হলের তালা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রীরা

আগের সংবাদ

নতুন করে অঙ্গসংগঠন সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু আওয়ামী লীগের

পরের সংবাদ

বন্ধ ঘোষণা সত্ত্বেও উত্তাল জাবি

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ৬, ২০১৯ , ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

Avatar

লাগাতার বিক্ষোভ আন্দোলনের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার পরও উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। ছাত্রলীগের হামলা ও ক্যাম্পাস বন্ধের প্রতিবাদে মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। হামলার প্রতিবাদে সাধারণ সম্পাদকসহ জাবি শিক্ষক সমিতির ৪ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাতে হলের তালা ভেঙে বাইরে এসে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ছাত্রীরা। রাতে ভিসির বাসার সামনে শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারী এবং আন্দোলন প্রতিরোধকারীরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
প্রশাসনের নির্দেশে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে দিয়েছেন। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনে অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও সিন্ডিকেট সচিব রহিমা কানিজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে টানা ধর্মঘটের পর উপাচার্য ভবন ঘেরাওকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ২০-২৫ জন আহত হন। হামলার প্রতিবাদে মিছিল করে আন্দোলনকারীরা, ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবস্থা বুঝে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।

দুর্নীতির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে গত আগস্ট থেকে আন্দোলন শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার সন্ধ্যায় ‘উপাচার্য অপসারণ মঞ্চ’ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের মূল ফটকে অবস্থান নেন আন্দোলন-কারীরা। এদিকে আন্দোলনকারীরা বলেছেন, স্বৈরাচার ও দুর্নীতিবাজ উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য না করা পর্যন্ত বাসা ত্যাগ করব না।
অন্যদিকে উপাচার্যপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। সকাল থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানরত আন্দোলনকারী, উপাচার্যপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শাখা ছাত্রলীগও স্থান নিতে থাকে। এ সময় উপাচার্যের পক্ষে-বিপক্ষে স্লোগানে অস্থির হয়ে ওঠে পরিবেশ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপাচার্যপন্থিরা আন্দোলনকারীদের ভিসির বাসভবনের সামনে থেকে সরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর বেলা ১১টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে শাখা ছাত্রলীগ মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের তুলে দেয়ার চেষ্টা করে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল ঘটনাস্থলে এলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ২০-২৫ জন আহত হয়। আন্দোলনকারীরা অন্যায্যভাবে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করেছে বলে দাবি করে শাখা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয় উপাচার্যকে বাসভবন থেকে মুক্ত করতে গেলে তাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর দুপুর আড়াইটায় জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ এবং ৬ নভেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এদিকে বাসভবন থেকে মুক্ত হওয়ার পর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমার সহকর্মী ও ছাত্রলীগ কর্মীদের এ গণঅভ্যুত্থানের জন্য ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন খুলে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক গতিতে চলবে।

উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মুক্ত করাকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম।

তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা তিন মাস থেকে বিভিন্নভাবে বাধা দিচ্ছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে কারা, কেন, কীভাবে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চায়। একটা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে অসম্মান ও অপদস্থ করা হয়েছে। কিন্তু এটা করা হয়েছে কোনো প্রমাণ ছাড়াই। যদি কোনো প্রমাণ থাকে, যদি প্রমাণ পায়, তাহলে যা বিচার হবে তা মেনে নেব।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এবং হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করেছে। আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসেই অবস্থান করছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রাত ৮টা) তারা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনকারীরা বলেছেন, স্বৈরাচার ও দুর্নীতিবাজ উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য না করা পর্যন্ত বাসা ত্যাগ করব না।

জাবির প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেছেন, আন্দোলন চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তার খাতিরে পুলিশ ও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে আছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকার বনানীর সেতু ভবনে কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আছে। এর সর্বশেষ খবর প্রধানমন্ত্রী জানেন। কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে তিনি খোঁজখবর নিয়ে নেবেন। তিনি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবেন।

শিক্ষক সমিতির সম্পাদকসহ ৪ জনের পদত্যাগ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনে হামলার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানাসহ চারজন পদত্যাগ করেছেন। সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও পদত্যাগ করেছেন কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিন, সদস্য অধ্যাপক মাহবুব কবির ও আরেক সদস্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারা পদত্যাগ করেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সোহেল রানা বলেন, যেহেতু শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া পূরণে ব্যর্থ, তাই এখানে থাকা আমরা প্রয়োজন বলে মনে করছি না। তাই আমরা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগের সহায়তায় হামলা চালিয়েছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নির্লিপ্তভাবে উপাচার্যের পক্ষ অবলম্বন করে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা শিক্ষক সমিতি থেকে পদত্যাগ করছি।

হলের তালা ভেঙে বিক্ষোভে জাবি ছাত্রীরা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে আবাসিক হলের তালা ভেঙে বিক্ষোভে যোগ দেন ছাত্রীরা। গতকাল রাত পৌনে ১০টায় বেগম সুফিয়া কামাল হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও প্রীতিলতা হলের তালা ভেঙে ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসেন।

এর আগে রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ছাত্রী হল এলাকায় পৌঁছায়।