ইতিহাসে আজকের এই দিনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ

আগের সংবাদ

সিইসির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে চার কমিশনার চিঠি

পরের সংবাদ

নারী নির্যাতন : মানবাধিকার লঙ্ঘন

সীমা মোসলেম

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ২৫, ২০১৯ , ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

‘ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ- আসুন এ অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই’ স্লোগান নিয়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ।

নারীর প্রতি সহিংসতা বর্তমান সময়ে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জাতীয় ও বৈশ্বিকভাবে। ইউএন উইমেনের তথ্য অনুসারে প্রতি তিনজনে একজন নারী ও কন্যা তার নিকট সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক অথবা যৌন হয়রানির শিকার হন। প্রতি দুজনে একজন নারী হত্যার শিকার হন নিকটতম সঙ্গী দ্বারা। মাত্র ৫২ শতাংশ নারী তার প্রজনন স্বাস্থ্য, জন্ম বিরতিকরণ ওষুধ গ্রহণ ও সন্তান জন্মদান ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নারীর প্রতি সহিংসতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা হলেও চ‚ড়ান্ত বিচারে তা জেন্ডার ও মানবাধিকার ইস্যু।

নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনকে আলাদাভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি বিদ্যমান সামাজিক প্রক্রিয়ার ফল। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকায় ডমিনিক্যান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ভূমিকার জন্য পাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মির্নাভা এই তিনজন গির্জার সিস্টারকে হত্যা করা হয়। ১৯৮১ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।

১৯৯৩ সালে ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে নারী-পুরুষের মধ্যে অসমতা ও বৈষম্যের কারণে জেন্ডারভিত্তিক যে সহিংসতার সৃষ্টি হয় তা বিশেষ গুরুত্ব পায় এবং এই দিবসটি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ এই দিনটিকে কেন্দ্র করে ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ’ হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলন, সরকারি-বেসরকারি সংগঠক, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন সংগঠিত করার লক্ষ্যে পক্ষটি পালন করে আসছে।

১৯৯৩-এর মানবাধিকার সম্মেলনে সমগ্র বিশ্ব দুটি প্রত্যয় লাভ করে- ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার এবং নারী নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘন’। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয় ১৯৪৮-এর সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৪৩ বছর পর আবারো বলতে হলো নারীর অধিকার মানবাধিকার। ইতোমধ্যে জাতিসংঘে গৃহীত বিভিন্ন সনদ ও ঘোষণায় নারীর অধিকারহীনতা ও পশ্চাৎপদতার যে ভিন্ন মাত্রা রয়েছে তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়নি। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র লক্ষ করা যায়, যা অতীতের সব উদাহরণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নিজ গৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, যানবাহনে, পথে, বাজারে। সহিংসতার সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি বর্বরতার ধরন ও নৃশংসতার মাত্রার ভয়াবহতা লক্ষ করা যায়।

দেখা যাচ্ছে নির্যাতনকারী হচ্ছে পরিবারের নিকটতম সদস্য, শিক্ষকের মতো অভিভাবকরা। নির্যাতনের শিকার নারীর বয়সও কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ৪ বছরের শিশু ও ৮০ বছরের বৃদ্ধা সবাই নারী হওয়ার কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৯ সময়কালে ৩ হাজার ৪৪৩টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণ ১ হাজার ৪১টি, গণধর্ষণ ১৭৮টি, যৌন নিপীড়ন ১৪০টি, হত্যা ৪১৭টি, ধর্ষণের চেষ্টা ১৯৫টি। তা ছাড়া অন্যান্য আরো ৩১ ধরনের নির্যাতনের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

তথ্যে দেখা যায় ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টার সংখ্যা বেশি। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসী নারী শ্রমিকরা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসছেন। দেশে-বিদেশে নারী নির্যাতনের এই চিত্র বিশেষ উদ্বেগের সৃষ্টি করে। বর্তমানে বাংলাদেশে নারীর অর্জন, অগ্রগতি ও সম্ভাবনার যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, সহিংসতার চিত্র তা ম্লান করে দিচ্ছে।

সামাজিক বিকাশে নারীর অবস্থানের এক চরম বৈপরিত্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। একদিকে নারীর অগ্রসরমানতা, অন্যদিকে নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়াবহতা। ব্যক্তিজীবনে নারীর অধিকারের ক্ষেত্রগুলো এখনো বৈষম্যপূর্ণ। বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত নয়। সিডও সনদে ব্যক্তি অধিকারের ২ নং ও ১৬ (১) (গ) ধারা এখনো সংরক্ষিত। জনজীবনে ও ব্যক্তিজীবনে নারীর প্রতি এই বৈষম্য ক্ষমতার কাঠামোয় নারীকে অধস্তন করে রাখছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক মানদণ্ড উন্নয়নে নারীর দৃশ্যমান সক্রিয় অংশগ্রহণ নারীর অবস্থানের সামাজিক সূচকে পরিবর্তন আনছে না। নারীর প্রতি সহিংসতাকে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় দেখতে হবে। এই সমস্যার মূল কারণ নারীর প্রতি সমাজের অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি ও ক্ষমতার কাঠামোয় নারীর অধস্তন অবস্থান।

নারীর ক্ষমতায়নের সংস্কৃতি সমাজ মানস সার্বিকভাবে গ্রহণ করতে না পারা, যা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই রয়েছে। এবারের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষের স্লোগান হচ্ছে, ‘ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ- আসুন এ অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই’। নারী ও কন্যা নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্মূলের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমন্বিত বহুমুখী কার্যক্রম। বৈষম্যহীন সংবেদনশীল আইন অপরিহার্য, যা হবে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

নারী ও কন্যা নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার আইনে সাজা প্রদান, জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষানীতি ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিক সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে জেন্ডার ও মানবাধিকার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, পুরুষ ও যুবসমাজেকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কাজে যুক্ত করা। নারী নির্যাতন, প্রতিরোধ ও নির্মূলের আন্দোলন হচ্ছে নারী-পুরুষের সমতার সংগ্রাম। এই সংগ্রাম হচ্ছে সমাজের প্রচলিত রীতি, আচার, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি তথা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে নারী-পুরুষের সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। যেখানে সরকার, নারী আন্দোলন ও সামাজিক আন্দোলনকে সক্রিয় এবং সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে।