রাজনীতি হোক দেশপ্রেমিক তরুণদের আশ্রয়স্থল

আগের সংবাদ

জলবায়ু প্রভাবে তীব্রতর হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার দাবানল

পরের সংবাদ

রাষ্ট্রের স্বভাব ও চরিত্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৭, ২০১৯ , ১০:২০ অপরাহ্ণ

আসলে যা প্রয়োজন তা কেবল আইনের শাসন নয়, ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচারের জন্য রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের ক্ষমতা কমানো চাই; সেই সঙ্গে আবশ্যক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। সর্বোপরি চাই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা। অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ হচ্ছে জবাবদিহিতার অভাব। অপরাধ করলে শাস্তি হবে না, এই জ্ঞান নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত উপকারী।

কথা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। ভিন্ন হওয়ার জন্য তাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র খুব যে ভিন্ন হয়েছে এমন বলা যাবে না। যেমন ধরা যাক সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যাপারটা। আশা ছিল ওই জিনিস স্বাধীন বাংলাদেশে আর দেখতে হবে না। কিন্তু সেনা অভ্যুত্থান বিলক্ষণ দেখা দিয়েছে। ভয়ংকরভাবেই এবং একবার নয়, কয়েকবার। আশা ছিল বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর আকারটা হবে সীমিত। সে আশা পূরণ হয়নি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তো একটানা নয় বছরই শাসন করে গেলেন। এবং শাসনের ওই জের ধরে আমৃত্যু রাজনীতিতে বেশ ভালোভাবেই টিকে ছিলেন। সেনাবাহিনীর আকার এবং তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা ক্রমাগত বেড়েছে। এখনো বাড়ছে।
রাষ্ট্রের যে আমলাতান্ত্রিক চরিত্র সেটাকে রক্ষার জন্যই এমনটা ঘটছে। একই সঙ্গে এবং একই কারণে পুলিশের ক্ষমতাও অব্যাহত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনগণের টাকাতেই জনগণকে দমন ও ক্ষমতাকে পাহারাদানের জন্যই এই ব্যবস্থা। পাকিস্তানে ব্রিটিশের তৈরি ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনের অধিকাংশই বহাল ছিল। ওই সব আইন ব্রিটিশরা যদৃচ্ছা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করত, নিজেদের স্বার্থে, পাকিস্তানেও তারা প্রযুক্ত হয়েছে শাসকদের স্বার্থেই। বাংলাদেশে সেসব আইনকানুন পরিত্যক্ত হয়নি উল্টো তাদের প্রয়োগ আরো কঠোর হয়েছে।
দেখা গেছে যে, সরকারগুলো জনসমর্থনের ওপর ভরসা করতে ব্যর্থ হয়ে আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন বাহিনীর ওপর ভর করেছে এবং মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে বিরোধী পক্ষের বুকে ভীতির সঞ্চারে তৎপর থেকেছে। আইনকানুনের সংখ্যাও বেড়েছে। আইনমন্ত্রী ১ হাজার ২৮টি চালু বিধির কথা বলেছেন, যা ধারণ করতে ৪২ খণ্ড বই প্রয়োজন হয়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন যে ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ। আইন ও বিধি অনেক, কিন্তু বিচারের গতি গজেন্দ্রগামী। অথচ প্রত্যেকটি মামলার পেছনেই তো ভুক্তভোগী ও বঞ্চিতদের প্রত্যাশা রয়েছে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির। আর কত মানুষ যে মামলা করেনি, সামর্থ্য নেই, সাহস নেই মামলা করার, তার তো হিসাবই করা যাবে না।
ব্রিটিশ শাসকরা পুলিশের জন্য আইন চালু করেছিল ১৮৬১ সালে; সে আইনই রয়ে গেছে। তবে প্রকৃতিতে তার আরো কঠোর এবং প্রয়োগে আরো নিষ্ঠুর হয়েছে। রিমান্ড আগেও ছিল, কিন্তু সে বস্তুকে যেভাবে ও যে পরিমাণে এখন কাজে লাগানো হচ্ছে, পুলিশ যেভাবে চাইছে সেভাবে রিমান্ডে নিয়ে যাচ্ছে ও পীড়ন করছে এমনটা পরাধীনতার যুগেও দেখা যায়নি। পুলিশ সম্পর্কে ধারণা ছিল যে ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসে, এখন কেবল বেঁধে নয়, পেটাতে পেটাতে আনে। নির্যাতনে দক্ষতা দেখাতে পারলে চাকরিতে উন্নতি ঘটে, ঘুষ পাওয়াও সম্ভব হয়। পুলিশের ছোঁয়া তাই অন্য বহু ছোঁয়ার তুলনাতেই ভয়ংকর। কারাগারের জন্য জেল কোড তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ সালে, সেই কোড এখন যদি মানা হতো তাহলে কারাবন্দিরা বরং খুশিই হতো। তাদের জন্য খুশি হওয়ার কোনো কারণ ও সুযোগ নেই। জেলের ভেতরটা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে বলেই জানছি আমরা।
বাংলাদেশের সংবিধান যখন লেখা হয় তখন স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট দরকার পড়বে এমনটা মনে করা হয়নি; যে জন্য সংবিধানে তার কোনো বিধান ছিল না। ১৯৭৪ সালে সেই অ্যাক্ট জারি করা হলে লোকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছে অস্বস্তিতে। ১৯৯১ সালে অর্থাৎ এরশাদ শাসনের পতনের পরে ওই আইনে কিছু সংশোধন আনা হয়, ২০১৮ সালে শোনা গেল সংশোধনীর খবর পুলিশ রাখে না, যে জন্য বাতিল হয়ে যাওয়া ধারাতেও হরহামেশা মামলা দেয়া চলছে। ধারার ধার ধারাটা গৌণ, মামলা দেয়াটাই মুখ্য। র‌্যাব নামে কোনো বিশেষ বাহিনী আগে ছিল না, এখন এসেছে। বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ছিল অজানা; এখন তা নিত্য শোনা যায়। পুলিশের হেফাজতে মানুষ মারা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে প্রতারণা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত চলছে।
১৯৭২ সালের ৩ আগস্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা সংশোধন করে আদেশ জারি করা হয়েছিল যে আদালতের নির্দেশ ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না; অধুনা সন্দেহ হলেই আটক করা যাচ্ছে। রাষ্ট্র মোটেই নরম হয়নি, তার ওপর জনগণের কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি; শাসন বিভাগই ক্ষমতাধর, বিচার বিভাগ কোণঠাসা; আইন পরিষদ শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে না, শাসন বিভাগের ইচ্ছা পূরণ করে। উচ্চ আদালতের বিচারকরা কেউ কেউ ঘোষিতভাবে বিব্রত বোধ করেন, কেউ কেউ হয়তো সেটা প্রকাশ করেন না, কিন্তু অস্বস্তিতে থাকেন।
২.
বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এখন অনেক কিছুরই অভাব। খুব বড় অভাব নিরাপত্তার। মানুষ সড়কে মারা পড়ে, মেয়েরা যেখানে-সেখানে ধর্ষিত হয়। অসহায় মানুষরা কেউ কেউ আত্মহত্যা করে; অন্যরা হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে থাকে, বাস্তব অবস্থা ভোলার জন্য অনেকে মাদকে ঝোঁকে। মাদক এখন যত্রতত্র পাওয়া যাচ্ছে। খুন এখন নিত্যনৈমিত্তিক। যখন-তখন গুমও হচ্ছে লোকে। অপরাধ অত্যন্ত ব্যাপক, দুর্নীতি সর্বত্র। অপরাধতত্ত্ব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন একটি বিভাগ খোলা হয়েছে, এবং ওই বিষয়ে পাঠগ্রহণের উপযোগিতা ও আগ্রহ দুটিই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বিভাগ চালু হয়েছে। অপরাধ সব সময়েই ছিল, কিন্তু এর ব্যাপকতা, বৈচিত্র্য, গভীরতা ইত্যাদি পুঁজিবাদের বিশেষ অবদান, যে জন্য আমেরিকার অপরাধের সংখ্যা এত বেশি। সেখানে আইন ব্যবসারও ভীষণ প্রসার। আইনজীবীরা প্রস্তুত থাকে, মামলা লুফে নিতে এবং আদালতে যেতে উৎসাহ দিতে। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াতে অপরাধ আপাত-বিস্ময়কর রূপে কমে গিয়েছিল, এখন সেখানে পুঁজিবাদ এসেছে, তাই অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। থেকে থেকে দাবি ওঠে আইনের শাসনের। আসলে যা প্রয়োজন তা কেবল আইনের শাসন নয়, ন্যায়বিচার। ন্যায়বিচারের জন্য রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের ক্ষমতা কমানো চাই; সেই সঙ্গে আবশ্যক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। সর্বোপরি চাই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা। অপরাধ বৃদ্ধির বড় কারণ হচ্ছে জবাবদিহিতার অভাব। অপরাধ করলে শাস্তি হবে না, এই জ্ঞান নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত উপকারী।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে এখন সর্বক্ষেত্রে চলছে মুনাফার লোলুপতা। মুনাফাই হচ্ছে চালিকা শক্তি। মুনাফার শাসন সবকিছুকে পণ্যে পরিণত করে ফেলতে চাইছে। বিচারও কেনাবেচার অধীনে চলে গেছে। সন্দেহ নেই যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। তার মুখে মুখোশ নেই, তার মুখশ্রীটা ভয়াবহ।
মুক্তির উপায় হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা ঘটানো। সেটা সম্ভব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। সে ব্যবস্থার ব্যক্তিমালিকানার জায়গাতে প্রতিষ্ঠা ঘটবে সামাজিক মালিকানার; উৎপাদনের শক্তি অবারিত হবে এবং উৎপাদিত সম্পদে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। অভাব থাকবে না, প্রয়োজন হবে না ব্যক্তিগত সঞ্চয় গড়ে তোলার। ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, সংঘর্ষ, দেয়াল তোলাতুলি ইত্যাদির অবসান ঘটবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা বিরোধের থাকবে না, হবে মৈত্রীর। অবাধ সৃষ্টিশীলতার এবং সুস্থ বিনোদনের অবকাশ পাওয়া যাবে। তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ক্ষমতা দুটিই কমে যাবে। মানুষের অপরাধের প্রবণতা ভেতর থেকেই হ্রাস পাবে। রাষ্ট্রের তিন বাহুর কোনো বাহুই অত্যাবশ্যক থাকবে না।
বিশ্বব্যাপী এখন ওই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে। অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোনো এক দেশে প্রতিষ্ঠিত হলে স্থায়ী হয় না; অন্যসব দেশ থেকে আঘাত ও অন্তর্ঘাত আসে। সেজন্য বিশ্বব্যাপী তার প্রতিষ্ঠা চাই। কিন্তু সেটা তো এখনই ঘটছে না। ইতোমধ্যে যা প্রয়োজন তা হলো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে শাসন বিভাগের বিপরীতে বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও সাহসী অবস্থানে দাঁড় করানো দরকার। আর চাই আইন পরিষদের কাছে শাসন বিভাগের জবাবদিহিতা। এটা করতে পারলে আদালত ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি লোকের আস্থা বাড়বে। লোকে কপাল চাপড়ে আধমরা হয়ে পড়ে থাকবে না, আবার হিংস্র হয়ে আইনকে নিজের হাতে তুলেও নেবে না। আইন বিভাগ শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখলে কথিত আইনের শাসনের ব্যাপারে আশার সৃষ্টি হবে। এ কাজটিও মোটেই সহজ নয়। শাসন বিভাগ বাধা দেবে। একটা উপায় বিচার বিভাগের কার্যকারিতার পক্ষে এবং তার কর্মক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা। পাশাপাশি চাই আইন পরিষদকে কার্যকর করা।
এ ক্ষেত্রে মিডিয়া খুব প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। মিডিয়া অবশ্য এগিয়ে আসতে চাইবে না, এর জন্যও আন্দোলন দরকার হবে। বস্তুত আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। শাসন বিভাগের জবাবদিহিতা আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ উভয়ের কাছেই হওয়ার কথা। বিচার বিভাগ আইন পরিষদে গৃহীত আইনের ব্যাখ্যা, আইনের উদ্দেশ্য, তার অপর্যাপ্ততা, আইনকে ন্যায়বিচারমুখী করা- এসব কাজে দায়িত্ব পালন করবে। করাটা প্রত্যাশিতও।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।