নেপালের হয়ে প্রথম স্বর্নপদক অর্জন মান্দেকাজী শ্রেষ্ঠ’র

আগের সংবাদ

বাংলাদেশকে প্রথম স্বর্ণ উপহার দিলেন দিপু চাকমা

পরের সংবাদ

সেনা সদস্যসহ নিহত ৩৭

শান্তিচুক্তিতেও বছর জুড়ে অশান্ত পাহাড়

নন্দন দেবনাথ, রাঙামাটি থেকে:

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২, ২০১৯ , ১:০০ অপরাহ্ণ

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২২ বছর পার হলেও শান্তি ফিরে আসেনি পাহাড়ে। প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী সংর্ঘের কারণে চরম আতংক বিরাজ করছে। একটার পর একটা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজী, খুন, গুম ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা। ঘটেছে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সেনা সদস্য নিহত হওয়ার মতো ঘটনা।

এছাড়াও সেনা টহলের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে বেশ কয়েকবার। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় পাহাড়ে দীর্ঘ ২২ বছরে প্রাণ হারিয়েছে এক হাজারের বেশি। শুধুমাত্র ২০১৮ সালের তিন পার্বত্য জেলায় নিহত হয়েছে প্রায় ৬৮ জন। ২০১৯ সালে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাঙামাটি জেলায় নিহত হয়েছে ৩৭ জন। অপহৃত হয়েছে ২১ জন। আহত হয়েছে ১৯ জন ও চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক করা হয়েছে ৪৪ জনকে।

সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চার আঞ্চলিক দলের চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২০১৮ সালে ৬৮ জন এবং ২০১৫ সালে ৬৯ জন খুন হন। ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত খুন হয়েছেন ৫৬ জন। এছাড়া ২০১৪ সালে ৫৪ জন, ২০১৬ সালে ৪১ জন এবং ২০১৭ সালে ৩৩ জন খুন হয়েছেন। আহত হয়েছে ১২০৮ জন, অপহরণ হয়েছে ১৮৪৪ জন।

২২ বছরে পাহাড়ের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সেনাবাহিনীর দফায় দফায় গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পসহ আস্তানা ধ্বংস করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে রকেট লাঞ্চার, গ্রেনেড, একে-৪৭ সহ অত্যাধুনিক অস্ত্র।

এদিকে শুধুমাত্র রাঙামাটি জেলায় জানুয়ারি হতে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ জানুয়ারি বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের একজন নিহত হয়। ৯ জানুয়ারি কাপ্তাইয়ের গবাছড়িতে সেনাঅভিযানে অস্ত্র ও গুলিসহ আরাকান লিবারেশন পার্টির ২ সদস্য আটক। ১৭ জানুয়ারি সাজেকে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধে মোটরসাইকেল আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ২২ জানুয়ারি রাঙামাটির আসামবস্তি এলাকা থেকে জেএসএসের চাঁদা কালেক্টর অস্ত্রসহ আটক। ২৯ জানুয়ারি লংগদুতে দুর্বৃত্তদের ব্রাশ ফায়ারে ইউপিডিএফ কালেক্টর নিহত।

এর পরের মাসে ২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি নানিয়ার উপজেলার চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সমর্থিত পিসিপি রাঙামটি জেলা সভাপতি কুনেন্টু চাকমাকে গুলি, বিদেশি পিস্তল ও নগদ ৪ লক্ষ টাকাসহ আটক করেছে যৌথ বাহিনী। ৪ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি কাপ্তাইয়ের রাইখালীর কারিগর পাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে ২জন নিহত। ৮ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটিতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র দলের ৩ সক্রিয় সদস্য আটক। ৯ ফেব্রুয়ারি কাপ্তাইয়ে জোড়া খুনের ঘটনায় ৮ ব্যক্তি গ্রেপ্তার। ১১ ফেব্রুয়ারি বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি সীমান্তবর্তী দূর্গম দুমদুম্যার নির্বাণ গুহা বিমুক্ত বৌদ্ধবিহার থেকে ধর্মজিৎ ভান্তেসহ অপর ৩ জনকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও বর্মাসহ ৬ খুনের আসামি ইউপিডিএফ সমরিক শাখার প্রধান আনন্দ প্রকাশ চাকমাকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১।

এরপর ২ মার্চ রাঙামাটির লংগদুতে স্পিড বোটে দুর্বৃত্তদের হামলায় ২ জন আহত হয়। ৩ মার্চ রাজস্থলী উপজেলার ফারুয়া স্টেশনে দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষণ ঘটে। ৭ মার্চ বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইউপিডিএফের প্রধান সমন্বয়ক নিহত। বাঘাইছড়িতে দূর্গম সাজেকে সন্ত্রাসীদের সাথে সেনাবাহিনীর গুলি বিনিময়, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ সাময়িক সরঞ্জামাদি উদ্ধার। ১৮ মার্চ বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত গাড়িবহরে সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে ৬ জন নিহত, ১১ জনকে চট্টগ্রামে প্রেরণ। ১৯ মার্চ বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগ উপজেলা সভাপতি সুরেশ কান্তি তংচঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা। ২৩ মার্চ কাউখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতিকে হত্যার হুমকি। ২৮ মার্চ বাঘাইছড়িতে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত দুই সন্দেহভাজন আটক। ৩০ মার্চ রাঙামাটির লংগদুতে শিশুর কলাকাটা লাশ উদ্ধার।

পরের মাসে ৭ এপ্রিল লংগদুর কাট্টলী এলাকায় সন্ত্রাসীদের সাথে যৌথবাহিনীর গুলি বিনিময়, অস্ত্রসহ আটক-৫। ১০ এপ্রিল বাঘাইছড়ির বাঘাইহাটে ইউপিডিএফের মুল দলের অন্যতম সমন্বয়ক অস্ত্রসহ আটক। ২০ এপ্রিল রাঙামাটিতে পুলিশ সদস্যের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার। ২৩ এপ্রিল রাজস্থলীতে ইউপি মেম্বার মংক্যসিং মারমাকে অপহরণ।

এরপর মে মাসেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৮ মে রাঙামাটির বরকলে ছুরিকাঘাতে এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত। ১২ মে কাপ্তাইয়ে দেশীয় এলজিসহ দুইজন আটক হয়। ২০ মে বাঙ্গালহালিয়াতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে যুবলীগের নেতা নিহত হন। ২১ মে লংগদুতে দেশীয় অস্ত্রসহ এক চাঁদাবাজ আটক হয়। ২৮ মে রাঙামাটিতে এক ব্যবসায়ীর ওপর দুর্বৃত্তদের হামলাসহ আড়াই লাখ টাকা লুট করা হয়। ৩০ মে লংগদুতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের এক কর্মী নিহত।

পরে ১০ জুন বাঘাইছড়ির বাঘাইহাট-দীঘিনালা সড়কে চাঁদার দাবিতে মালবাহী ট্রাকে আগুন দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। ১২ জুন ইউপিডিএফের সশস্ত্র শাখার সদস্য সুজন চাকমা আটক হন। ১৬ জুন নানিয়ারচরে চাঁদাবাজীর অভিযোগে ইউপিডিএফের ৩ কর্মীকে আটক করা হয়। ২০ জুন মানিকছড়িতে অজ্ঞাতনাম যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার। ২৭ জুন বকরলের সুবলং এলাকায় জেএসএস (সংস্কারপন্থী) জেএসএস (মুলদল) মধ্যে গুলিবিনিময়ে একজন নিহত হয়।

পরের জুলাইয়ের প্রথমদিনেই বাঘাইছড়ির করেঙ্গাতলী বাজারে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতংক সৃষ্টি করা হয়। এদিন ১৫ জনকে অপহরণ ও পরে ১০ জনকে মুক্তি দেয়া হয়। পরদিন ২ জুলাই কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনার রাইখালীর গবাছড়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে মা ও মেয়ে নিহত হন। ৩ জুলাই বাঘাইছড়ির সাজেকে সেনা অভিযানে ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপের এক জন আটক হয়। ৫ জুলাই রাঙামাটিতে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র ও এ্যামোনেশনসহ ইউপিডিএফ (মুলদল) সশস্ত্র সন্ত্রাসী দুই চাঁদাবাজ কালেক্টর আটক হয়। ২৫ জুলাই কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান অববস্থায় প্রেমিক যুগলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৭ জুলাই কাপ্তাইয়ে উপজাতীয় অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার। ২৯ জুলাই নানিয়ারচরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র গ্রুপের এক চাঁদাবাজ আটক।

এরপর ৬ আগস্ট বাঘাইছড়িতে অস্ত্রসহ ইউপিডিএফ’র সহযোগী সংগঠনের সভাপতি গ্রেপ্তার হন। ১৪ আগস্ট বাঘাইছড়িতে জে এস এস এম এন লারমা গ্রুপের দুই সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৮ আগস্ট রাজস্থলীতে সেনাটহল দলের ওপর সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ, গুলিবিদ্ধ হয়ে এক সেনা সদস্য নিহত, অভিযানের সময় মাইন বিষ্ফোরণে ৩ সেনা সদস্য আহত। ২০ আগস্ট বাঘাইছড়িতে জেএসএস দুই নেতা হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহভাজন একজন আটক। ২১ আগস্ট বাঘাইছড়িতে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে দুই নেতার হত্যা মামলার আসামি আটক হয়। ২৩ আগস্ট বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর টহল দলের গাড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলি, সেনাবাহিনীর পাল্টা গুলিতে ইউপিডিএফের শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত হন। ২৯ আগস্ট রাজস্থলীতে সেনা সদস্য হত্যার মামলার আসামি ক্যাইচিং মারমাকে আটক করে যৌথ বাহিনী।

পরের মাস সেপ্টেম্বরেও বেশ কয়েকটি সংহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৪ সেপ্টেম্বর রাজস্থলীতে সেনাবাহিনীর হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত মামলায় আরো একজন আটক হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থলীতে সন্দেহজনক ২ জনকে আটক করে যৌথ বাহিরী। বাঘাইছড়ি থানা ওসি মনজুরকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর লংগদু থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিরিত সন্তু গ্রুপের সমর্থিত ২ গ্রামবাসীকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। ১৮ সেপ্টেম্বর বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের দুই কর্মী নিহত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর কাউখালীতে চাঁদা না দেয়ায় বটতলী সড়কে যান চলাচল বন্ধ, চাঁদা চেয়ে ব্যবসায়ীদেরও চিঠি দেয়া হয়। বাঘাইছড়িতে জেএসএস দুই কর্মীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান বড় ঋষি চাকমাকে প্রধান করে থানায় মামলা করা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর চেক প্রতারণা মামলায় কাউখালী কলমপতি মৌজা হেডম্যান গ্রেপ্তার হয়।

১১ অক্টোবর রাজস্থলী দুর্বৃত্তের গুলিতে একজন নিহত হয়। নিহত যুবক জেএসএস এর সক্রিয় কর্মী। রাঙামাটিতে অস্ত্রসহ ইউপিডিএফ ও জেএসএস দলের দুই সক্রিয় কর্মী আটক হয়। ২৩ অক্টোবর রাজস্থলীর অপহৃত হেডম্যান দ্বীপময় তালুকদারকে গুলি করে হত্যা, লাশ নিয়ে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ হয়।

এরপর ১৮ নভেম্বর রাজস্থলী উপজেলার দুর্গম বালুমুড়া মারমা পাড়ায় আঞ্চলিক সংগঠনের মাঝে বন্দুকযুদ্ধে ৩ জন নিহত হয়। ২০ নভেম্বর রাজস্থলীতে সন্ত্রাসীদের হামলায় ঠিকাদার আহত হয়। ২১ নভেম্বর রাজস্থলী ৫ কিলোমিটার ক্যাংম্রং পাড়ায় সন্ত্রাসীদের আক্রমণে জুম চাষী গুরুতর আহত হয়। ফাঁকা গুলিবর্ষণে এলাকাবাসীদের মধ্যে আতংকের সৃষ্টি হয় ।

সর্বশেষ ১ ডিসেম্বর রাঙামাটির মগবান এলাকায় আঞ্চলিক দলের চাঁদা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে জেএসএস (সন্তু গ্রুপের) চিফ কালেক্টর বিক্রম চাকমা নিহত।

ডিসি