ভোলায় মোটর সাইকেলের ধাক্কায় আ. লীগ নেতা নিহত

আগের সংবাদ

বিষম দইরার ঢেউ

পরের সংবাদ

কাশ্মির ইস্যু ও ভারত-পাকিস্তান বিরোধ

শাহীন রেজা নূর

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২, ২০১৯ , ৬:৩০ অপরাহ্ণ

গত আগস্টে ভারত সরকার বিল ৩৭০ বাতিলের পর একশ দিন অতিবাহিত হয়েছে ইতোমধ্যে। এই বিলের বিরুদ্ধে কিছু কিছু মহলের আপত্তি, ক্ষোভ-বিক্ষোভের মাঝেও জম্মু ও কাশ্মিরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে বলে বিভিন্ন ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। ওই বিলটি বাতিলের পর পরই পাকিস্তানের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট কোনো কোনো মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী কাশ্মিরের জনগণকে ভারতের বিরুদ্ধে তথা ওই বিল বাতিলকরণের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য বেশ তৎপরতা চালানো সত্তে¡ও ভারতের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিই বিশ্বব্যাপী সমর্থন দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। ভারত বলছে যে, পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিরা যাতে ওই রাজ্যে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্য রাজ্যের সর্বত্রই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে যাতে কিনা রাজ্যে স্বাভাবিকত্ব বিরাজ করে। শুরুর দিকে খাদ্য ও বেসামরিক সরবরাহের ক্ষেত্রে তিন মাসের মজুদ গড়ে তোলা হয়েছিল এবং ক্রমান্বয়ে মোবাইল ফোন সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্কুল-কলেজ ও স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধপত্রের সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া হয়।

বর্তমানে লাদাখ, জম্মু ও কাশ্মিরে মোট ১৯৯টি থানার মধ্যে মাত্র ১১টিকে দিনের বেলায়ও বিশেষ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। জঙ্গিরা ভয়ভীতি প্রদর্শন সত্তে¡ও সরকারি দপ্তর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখা হয়েছে। কেবলমাত্র ইন্টারনেট সার্ভিস এখনো পুরোদমে চালু করা হয়নি, কেননা এর মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের জন্য গুজব ছড়িয়ে হিংসা হানাহানির উসকানি দেয়ার সুযোগ পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন যেখানে ওই রাজ্যে স্বাভাবিকত্ব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট সেখানে সন্ত্রাসীরা আপেল ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ শ্রমিকদের হত্যার মাধ্যমে ভীতি সঞ্চার করে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, শত শত পোস্টারের মাধ্যমে কোমলমতি স্কুলছাত্র, দোকানদার, ফল উৎপাদনকারী, পরিবহন শ্রমিক ও সরকারি কর্মচারীদের তাদের স্ব স্ব কর্মস্থল বর্জনের জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চলেছে। ভারতের এ বিষয়ক বক্তব্য এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য : ভারতীয় সেনারা এদের মোকাবেলায় অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে এবং আগস্টের পর এ অবধি একটি তাজা গুলিও কারো বিরুদ্ধে নিক্ষেপ করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

অন্যদিকে সন্ত্রাসীরা ৯ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এ যাবৎ। এছাড়াও সন্ত্রাসীরা মালবাহী গাড়ি, স্কুল ও হাসপাতালেও আক্রমণ চালায়। এদিকে বিরোধীরা ধর্মের নামে কাশ্মিরবাসীকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা চালালে ভারতের সর্ববৃহৎ মুসলিম সংগঠন জামায়াত এ ওলামায়ে হিন্দ বিল ৩৭০ বাতিলের বিষয়টিকেই এক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করে। ওই প্রস্তাবে আরো বলা হয় যে, কাশ্মির ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ভারতের ঐক্য ও অখন্ডতা বজায় রাখা সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্য। কোনো প্রকার বিচ্ছিন্নতাবাদী চেষ্টা দেশের কারুর জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না, এমনকি কাশ্মিরিদের জন্যও নয়।

এদিকে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কাশ্মিরের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে একটি আন্তর্জাতিক সংকটের রূপ দেয়ার জন্য অনেক প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজের অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে মেলে ধরায় তা তাদের অনুকুলে থাকার সহায়ক হয়েছে বৈকি। ইতোমধ্যে নানাবিধ কর্মসূচি হাতে নেয়ায় লাদাখ, জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের জীবনযাত্রার মান দ্রুত উন্নততর হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। সার্বিক উন্নয়ন আর রাজ্যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য ইতোমধ্যে অনেক কর্মসূচি ও পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েছে আর এতে করে সেখানকার নারী ও শিশুসহ সবার সার্বিক অধিকার লাভ সহজতর হবে এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে ভারতের তরফ থেকে আরো দাবি করা হয়েছে যে, সব আন্তর্জাতিক ফোরামে কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করতে ব্যর্থ হয়ে জম্মু, কাশ্মির ও লাদাখকে অশান্ত করে তোলার জন্য পাকিস্তান তাদের জঙ্গিসহ সব প্রকার ভারত বিরোধীদের উসকানি দিচ্ছে। আর এসব উসকানিতে পাকিস্তানি ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের মন্ত্রীবর্গ প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। পাকিস্তানের এই তৎপরতা তথা ভারতের বিরুদ্ধে তাদের এই জেহাদের ডাক প্রকারান্তরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভয়াবহরূপ ধারণ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ভারত ৩৭০ বিলটি বাতিল অর্থাৎ কাশ্মির রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করায় পাকিস্তান নানাভাবে ভারতবিরোধী ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য স্থাপনের যাবতীয় ভারতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তান একতরফাভাবে এবং কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং ডাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর অন্যদিকে সরকারি সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পাক কর্তৃপক্ষ জঙ্গি সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনকে অনুমোদন দিয়েছে।

সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফুর রহমান আলভী স্বয়ং ভারতের বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু করার আহ্বান জানান। এদিকে পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারুক হায়দার তরুণদের প্রতি ভারতবিরোধী তৎপরতায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী মাহমুদ খান এই আহ্বানে সাড়া জুগিয়েছেন। সেনাবাহিনীও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। পাক সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রিমন্ত্রীও যৌথভাবে প্রদত্ত বিবৃতিতে কাশ্মিরে যে কোনো প্রকারের ভারতীয় উদ্যোগ নস্যাতের ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে অপর কুখ্যাত জঙ্গি গ্রুপ ‘জৈশ-ই-মোহাম্মদে’র প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহার আর কালক্ষেপণ না করেই জেহাদে অংশ নিতে কাশ্মিরিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এই ব্যক্তি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়।

যাহোক এটা এখন পরিষ্কার যে, ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের ব্যবহারের ব্যাপারে পাক কর্তৃপক্ষ সেখানকার জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রতি এখন অত্যন্ত নমনীয় ভ‚মিকা পালন করছে। এ বছরের গোড়ার দিকে বালাকোটের পাকিস্তানি জঙ্গি ঘাঁটিগুলো ভারতীয় বিমান বাহিনী গুঁড়িয়ে দেয়ার পর এখন সেখানকার লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা আবার সমবেত হওয়া শুরু করেছে এবং গুলপুর ও কোহলির জঙ্গি ক্যাম্পগুলোতে সেখানকার মানুষদের জড়ো করা হচ্ছে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে। এই সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে জঙ্গি সংগ্রহ অভিযান চালাচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবরে প্রকাশ। পাকিস্তানের সোয়াত, পেশোয়ার, কোয়েটা প্রভৃতি অঞ্চলে চলছে এই জঙ্গি সংগ্রহের কাজ। অন্যদিকে আবার নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনে জৈশ-ই-মুহাম্মদ আফগানিস্তানে অবস্থানরত তাদের ক্যাডারদের পর্যায়ক্রমে জম্মু ও কাশ্মিরে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানকার জঙ্গিদের পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যাম্পে নিয়ে উন্নততর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে যার পরিচালনায় রয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত জঙ্গি সংগঠন ‘লস্করে তৈয়েবা’ও একই উদ্দেশ্যে তাদের মিরপুরের মংলা এবং সিয়ালকোটের হেডিমোরাল সন্ত্রাসী ক্যাম্পগুলোকে পুনর্গঠিত করা শুরু করেছে। এই সংগঠনটির নেতা হাফিজ সাঈদ বর্তমানে কারাগারে আছে কিন্তু তার ছেলে তালহা সায়ীদ বক্তৃতা এবং ভিডিও ক্লিপ মারফত কাশ্মিরে জেহাদ শুরু করার পক্ষে ওকালতি করে যাচ্ছে।

মোদ্দাকথা, আইএসআই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার কোনো মওকাই হাত ছাড়া করতে চায় না। আর তাই অন্য সব জঙ্গি সংগঠনের মতোই ‘হিজবুল মুজাহিদিনে’র ক্যাডারদেরও সক্রিয় করে তোলা হচ্ছে সেখানে। আর এই উপায়ে পাকিস্তান সরকার ও আইএসআইয়ের মদদে দেশের সব জেলা থেকেই বিপুলসংখ্যক জঙ্গিকে জড়ো করা হচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর উদ্দেশ্যে। বলাই বাহুল্য যে, পাকিস্তানের এ জাতীয় তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক।

শাহীন রেজা নূর : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

এমএইচ