এগিয়ে নিতে হবে স্কুল ব্যাংকিং

আগের সংবাদ

জিয়াউর রহমান কেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি নির্দয় হলেন?

পরের সংবাদ

ইলিয়াস কাঞ্চন ও একদল ছাত্রের অবদান

মজিবর রহমান

কলাম লেখক

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ৮, ২০১৯ , ৯:১১ অপরাহ্ণ

আমাদের সমাজের সর্বত্র একটা কথা চালু আছে, বলা হয়- দেশে আইনকানুন যথেষ্ট পরিমাণ আছে, কিন্তু তার যথার্থ প্রয়োগ নেই। আবার অপপ্রয়োগেরও কমতি নেই। এ দুর্বলতার কথা অস্বীকার করার জো নেই। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ক্ষেত্রে যেন এমনটি না ঘটে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে সর্বাগ্রে। পরিবহন খাত অরাজকতার চরমে পৌঁছেছে, এর অবসান না হলে মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সমাজে।

বাংলা সিনেমার গৌরবোজ্জ্বল সময়ের শেষদিককার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। কবি-কথা শিল্পী আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ অবলম্বনে ‘বসুন্ধরা’ নামের যে চলচ্চিত্রটি খ্যাতনামা পরিচালক সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেছিলেন তার নায়ক ছিলেন এই ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৭৭ সালে তৈরি সে ছবিটি ছিল তার প্রথম অভিনীত ছবি। ১৯৯৩ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি তার স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারান। বেদনা বুকে চেপে অন্য দশজনের মতো ঘরে বসে থাকেননি, গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের আন্দোলন। সেটি ১৯৯৩ সালের ঘটনা। বেশিরভাগ মানুষই ভাবেননি যে এ আন্দোলন দীর্ঘায়িত হবে; ভেবেছিলেন যে এটি তাৎক্ষণিক আবেগের ব্যাপার, আবেগ স্তিমিত হবে শিগগির, তখন আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়বে। না, সে রকমটি হয়নি; হাল ছাড়েননি তিনি। আরো অনেক মানুষকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন টেনে নিয়ে যেতে থাকেন দীর্ঘ সময় ধরে। সমাজসেবায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০১৭ সালে ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
রুপালি পর্দার মানুষজন; বিশেষত সিনেমার নায়ক-নায়িকারা এ ধরনের ঝক্কিবহুল কাজে সাধারণত আসেন না। সামাজিক কাজকর্মেও তেমন জড়ান না। হয়তো পেশাগত কারণে এ ব্যাপারে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। ইলিয়াস কাঞ্চন এসবের তোয়াক্কা করেননি। বরং সিনেমার নায়ক হিসেবে সৃষ্ট ইমেজকে কাজে লাগিয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর মতো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে নন্দিত হয়েছেন। তার দেখানো পথে অন্য আরো দু-চারজন এগিয়ে এলে সমাজ উপকৃত হবে।
সবাই হয়তো অবহিত যে আমাদের পরিবহন সেক্টর প্রতাপশালী কিছু মানুষের কবজায়। এটি এমন এক সেক্টর যেখানে মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষ স্বার্থের প্রশ্নে একাকার। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির আখড়া হিসেবে পরিচিত পুরো খাত। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের তথ্যমতে পুলিশও এই স্বার্থের নিগড়ে বন্দি। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের জন্য প্রাধান্য ছিল রেল ব্যবস্থার। জলপথও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উভয় ব্যবস্থাই খুব সাশ্রয়ী ছিল। দিন যত গেছে বিস্ময়কর রকম উত্থান ঘটেছে স্থল বা সড়ক পথের। রেল ও জলপথকে অবহেলা না করে যদি সেটি হতো কথা ছিল না। দুঃখজনকভাবে তা হয়নি। রেল ও জলপথকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়ে সড়কের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়ছে। ভাবনার বিষয় হলো সড়কের এই উত্থানের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে উত্থান ঘটেছে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির। এর সঙ্গে যুক্ত চক্রটি বরাবরই ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে খাতটির ওপর আধিপত্য বজায় রাখছিল। সড়কের শৃঙ্খলার কথা বলা মানে শক্তিশালী ওই চক্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে বলা, যা খুব সাহসিকতার কাজ। ইলিয়াস কাঞ্চন এই সাহসী কাজটিই করে আসছিলেন একটানা ২৬ বছর ধরে। অবশেষে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো দেখতে পাচ্ছেন। অনেক বাধাবিপত্তির পর ৭৯ বছরের পুরনো মোটরযান অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর হয়েছে ১ নভেম্বর থেকে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার।
তবে কাজটি সম্ভব করার ব্যাপারে একদল ছাত্রের ভূমিকা প্রবল। এরা সেই ছাত্রসমাজের উত্তরাধিকার যারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অনুঘটকের ভূমিকায় ছিলেন, যারা সম্ভব করে তুলেছিলেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুুদ্ধে যাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, যারা সংঘটক ছিলেন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের। এই ছাত্ররা তাদের বংশবদ নয় যারা সহপাঠীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে, যারা চ্যাংদোলা করে নিজের কলেজের অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দেয়- পড়াশোনার বদলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি যাদের প্রাত্যহিকতার অংশ।
ঘটনাটি ২০১৮ সালের ২৯ জুলাইয়ের। এদিন রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে এক বাস চালকের বেপরোয়া আচরণের শিকার হয়ে দুই শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা মাঠে নামে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কী রকম ভয়ঙ্কর অরাজকতা বিরাজমান আমাদের পরিবহন খাতে! তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আইনটি সংশোধনের জন্য নানারকম তৎপরতা শুরু করে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে ওই আইন কার্যকরের ঘোষণা দেয়।

দুই.
নতুন আইন কার্যকর হওয়াতেই যে সমস্যা সব চুকে গেল তা নয় মোটেও। বলা চলে একটা ভিত্তি তৈরি হলো পরিবর্তনের। একে নিয়ে সামনে এগোনোর পালা এখন। ইলিয়াস কাঞ্চনরা যেমন চেয়েছিলেন তেমন হয়নি, আবার মালিক-শ্রমিকরা যা চেয়েছেন তা-ও নয়; বলা চলে একটা ভারসাম্য রক্ষা করে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তারপরও প্রয়োগের বেলায় এর নানা সীমাবদ্ধতা দৃষ্টিতে আসবে, প্রতিবিধানেরও চেষ্টা হবে নিশ্চয়ই। বেশিরভাগ ধারাতেই সর্বোচ্চ শাস্তির কথা আছে, সর্বনিম্নের উল্লেখ নেই। একটি বাসের বেলায় যে রকম শাস্তি হবে সে রকম শাস্তি নিশ্চয়ই কার কিংবা ছোট গাড়ি বা বাইকের ক্ষেত্রে হবে না। এ জন্যই বিধিমালার কথা বলা হচ্ছে, সেটি হবেও হয়তো। সমস্যা এ জায়গায় নয়, অন্যত্র। প্রয়োগের সমস্যাই বড় হয়ে দেখা দেবে, অপপ্রয়োগের আশঙ্কাও কম নয়।
আমাদের সমাজের সর্বত্র একটা কথা চালু আছে, বলা হয়- দেশে আইনকানুন যথেষ্ট পরিমাণ আছে, কিন্তু তার যথার্থ প্রয়োগ নেই। আবার অপপ্রয়োগেরও কমতি নেই। এ দুর্বলতার কথা অস্বীকার করার জো নেই। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ক্ষেত্রে যেন এমনটি না ঘটে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে সর্বাগ্রে। পরিবহন খাত অরাজকতার চরমে পৌঁছেছে, এর অবসান না হলে মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সমাজে। ভাবা কী যায় যে দিনের পর দিন রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্স ছাড়া কিংবা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে গাড়ির ড্রাইভার? খোদ রাজধানীতে টেম্পো চালাচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, লাইসেন্সের প্রশ্ন তো অবান্তরই। রুট পারমিট ছাড়া, লাইসেন্স ছাড়া বাস চলাচলের খবর হরহামেশাই খবরের শিরোনাম হচ্ছে গণমাধ্যমে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে সিট প্ল্যান পরিবর্তন করে সিট সংখ্যা বাড়িয়ে লাভের মাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ইচ্ছেমতো। যখন যেখানে খুশি দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে পেছনের যানবাহন আটকে রাস্তা বন্ধ করে, যানজট ঘটিয়ে। অবৈধ অভারটেক প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। এ রকম অনিয়মের উদাহরণ অসংখ্য। এর প্রতিকারে কালবিলম্ব অনুচিত।
প্রণীত আইনটি যদি নির্মোহভাবে প্রয়োগ করা যায় তো পরিস্থিতি পাল্টাবে। স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন মহল থেকে বাধা আসবে। সে বাধা ডিঙানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। দেশ, দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকলে অসম্ভব না কোনো কিছুই। তবে মানুষকে পাশে পেতে হবে সর্বাবস্থায়। তাদের বোঝাতে হবে এর উদ্দেশ্য, আইনের জনহিতকর দিক। পথচারীদের জন্যও এ আইনে শাস্তির বিধান আছে- সেটিও অবহিত করতে হবে। একটি অভিযোগ উঠেছে যে, কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে কৌশলগত কারণে এ রকমটি করা হয়েছে। সে জন্যই ক’দিন সময় নিয়ে বুঝেশুনে বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। সেটিই ঠিক। বিরোধিতাকারীরা ওঁৎ পেতে আছে। প্রয়োগে অন্যায্যতা দেখলে বা অপপ্রয়োগ ঘটলে তৎক্ষণাৎ মাঠে নামতে ভুল করবে না তারা।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।