিত মায়ের আহাজারি। বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ থেকে কলকাতার দমদম পর্যন্ত এই সড়ক ধরেই একাত্তরে লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর এই সড়ক হয়েই বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কলকাতা থেকে শত্রু মুক্ত যশোরে পৌঁছান। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও ঐতিহাসিক যশোর রোডের নাম স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধী, মুসলিম লীগের নেতা আইয়ুব খানের মন্ত্রী খান-এ-সবুরের নামে!

২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর ‘খান-এ-সবুর’ সড়কের নাম প্রত্যাহার করে আগের ‘যশোর রোড’ নামটি ফিরিয়ে আনতে আদালতের দেয়া নির্দেশনা সাত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দেয়ার আদেশ দেয় হাইকোর্ট। অবশ্য এর আগে ৩১ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়ার পর খান-এ-সবুর সড়কের নামফলক ভেঙে দেয় ছাত্রলীগ। তবে এখনো সড়কের অনেক দোকানপাটে কুখ্যাত ‘খান-এ-সবুর’ নামেই রয়েছে। গত ১৪ নভেম্বর ফের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব স্থাপনা ও সড়ক থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণে ৯০ দিন সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে হাইকোর্ট। আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আদেশ বাস্তবায়ন করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে দেয়া ২০ স্বাধীনতাবিরোধীর নামে স্থাপনার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলিমের (সাজা খাটার মধ্যেই কারাগারে মারা যান) নামে বগুড়া জেলা পরিষদ মিলনায়তন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নামে হবিগঞ্জের মাধবপুরের নোয়াপাড়ায় বাসস্ট্যান্ড ও কায়সারনগর এলাকা, পাবনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুদ্দীন ইয়াহইয়াহ খান মজলিসের নামে সিরাজগঞ্জে ইয়াহইয়াহ স্কুল এন্ড কলেজ, রাজাকার ও শান্তি কমিটির নেতা আবদুর রাজ্জাক মিয়ার নামে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘শহীদ আবদুর রাজ্জাক রোড’, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাজাকার ও শান্তি কমিটির স্থানীয় চেয়ারম্যান এনএম ইউসুফের নামে ‘ইউসুফ গনি স্কুল এন্ড কলেজ, লংলা ইউসুফ কলেজ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য মাহতাব উল্লাহর নামে ‘মাহতাব-সায়েরা হাই স্কুল’, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রাজাকার আবদুল আজিজের নামে ডেলকা এমসি হাই স্কুল ও বেলকা রোডে রায়জীবন ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ধর্মপুরে স্বাধীনতাবিরোধী আবদুল জব্বারের নামে আবদুল জব্বার ডিগ্রি কলেজ, নোয়াখালীর চৌমুহনির রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য তরিকুল্লার নামে হাজী তরিকুল্লাহ রোড, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় রাজাকার মিয়া মনসুর আলীর নামে মিয়া মনসুর আলী একাডেমি, কুমিল্লার দরগাবাড়ী এলাকায় শান্তি কমিটির সদস্য রেজাউর রহমানের নামে ‘রেজাউর রহমান রোড’, নাটোরে রাজাকার আবদুস সাত্তার খানের নামে মধু মিয়া রোড, নাটোরে রাজাকার কোসের উদ্দিনের নামে কোসের উদ্দিন রোড, পুরান ঢাকায় মুজাহিদ বাহিনীর মোহাম্মদ তামিমুল এহসানের নামে রাস্তা, পুরান ঢাকায় মুজাহিদ বাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ ওরফে হাফেজ্জী হুজুরের নামে রাস্তা, নেত্রকোনার ফাইলাটি ইউনিয়নে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের নামে হাজী আবদুর রহমান হাই স্কুল, মেহেরপুরের মুজিবনগর এলাকার রাজাকার মিয়া মনসুর আলীর নামে আনন্দবাস মিয়া মনসুর আলী একাডেমি, মেহেরপুর পৌর এলাকার রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সবদার আলীর নামে রাস্তা ও মার্কেট, নরসিংদীর মনোহরদীতে সরকারি শিশু পরিবারের নামফলকের যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নাম এবং ঝিনাইদহের শৈলক‚পায় রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান শফি আহমেদের নামে শফিপুর এলাকা ও শফিপুর পোস্ট অফিস।

শুধু এই ২০ জনের নামেই নয়, সারাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে শতাধিক স্থাপনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা নতুন করে তালিকা তৈরি করছি। আমাদের সব শাখা কমিটি কাজ করছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তালিকা পেয়ে যাব।

তবে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে থাকা পাঁচটি কলেজের নাম পরিবর্তন করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটির রাবেতা মডেল কলেজের নাম পরিবর্তন করে লংডু মডেল কলেজ রাখা হয়েছে। বাকি চারটি কলেজের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে সেগুলো হচ্ছে হবিগঞ্জের মাধবপুরের সৈয়দ সঈদউদ্দিন কলেজ, এর পরিবর্তিত নাম মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রি কলেজ। কক্সবাজারের ঈদগাও ফরিদ আহমেদ কলেজ, পরিবর্তিত নাম ঈদগাও রশিদ আহমেদ কলেজ। টাঙ্গাইলের বাশাইল এমদাদ হামিদা কলেজ, পরিবর্তিত নাম বাশাইল ডিগ্রি কলেজ। গাইবান্ধার ধর্মপুর আব্দুল জব্বার কলেজ, পরিবর্তিত নাম ধর্মপুর ডিগ্রি কলেজ।

এদিকে স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে স্থাপনা ইতিহাসের জন্য কলঙ্কজনক মনে করছেন গবেষকরা। জানতে চাইলে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ভোরের কাগজকে বলেন, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দণ্ড পেয়েছেন, তাদের নামেও স্থাপনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগও নেই। বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য এটা লজ্জাজনক।

এখনো যুদ্ধাপরাধী ও জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের নামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলনায়তন রয়েছে। খুলনায় খান-এ-সবুরের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে তাদের অনেকেই জামায়াত-শিবির ‘শহীদ’ আখ্যায়িত করেছে। এটি জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য মন্তব্য করে শাহরিয়ার কবির বলেন, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জামায়াত ছিল। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। আমরা চেয়েছি এগুলো পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে তিরিশ লাখ কঙ্কালের ওপর। আর এই কঙ্কালের ঘাসে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নামেই স্থাপনা এটি শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করা। গর্হিত অপরাধ। এগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশাসন নির্বিকার।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে স্থাপনা, সড়ক, অবকাঠামোর নামকরণ স্থগিত চেয়ে ২০১২ সালে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবির। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরই ১৪ মে রুলসহ খান এ সবুর ও শাহ আজিজুর রহমানের নাম ব্যবহার স্থগিত আদেশ প্রদান করে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুল জারি করে আদালত। কিন্তু আদেশের দীর্ঘদিন পরও কোনো স্থাপনা থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম না সরানোর কারণে এ বিষয়ে পুনরায় শুনানি নিয়ে প্রশাসনকে শেষবারের মতো সময় বেঁধে দিয়েছে হাইকোর্ট। নতুবা গাফিলতির দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ডিসি