চার কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা

আগের সংবাদ

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন আজ

পরের সংবাদ

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্পের টাকা নয়ছয়

অনুমতিহীন ব্যাংক হিসাবে অবৈধ অর্থ ছাড়

মরিয়ম সেঁজুতি :

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৩, ২০১৯ , ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অনুমতি না নিয়ে সরকারি খাতের জনতা ব্যাংকে বিশেষ ধরনের হিসাব খুলেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। আবার ওই হিসাব থেকে নিয়ম বহিভর্‚তভাবে অর্থ ছাড় করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বিশেষ হিসাব থেকে পাওয়া সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান থাকলেও তা জমা দেয়া হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জনতা ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তাও।

সরকারি নির্দেশনা পরিপালনে অবহেলা ও শিথিলতা প্রদর্শনকারী জনতা ব্যাংকের ওপর ক্ষুব্ধ অর্থ মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ পরিদর্শন করেছেন এবং ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার ‘চিটাগং ওয়াটার সাপ্লাই ইমপ্রুভমেন্ট এন্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট’ (সিডবি্ল  উএসআইএসপি) বাস্তবায়নের কাজ করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ প্রকল্পের নামে ২০১১ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখায় কনভার্টিভাল টাকা স্পেশাল অ্যাকাউন্ট (কনটাসা) হিসাব খুলে চট্টগ্রাম ওয়াসা। যার হিসাব নম্বর ০০৪০০০৩৩৮। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুরোধে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে হিসাবটি পরিচালনার পাশাপাশি অর্থ ছাড়ের অনুমোদন করে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়।

আইন অনুযায়ী এ ধরনের হিসাব খোলার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু জনতা ব্যাংক এ ধরনের কোনো অনুমতি নেয়নি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবটি পরিচালনার পাশাপাশি অর্থ বিভাগের অনুমতি ছাড়াই অর্থ ছাড় করে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখা। গত ৭ বছরে অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে সুদ বাবদ আদায় করা হয় ১১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান থাকলেও তা মানেনি জনতা ব্যাংক। এর আগে ২০১২ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস থেকে একটি চিঠি দেয়া হয় বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখাকে। ওই চিঠিতে সুদ বাবদ অর্থ সরকারি কোন কোডে জমা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জবাব দিতে ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

এক মাস পর ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্টস অফিস থেকেও এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো জবাব দেয়নি জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রামের বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখা। এ বিষয়ে জানতে জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রামের বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখায় যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে এমন কাজে ক্ষিপ্ত হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক দুই সদস্য বিষয়ক একটি তদন্ত টিম নিয়োগ দেয়। বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এ ঘটনার সত্যতা পেয়েছে তদন্ত টিম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা না দেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা সম্পূর্ণ অর্থই পরিশোধ করেছেন বলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ সম্পর্কে জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রামের বৈদেশিক বিনিময় করপোরেট শাখায় যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখার একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বললে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ইঞ্জিনিয়ার মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। যেহেতু বিশ^ব্যাংকের প্রকল্প, তাই বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানোর বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। প্রতি অর্থবছরে এডিবিতে আমাদের জন্য একটি বরাদ্দ রাখা হয়। এডিবি থেকে বরাদ্দ নিয়ে কাজ করেছি। প্রথম কয়েক বছর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অথরাইজেশন নেয়া হয়নি। কিন্তু ঢাকা ওয়াসার একটি প্রকল্পে যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, এর পর ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকেই আমরা এ বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়েই কাজ করছি। বিশেষ হিসেবে অর্জিত সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ার যে অভিযোগ সে সম্পর্কে আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের সঙ্গে বিশ^ ব্যাংকের চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের ঋণের টাকার সুদ ও আসল চট্টগ্রাম ওয়াসাকেই পরিশোধ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এ টাকা দিতে হবে না। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে বলা হয়েছে, অর্জিত সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে অভিযুক্ত ১১ কোটি ১৭ লাখ টাকার পুরোটাই পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জানা গেছে, আলোচ্য প্রকল্পের হিসাব খোলা, প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত অর্থ বিভাগের বাজেট অথরাইজেশন ব্যতীত প্রকল্পের বিশেষ হিসাব থেকে অর্থ ছাড় করায় যে সব কর্মকর্তা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুক‚লে ১০ লাখ টাকার বাজেট অথরাইজেশন জারি করা হলেও বাজেটের অতিরিক্ত আরো ৫ লাখ টাকা অর্থ ছাড় করা হয়েছে। এসব কাজে জনতা ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে যারা অভিযুক্ত রয়েছেন, তারা হলেন- মো. হুমায়ন কবির চৌধুরী (বর্তমানে কর্মরত), মো. নাজিম উদ্দিন কোরেশী (বর্তমানে পিআরএল এ আছেন), মো. সরওয়ার কামাল (কর্মরত) ও মো. জাকারিয়া। প্রকল্পের নামে বিশেষ হিসাব খোলার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তরা হলেন- অনুমোদনকারী কর্মকর্তা হিসেবে উপমহাব্যবস্থাপক মো. হুমায়ন কবির চৌধুরী, হিসাব খোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সিনিয়র অফিসার তমাল চক্রবর্তী (বর্তমানে কর্মরত) ও এক্সিকিউটিভ অফিসার মোস্তফা নুর হায়দার (কর্মরত), কার্যোত্তর অনুমোদনপত্রে স্বাক্ষরদানকারী প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেন।

এ ছাড়া বিল প্রদান সংক্রান্ত কাজে জড়িত থাকার জন্য যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- বিল উপস্থাপনকারী অফিসার ফারহানা জান্নাত, ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বরত প্রিন্সিপাল অফিসার পলাশ দাস ও বিভুল কুমার (পিআরএল এ আছেন) এবং সহকারী মহাব্যবস্থাপক নিজাম আফতাব চৌধুরী।