ঝিনাইগাতীতে কোটি টাকার সেতু কাজে আসছে না পথচারীদের

আগের সংবাদ

ছাত্রদের শিকলে বেঁধে রাখা সেই সুপারকে বহিষ্কার

পরের সংবাদ

প্রত্যেকটা ছবিতে নিজেকে মনে হয় নতুন পরিচালক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০১৯ , ১:১১ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০১৯ , ১:১৩ অপরাহ্ণ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস থেকে সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আবারো সেই উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’ থেকে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র। এবার সিনেমাটি নির্মাণ করছেন অভিনেত্রী ও পরিচালক অপর্ণা সেন। নাম দিয়েছেন ‘ঘরে বাইরে আজ’। নতুন কাজ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন ভারতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে। তারই চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো মেলার পাঠকদের জন্য

রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, এরপর ‘ঘরে বাইরে আজ’। এটা কি বলা যায় যে পরম্পরার সূত্র গাথা রইল?
রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যজিৎ রায়, দুজনকেই আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকার সূত্রে। আমাদের রক্তস্রোতে তারা মিশে আছেন। তাদের জন্য প্রগাঢ় ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাও আছে আমাদের, তাই আমার মনে হয় তাদের নিয়ে সমালোচনার অধিকারও আমাদের আছে। এখানে যদিও সমালোচনার কোনো বিষয় নেই। ছবি তৈরি করতে গিয়ে একটাই শুধু মনে হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে আর মানিক কাকার ‘ঘরে বাইরে’ দুক্ষেত্রেই সন্দীপের প্রতি ঠিক বিচার হয়নি। বড্ড একপেশে বিচার হয়েছে। হতে পারে সন্দীপ সুযোগ সন্ধানী। কিন্তু তার সবটাই খারাপ নয়। এটা আগে বলিনি কখনো। কিন্তু ছবিটা বানাতে গিয়ে এই অনুভব হলো! সে একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। সুন্দর দেখতে। ক্ষুরধার বুদ্ধি তার!

এই গুণগুলো কি রবীন্দ্রনাথে নেই?
আছে। সুন্দর দেখতে। বুদ্ধি। এগুলো আছে। তাহলেও আমার মনে হয়েছে, সে অতিরিক্ত পরিমাণে স্বার্থান্বেষী। সুবিধাবাদী। আমার এখানে তা নয়। এরকম করে দেখাইনি আমি। তার সত্যিকারের সমাজসেবার মধ্যে রাজনৈতিক মনোভাব নিহিত আছে। সে বলে, আমাদের দেশের মানুষকে যদি আমরা তাদের সমস্ত দুর্বলতা, সংস্কার-কুসংস্কার নিয়ে গ্রহণ করতে না পারি তাহলে শাসন করব কী করে? তখন নিখিলেশ তাকে বলে, তুই কি গোরা হতে চাইছিস? গোরার প্রসঙ্গ এভাবেই আমার ছবিতে আসে। সন্দীপের মধ্যে সৎ-অসতের মিশেল আছে। নিখিলেশের চেয়েও সে অনেক জটিল।

আপনার বিমলা দলিত মেয়ে। সেটা কি সচেতনভাবে করা?
হ্যাঁ, সচেতনভাবেই। আমার বিমলা বিধবা হলো কি হলো না সেটা এখানে বড় কথা নয়। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে যখন বিমলা বদলে গেল… সাদা থান পরে দেখা দিল তখন প্রশ্ন উঠেছিল বিমলাকে কি সত্যজিৎ সন্দীপের সঙ্গে প্রেমের জন্য শাস্তি দিলেন? এ প্রশ্ন আমার ছিল না। আর আজ তিনি নেই। থাকলে প্রশ্ন করতাম গিয়ে। এখন আমার সেই বিচার করার অধিকারও নেই। আমি বিমলাকে বদলেছি। তবে শেষটা বলব না। আমার ছবিতে বিমলা নিষ্ক্রিয় নয়।

শুনেছিলাম আপনার বিমলা করার কথা ছিল?
১৯৭৬-এ আমি আর মানিক কাকা দিল্লিতে। তখন বলেছিলেন তোকে আমি বিমলাটা করাব। আমি তো খুব খুশি। তারপর বেশ কিছু সময় গেল। পরে একবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও মানিক কাকা, তুমি কি করবে ‘ঘরে বাইরে’? বললেন, ‘তুই বুড়ি বিধবা পিসিমার মতো চুল কেটেছিস। বিমলা কী করে হবে? তারও কিছুদিন পর আমি ফ্যামিলি প্ল্যানিং করছি, মানে কঙ্কনার আসার সময়। ওকে আবার বললাম সে কথা। তখন উনি বলেছিলেন, এখন ‘ঘরে বাইরে’ করায় কিছু সমস্যা আছে। আমায় বললেন, ‘তুই এখন বাচ্চা-টাচ্চা করে নে… ঠিক এইরকম ভাবে। তারপর উনি ‘ঘরে বাইরে’ করেছিলেন। আমায় নেননি। কেন? সেটা কখনো জিজ্ঞেস করিনি। অভিমান হয়েছিল।

কিন্তু আপনি এই প্লটটাই কেন নিলেন?
কিছু কিছু ছবি করার ভাবনা আমার স্বপ্নেও এসেছে। গৌরী লঙ্কেশ, সুজাত বুখারির মৃত্যু আমায় খুব অসহায় করে দিয়েছিল। নাড়া খেয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম হয়নি সে রাতে যে দিন গৌরী লঙ্কেশ হত্যা হয়। স্বপ্ন দেখলাম, একজন নতুন ফিল্মমেকার, সে সত্যজিৎ রায়ের ছবির ভক্ত। সে প্রথম ছবি বানাচ্ছে ‘ঘরে বাইরে’, কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে। মনে হলো এই পরিচালক কে? এ তো আমি! আমি ধরতক্তা মার পেরেক ছবি করতে পারি না। বছরে চারটে ছবি করব! এরকম হয় না আমার। বরং আমার প্রত্যেকটা ছবিতে নিজেকে মনে হয়, আমি নতুন পরিচালক।

প্রথমে কি চিত্রনাট্য অন্যরকম ভেবেছিলেন?
প্রথমে ফিল্ম উইদিন ফিল্ম, এরকমটা ভেবেছিলাম। কোকোও বলল, শ্রীকান্তও বলল, আপনি আজকের পরিপ্রেক্ষিতে সোজা গল্পটা বলুন। নিখিলেশ এবং সন্দীপের ছোটবেলা থেকে শুরু গল্প। ত্রিকোণ প্রেমের ওপর রাজনীতি কেমন করে প্রভাব ফেলছে সেটা দেখিয়েছি।

চরিত্র নির্বাচনে রদবদল হয়েছে?
যাকে প্রথমে নিখিলেশ ভেবেছিলাম তাকে ওই ছোটবেলায় দেখলাম মানাবে না। তাই অনির্বাণ। অনির্বাণ বলেছিল, আমি কী করে করব? ওর অভিনয় ক্ষমতার ওপর আমার গভীর আস্থা ছিল। কল্যাণ ওকে পাইপ খাওয়া শেখাল। ও সঙ্গে সঙ্গে পাইপ কিনল। পাইপ ধরা, ক্লিন করা সবটা শিখে ফেলল। মেদিনীপুরের ছেলে যেভাবে ইংরেজি বলল আমি অবাক হয়ে গেছি। আর সন্দীপের ভ‚মিকায় যিশু তো পঞ্চাশ শতাংশ তৈরি। সন্দীপের ওই ফ্ল্যামবয়েন্স ওর মধ্যেই আছে। ও নিজেও খুব খুশি এই চরিত্র করে। আমার মনে আছে, এক সময় ‘আরশিনগর’-এ যখন যিশুকে নিয়েছিলাম তখন প্রবল আপত্তি উঠেছিল। তারপর কোথায় চলে গেল ও। এখন আবার সবাই বলল যিশুকেই নাও।

এই ছবিতে যৌনতার জায়গা…
সত্যজিৎ রায় ১৯০৪-এর প্রেক্ষাপটে চুম্বনের দৃশ্য দেখিয়েছিলেন। তখন ওটাই সম্ভব ছিল। আর ২০১৯-এরগল্প প্রেম আর যৌনতা ছাড়া অবিশ্বাস্য।

বদলের এই ইন্ডাস্ট্রিতে অপর্ণা সেন কেমন করে আছেন?
বদলের ক্ষেত্রে মনে হয়, দর্শকের রুচি নিম্ন হয়েছে। তবে সবার নয়। টেলিভিশনের ধারাবাহিক তার জন্য দায়ী। রোজ ভাজাভুজি দিলে আপনি রোজ ভাজাই খাবেন। পুষ্টিকর খাবার খাবেন কেন? আমার মনে হয় একটা ডেলি সোপ আমিও করি। দেখি না… আমি করব না। কারণ, যা করতে বলা হবে আমি করব না। আর এই টিআরপির বিষয়টাও আমি বুঝি না। আমি কাউকে চিনি না যার বাড়িতে বাক্স দেয়া আছে। মধ্যবিত্ত বাড়িতে কেমন সব গয়না পরে শুতে যাচ্ছে! কি জানি! আগে ‘রজনি’, ‘নুক্কর’,‘ ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ও হয়েছে তো। তবে এটাও ঠিক, এই ধারাবাহিকের মাধ্যমেই প্রচুর মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।

আর বাংলা ইন্ডাস্ট্রি?
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর কথা ছেড়ে দিলাম। এখন হি ইজ দ্য বেস্ট! খুব কষ্ট করে ছবি করছেন এখন। উনি সিনেমার কবি। ওর কথা ছেড়েই দিলাম। ‘উড়োজাহাজ’ দেখার খুব ইচ্ছে আছে আমার। এখনো দেখা হয়নি। তবে এখানকার দর্শক ওর ছবি কম দেখলেও বিদেশে উনি দর্শক পেয়ে গিয়েছেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নগরকীর্তন’, ‘সিনেমাওয়ালা’ খুব ভালো লেগেছে। আদিত্য বিক্রম ভালো কাজ করে। প্রতীমের ‘মাছের ঝোল’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ভালো লেগেছিল। নতুন পরিচালকরাও এসেছে এখন। তবে ‘নগরকীর্তন’ চলায় মনে হয়েছে, মানুষ ভালো কিছু খোঁজে, দেখে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়