সাময়িকী

আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে লিটন-নাইম জুটি

আগের সংবাদ

ভুয়া স্থপতিকে পুলিশে দিল রাজউক

পরের সংবাদ

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কবিতা

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ৭, ২০১৯ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০১৯, ৮:২৮ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

দেশের অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন। ষাটের দশক থেকে শুরু করে দেশের সব প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সপ্রতিভ বিচরণ ছিল জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর। অনুবাদ করেছেন ইংরেজি সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনেক বই। লিখেছেন প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী। পাঠকপ্রিয় হয়েছে তাঁর কবিতাও। বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর পরলোকগমন করেন খ্যাতনামা এই শিক্ষাবিদ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম স্মরণে আমাদের আয়োজন…

কবিতার উপরে নানা কোণ থেকে আলো ফেলে, তবেই তার নিহিত সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করা যেতে পারে। শব্দধ্বনি আর তার বিন্যাসের সঙ্গে তার ভাববিন্যাসের বৈশিষ্ট্য মনোযোগী পাঠকের হাত ধরে নিয়ে যেতে চায় কবিতার রহস্যঘন গহনে। কবিতার ভাষাবিন্যাসে বিশেষ ছন্দ সৃষ্টি হয়ে কবিতার অন্তর্গত গতিকে ধারণ করে। সেই ছন্দস্পন্দন হৃদয়ে অনুভব করতে পারলে কবিতার স্বভাব অনুসরণ করে গভীরতর ব্যঞ্জনার অভিমুখে এগিয়ে যাওয়া যায়। আগে-পড়া কবি এবং কবিতার স্মৃতিও উপলব্ধিতে এনে দিতে পারে নতুন মাত্রার বিবেচনা আর নানান অনুষঙ্গের সহায়তা।

উল্লিখিত উপায়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কবিতা সংগ্রহের দুটি ‘অগ্রন্থিত কবিতা’ নিবিড়ভাবে পাঠের চেষ্টা করে আমার বোধে যা ধরা দিয়েছে, সেই সামান্য কিছু কথা এ লেখায় বলব।

রাত্রিজাগা রক্তচোখে
আমি তোমার দেহের সাথে মনের সাথে
এই জীবনে বারেবারেই মিশে গেলাম।
আমি তোমার দেহের থেকে মনের থেকে, এই জীবনে
বারেবারেই সরে গেলাম।
অনেক সময় কাছে থেকেও মরুভূমির
নির্জনতায় হারিয়ে গেলাম-
এখন আমার এই সুদূরে
সাত পাহাড়ের এই ওপারে
এখন আমার রাত্রিজাগা রক্তচোখে
মরূদ্যানের সবুজ মায়া।

রবীন্দ্রনাথের ‘তবু’ কবিতায় তার এমন উপলব্ধির পরিচয় পেয়েছিলাম যে, প্রেমে পাত্র-পাত্রীর নিরন্তর সঙ্গ ক্লান্তির জন্ম দেয়। আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন-
‘যদি বড়ো কাছে থাকি,
নূতন এ প্রেম যদি হয় পুরাতন,
দেখে না দেখিতে পায় যদি শ্রান্ত আঁখি,
পিছনে পড়িয়া থাকি ছায়ার মতন।’

প্রেমে তাই বিরহের অবকাশ জরুরি। দেহের সাথে মনের সাথে বারেবারে মিশে গেলেও দেহ-মন থেকে বারেবারে সরে যাওয়া বা সরে থাকাটাই বাস্তব সত্য। ক্লান্তিজনিত মনে হতেই পারে। নানাবিধ ব্যস্ততা আর নিয়ত অভ্যাসের বশেও অমনোযোগ ঘটা সম্ভব।

মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ ‘শেষ সপ্তকে’র একটি কবিতায় লিখেছিলেন-
‘স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে,
…………………………………………..
দিনের পরে দিন গেল, রাতের পর রাত,
দিলে ডালি উজাড় করে।
আড়চোখে চেয়ে
আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে;
পরদিনে মনে রইল না।’

বলে নেয়া দরকার, কোনো কবি সচেতনভাবে পদে পদে ভাবনাচিন্তা তথা পরিকল্পনা করে কবিতা রচনা করেন না। অন্তর্গত তাগিদে ভিতরে উপচিত কোনো গুঢ় চাঞ্চল্যকেই অঙ্গ দেবার চেষ্টা করেন। সে চাঞ্চল্য ছাড়ার ছন্দকে অবলম্বন করেও পদবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যে মলিনতা ধৌত করে শূন্যকে ভরে তুলতে পারে তখন।

সেই নারীর বিয়োগ ঘটে গেলে যখন পরিস্থিতি এমন হলো যে-

‘দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত,
তুমি আস না।
তখন কবির কথা-
‘এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে
দেখছি তোমার রত্নমালা,
নিয়েছি তুলে বুকে।
যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন
সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে
যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা।’

আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রেয়সীর বিয়োগ নয়, তার সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদে কবি অতীতকথা স্মরণ করেছেন-
‘অনেক সময় কাছে থেকেও মরুভূমির
নির্জনতায় হারিয়ে গেলাম-
তারপরে ‘সাত পাহাড়ের ওপারে’ বাসকালে সেই পুরাতন প্রেম ‘রাত্রিজাগা রক্তচোখে’ ‘মরূদ্যানের সবুজ মায়া’ বুলিয়ে দিচ্ছে! দশ ছত্রের স্বল্পায়তন কবিতাটি ওই একটি সংহত বোধকে সঞ্চারিত করছে পাঠক হৃদয়ে।
ক্রিয়াপদের অন্ত্যমিলকে কবিতার জন্য তেমন যোগ্য মনে করা হয় না সচরাচর। কিন্তু ‘মিশে গেলাম’ বাক্যাংশের সঙ্গে ‘সরে গেলাম’ আর ‘হারিয়ে গেলাম’ মিলের ঘোষণা একজাতীয় নয়, প্রথমটি কাছে আসার আর অন্য দুটি দূরে যাবার! ওই অমিল রয়েছে বলেই ক্রিয়াপদ ব্যবহার বিশিষ্টতা পেয়েছে। ‘রাত্রিজাগা রক্তচোখ’ আর ‘মরুভূমি’র বিপরীতে ‘মরূদ্যানের বিন্যাসও বোধকে করেছে স্নিগ্ধ। শ্যামলিমার স্পর্শ লেগে গেল যেন তৃষিত চোখে।
এবারের ‘আলোচ্য বৃষ্টি যখন’ কবিতাটির আটটি ছত্রশেষে ‘থাকে’ ক্রিয়াপদের বিন্যাস সমালোচকের বিস্ময় উদ্রেক করবে।
বৃষ্টি যখন
বৃষ্টি যখন এমন করেই ঝরতে থাকে
নরম সুরে ঝরতে থাকে
নিচু জমিন খন্দ খানা ভরতে থাকে
যখন জীবন-যাপন চাকা থমকে দাঁড়ায়
শহরের এই ব্যস্ত পাড়ায়
মনের মধ্যে অগোচরে তখন কিছু জমতে থাকে
অনেক ধুলোবালির রাশি কমতে থাকে
একটা বোবা পাখি কিছু বলতে থাকে
উদাস হাওয়া নাচিয়ে যায় সলতেটাকে
একটা শূন্য কলস আবার ভরতে থাকে-
বৃষ্টি যখন এমন করেই ঝরতে থাকে।
‘থাকে’ পদটির আগে রয়েছে অমনি আটটি অসমাপিকা ক্রিয়ার সন্নিবেশ। ঝরতে, ঝরতে, ভরতে, জমতে, কমতে, বলতে, ভরতে, ঝরতে। বৃষ্টি ঝরার কথাই মূল প্রসঙ্গ বলেই সম্ভবত ‘ঝরতে’ পদ তিনবার এসেছে। ঝরতে থাকে পদবন্ধের সঙ্গে ধ্বনিগতভাবে এক ধরনের আরও একটি অন্ত্যমিল এ কবিতায় রয়েছে- ‘সলতেটাকে’। এই নয়টি বাক্যাংশেই প্রথমে একটি বদ্ধ সিলেবলের পরে তিনটি করে মুক্ত সিলেবল পূর্বাপর ধ্বনিগত ঐক্যসুষমা তৈরি করেছে। অবশিষ্ট দুটি ছত্রশেষের মিলও লক্ষ করবার মতো- ‘থমকে দাঁড়ায়’ আর ব্যস্ত পাড়ায়। দুই পদবন্ধেই পরপর বদ্ধ সিলেবল-মুক্ত সিলেবল মুক্ত সিলেবল-বদ্ধ সিলেবল। মিলগুলো পাঠকের অজান্তেই কানকে, মনকেও খুশি করে।
আগের কবিতাটির মতো এ কবিতাতেও অসমাপিকা-সমাপিকা ক্রিয়াপদের সমাবেশ দেখা গেল। এখানে এ বিন্যাস রয়েছে এগারোটি ছত্রের ভিতরে নটি ছত্রেই।

ওই পর্যন্ত গেল ছন্দমিলের প্রসঙ্গ। ছন্দ নিয়ে আরো কথা আছে। ছড়ার ছন্দের এই কবিতাটিতে আগাগোড়া মজার একরকমের দোল রয়েছে। যেন তালে তালে মাথা নেড়ে নেড়ে পড়া যায়। কিন্তু ছন্দের তালে ভেসে গেলে ভেতরের কথায় পৌঁছানো কঠিন হবে। ‘বৃষ্টি যখন এমন করেই ঝরতে থাকে’ বলবার পরে পরে নতুন কথা ভরে দেয়া হয়। কবিতাটি এমনি করে ভরতে থাকে। প্রথমে বৃষ্টির ঝরার সঙ্গে একটি বিশেষণ যোগ হলো- নরম সুরে ঝরতে থাকে। তারপর, তাতে যা-সব হয় ভরতে থাকে, জীবনের চাকা থমকে দাঁড়ায়, আর আশ্চর্য খবর এই যে ওই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কথকের অগোচরেই মনটাকে ভরে তুলতে থাকে। ধুলাবালিগুলো ধুয়ে দেয়। এ ধুলাবালি পথঘাটের না কবিচিত্তের? বোধ করি দুই-ই। বোবাপাখিও তখন যেন কোনো বাণী উচ্চারণ করে। পাখিটি কি বনের, না মনেরই? আর উদাস হাওয়া যে সলতেটিকে চঞ্চল করে, সে কি মনেরই দীপশিখা? কারণ সবশেষের বার্তাটি এই যে, সবকিছু মিলিয়ে একটি শূন্য কলস ভরে উঠতে থাকে … ভরে উঠতে থাকে। কলসটি একসময়ে হয়তো ভরাই ছিল, কখনো এক সময়ে শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির ধীর সিঞ্চনে ধূলিমলিনতা যেমন ধুয়ে যায়, তেমনি শূন্য পাত্রটি ভরে উঠতে থাকে সুধীরে। আশ্চর্য এক শুশ্রƒষার খবর পাই ওই ধীর শান্ত বর্ষণে।

বলে নেয়া দরকার, কোনো কবি সচেতনভাবে পদে পদে ভাবনাচিন্তা তথা পরিকল্পনা করে কবিতা রচনা করেন না। অন্তর্গত তাগিদে ভিতরে উপচিত কোনো গূঢ় চাঞ্চল্যকেই অঙ্গ দেবার চেষ্টা করেন। সে চাঞ্চল্য ছাড়ার ছন্দকে অবলম্বন করেও পদবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যে মলিনতা ধৌত করে শূন্যকে ভরে তুলতে পারে তখন।

মারিতা বলেছিলেন, কবিচিত্তে কোনো আলোড়ন শুরু হলে কবি সেই বিলোড়নের গতি তথা ছন্দটিকে ধরতে চান তাঁর শিল্পসৃষ্টিতে। সেই স্পন্দটি যথার্থ ছন্দ খুঁজে পেলে তার রূপারোপ সার্থকতা পায়। একভাবেই সব কবিতা জন্ম নেয় না হয়তো, তবু প্রারম্ভিক ছন্দগতিটি বাস্তবিক গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিয়াপদের অন্ত্যমিলকে কবিতার জন্য তেমন যোগ্য মনে করা হয় না সচরাচর। কিন্তু ‘মিশে গেলাম’ বাক্যাংশের সঙ্গে ‘সরে গেলাম’ আর ‘হারিয়ে গেলাম’ মিলের ঘোষণা একজাতীয় নয়, প্রথমটি কাছে আসার আর অন্য দুটি দূরে যাবার! ওই অমিল রয়েছে বলেই ক্রিয়াপদ ব্যবহার বিশিষ্টতা পেয়েছে। ‘রাত্রিজাগা রক্তচোখ’ আর ‘মরুভূমি’র বিপরীতে ‘মরূদ্যানের বিন্যাসও বোধকে করেছে স্নিগ্ধ। শ্যামলিমার স্পর্শ লেগে গেল যেন তৃষিত চোখে।

প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা রচনার ক্রমপর্যায়ের কথা স্মরণ করছি। ‘খেয়া কাব্যের প্রভাতে’ কবিতাটির পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায়, এটি রবীন্দ্রনাথ প্রথমে প্রথাগত ৮ + ৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লিখতে শুরু করেন।

‘পরিপূর্ণ আজি মোর অশ্রুসরোবর
কূল ছাপাইয়া গেছে দিকদিগন্তর!
প্রভাতে উঠিয়া দেখি
মাঝে ফুটিয়াছে একি
শতদল পদ্মখানি সম্পূর্ণ সুন্দর!’ ইত্যাদি।

পরে আগের পাণ্ডুলিপিতেই কাটাকুটি করে ৮ + ১০ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে সাজিয়েছেন-
‘এক বরষার রাতে এ আমার অশ্রুসরোবর
কূল ছাপাইয়া গেছে কোথা চলি দিকদিগন্তর।
প্রভাতে উঠিয়া দেখি,
মাঝে ফুটিয়াছে একি
শূন্যবনে একমাত্র শতদল সম্পূর্ণ সুন্দর।’ ইত্যাদি।
এতেও কিন্তু আড়ষ্ট ভাব থেকেই গেল। কবি তারপরে পুরো খসড়াটি কেটে দিয়ে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে নতুন করে লিখলেন-
‘এক রজনীর বরষণে শুধু
কেমন করে
আমার ঘরের সরোবর আজি
উঠেছে ভরে
হেরো হেরো মোর অকূল অশ্রু-
সলিল মাঝে
আজি এ অমল কমলকান্তি
কেমনে রাজে।
একটিমাত্র শ্বেতশতদল
আলোকপুলকে করে ঢলোঢল ’… ইত্যাদি।
শেষের এই রূপটি যেন সহজ গতি পেয়ে স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হয়ে গেল।
প্রথম লেখার মুসাবিদাটি হয়েছিল ১৩০৯ সালে, ‘খেয়া’ কাব্যের কবিতাটি রূপ পেল ১৩১২ সালে। তার অর্থ, তিন বছর ধরে যোগ্য ছন্দটি খুঁজেছিলেন কবি। অন্তরের স্পন্দ আর ছন্দ-স্পন্দের সাযুজ্য না-ঘটা পর্যন্ত কবিতাটি রূপায়িত হয়ে উঠতে পারেনি। যখন হবার, তখন আপনা থেকেই হয়েছে। তার আগে পর্যন্ত স্রষ্টা বারবার মাথা নেড়েছেন মূল স্পন্দনের সঙ্গে অমিলজনিত অননুমোদনের বোধ থেকে।
পাণ্ডুলিপি পাঠের ওই অভিজ্ঞতা থেকে কবিতার জন্মলগ্নের চঞ্চলতার ছন্দটি বাস্তবিক সৃষ্টির ছন্দের নিয়ামক বলে ধারণা হয়। উভয়ের যথার্থ মিলনেই কবিতা সাবলীল হয়ে গ্রহিষ্ণু চিত্তকে আপ্লুত করতে পারে।

‘রাত্রিজাগা রক্তচোখে’ আর ‘বৃষ্টি যখন’ কবিতায় জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তার সৃষ্টিমুহূর্তের অন্তর ছন্দে যোগ্য রূপারোপ করতে পেরেছেন বলেই অনুভব করা গেল।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা