সাজঘরে ফিরলেন সাদমান-ইমরুল

আগের সংবাদ

আজ ভূরুঙ্গামারী পাক হানাদার মুক্ত দিবস

পরের সংবাদ

প্রত্যেকের ফাঁসি চায় পরিবার

কাগজ প্রতিবেদক :

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৪, ২০১৯ , ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ফাঁসি চায় তার পরিবার। গতকাল বুধবার এ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পর এ দাবি জানিয়েছেন আবরারের মা রোকেয়া খাতুন। আর চার্জশিটে সন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। পরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আবরার হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে। সব আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ করে আবরার হত্যা মামলার দ্রুত বিচার করা হবে।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট গতকাল বুধবার আদালতে জমা দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। চার্জশিটে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ১১ জনসহ ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আবরার ফাহাদ হত্যায় অভিযুক্ত ২৫ জনই রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে অছাত্রের মতো উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত ছিল। আবরারকে শুধু শিবির সন্দেহে হত্যা করা হয়েছে তা নয়, আসামিরা এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল বলে ডিবি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
এদিকে চার্জশিট দাখিলের পর প্রতিক্রিয়ায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, চার্জশিটে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা চাই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আবরার হত্যার বিচার হোক। আবরারের বাবার দাবির পরই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, মামলা বিচারিক আদালতে আসার পরই যেন কার্যক্রম শুরু করা যায় এ জন্য দ্রুত একটা প্রসিকিউশন টিম ঠিক করে রাখা হয়েছে।
এদিকে আবরারের মা রোকেয়া খাতুন অভিযুক্ত প্রত্যেকের ফাঁসি দাবি করেছেন। ছেলে হত্যার মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার খবর দেখতে ছোট ছেলেকে নিয়ে টিভির সামনে বসে ছিলেন তিনি। এ সময় দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়েছে তার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, আবরার হত্যা মামলায় নির্ভুল চার্জশিট দেয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চার্জশিট প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেছেন, তদন্তে জেনেছি আবরার হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ১১ জন। বাকি ১৪ জন হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিল। এ মামলায় এজাহারভুক্ত ১৯ জন এবং এর বাইরে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আরো ৬ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুল ইসলাম, শামীম বিল্লাহ, মোয়াজ আবু হুরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, শামসুল আরেফিন রাফাত, এস এম মাহমুদ সেতু, আজতেসামুল রাকিব তানীম, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ও মোসতবা রাফিদ।

হত্যার মোটিভের বিষয়ে তিনি বলেন, হত্যার মোটিভ হিসেবে একক কোনো কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না। অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ তাকে শিবির হিসেবে সন্দেহ করা। জড়িত সবাই উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত। ধারাবাহিক র‌্যাগিং ও উগ্র আচরণ করতে করতে তারা হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটায়। মূলত উচ্ছৃঙ্খলতার চরম মাত্রায় পৌঁছানোর কারণেই এ রকম একটি মর্মান্তিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
অমিত সাহা প্রসঙ্গে মনিরুল বলেন, অমিত সাহা ঘটনাস্থলে না থাকলেও ঘটনার আগে এবং ঘটনার দিন হত্যায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। ঘটনার আগেও সে আবরারকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে। এর আগে আরো একজনকে পিটিয়েছে অমিত সাহা। সেও ছিল চরম পর্যায়ের উচ্ছৃঙ্খল।
আসামিদের ভাষ্য মতে, আবরার ফাহাদ দেখা হলে বড়দের সালাম দিত না। বিভিন্ন তির্যক মন্তব্য করত। আগে থেকেই তারা নানা কারণে আবরারের ওপরে ক্ষিপ্ত ছিল। একজনকে মেরে অন্যজনকে শিক্ষা দিতে, কিংবা জুনিয়রদের মধ্যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। যার আচরণ অপছন্দ হতো তাকেই ডেকে এনে নানা নির্যাতন করত।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন রাত ১০টার পর থেকে আবরার ফাহাদকে মারধর শুরু করা হয়। ২টা ৫০ মিনিটের দিকে বুয়েটের ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটরিং করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত। তদন্তে আমরা তাদের ব্যর্থতা দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে তাদের গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নিতে পারে, এটা পুলিশের বিষয় নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৬ অক্টোবর রাত ৩টার দিকে পুলিশকে খবর দেয়া হয় শিবির সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের টহল টিম হলের বাইরে অপেক্ষা করলে পরে জানানো হয় কিছু হয়নি। ৩টার আগে পুলিশ এ বিষয়ে কিছু জানতে পারেনি।
পুলিশের স্কেচ ভিডিও : সংবাদ সম্মেলন শেষে তদন্ত দলের পক্ষ থেকে একটি স্কেচ ভিডিও দেখানো হয়। সেই ভিডিওতে তুলে ধরা হয় আবরার হত্যার নৃশংস দৃশ্য। প্রত্যক্ষদর্শী, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষীদের দেয়া তথ্যমতে ভিডিওটি তৈরি করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তদন্ত দল। ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের ভিডিটিতে প্রথমে বুয়েট ক্যাম্পাস ও শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্ব^র রুমটি দেখানো হয়েছে। হলের করিডোরে আবরারের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তার বড় ভাইকে (ছাত্রলীগের বড় ভাই) জানাচ্ছে তার এক রুমমেট। ৪ অক্টোবর আবরারের বিষয়ে হলের ক্যান্টিনে মিটিং করে অভিযুক্তরা। এর পরপরই হলের গেস্টরুমে মিটিংয়ে বসে তারা আবরার ফাহাদকে নিয়ে আলোচনা করে। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বড় ভাইয়ের নির্দেশে কয়েকজন আবরারকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ২০১১ নম্বর রুমে যেতে বলে। সে দিন আবরারকে তার ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রুমে তাকে ফ্লোরে বসিয়ে একটি পক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করে যে, ‘হলের কেউ বিতর্কিত ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা?’ আরেকপক্ষ তার ল্যাপটপ ও মোবাইল চেক করছে। এ সময় হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অমানসিক নির্যাতন করা হয়। যন্ত্রণায় মাটিতে বমি ও প্রস্রাব করে দেন আবরার। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ২০১১ থেকে ২০০৫ নম্বর রুমে নেয়া হয়। ২০০৫ নম্বর রুমে তিনি আরো অসুস্থ হলে তাকে সিঁড়ির পাশে শুইয়ে রাখা হয়। দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়ে থাকার পর বুয়েটের চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর একে একে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের চিত্র দেখায় ডিএমপি। ভিডিওর বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, আদালত সাধারণত সাক্ষ্য হিসেবে এ ধরনের ভিডিও নেন না। তবে আদালত যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা এটা জমা দেব।
প্রসঙ্গত, গত ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে তার কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ মামলার সব আসামি বর্তমানে কারাগারে আছে। তদন্তে নেমে পুলিশ এজাহারের ১৬ জনসহ মোট ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।