স্মার্টফোন এবং আনস্মার্ট সিদ্ধান্ত

আগের সংবাদ

আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়াতে কাউন্সিলিং প্রয়োজন

পরের সংবাদ

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ৬, ২০১৯ , ৯:২২ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ৯:২২ অপরাহ্ণ

Avatar

মাহফুজা অনন্যা

কবি ও শিক্ষক, ঢাকা

আমাকে আজো একটি অপমৃত্যু নিয়ে লিখতে হচ্ছে। ক’দিন আগে মৃত্যু হলো আরো একজন আবরারের! নাম দেখেই চমকে উঠলেন? চমকে ওঠারই কথা। জানি না আর কত আবরারের মায়ের কোল খালি হবে। আমিও একজন মা। আমারও স্কুলপড়ুয়া সন্তান আছে। চারদিকে এত মৃত্যু, এত বীভৎসতা মনকে অজানা আশঙ্কায় বিচলিত করে দেয়। দুর্ভাবনা মনে জেঁকে বসে, কোথাও কোনো শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থানগুলোতেও আজ নিরাপত্তা নেই কোনো মানুষের। পৃথিবীর নিরাপদ জায়গাগুলো আজ হয়ে উঠেছে অনিরাপদ।

আজ যার কথা লিখছি, আঙুলগুলো কিবোর্ডে চালাচ্ছি সে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরার। তার মৃত্যুর ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিলেও উপস্থিত শিক্ষার্থী ও জনগণের দাবি কিশোর আলোর আয়োজক কমিটির অবহেলার কারণে আবরারের মৃত্যু হয়েছে। কী হচ্ছে এসব? একের পর এক দুর্ঘটনা। অকাতরে ঝরছে কচি, তাজা প্রাণ। আমরা সচেতনভাবে চিন্তা করলে বুঝতে পারি এ মর্মান্তিক ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষের অসচেতনতাই বেশিরভাগ দায়ী। ওই আয়োজনে অংশগ্রহণকারীর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বলেছেন অনুষ্ঠানে সরবরাহকৃত জেনারেটরের তার খোলা ছিল এবং উন্মুক্ত অবস্থায় তা এলোমেলোভাবে ছড়ানো ছিল। আয়োজকদের এ ধরনের অনুষ্ঠান করার অভিজ্ঞতা কি আগে আদৌ ছিল না? শোনা যায়, ওই বিদ্যালয়ে এর আগেও একই অনুষ্ঠান অনেকবার হয়েছে। তবে কেন এমন দায়িত্বহীনের মতো কাজ করলেন ওনারা? জেনারেটরের তার যদি উন্মুক্তই থাকে তবে কেন সেখানে একজন নির্দিষ্ট পাহারাদার রাখা হলো না? কিংবা জেনারেটরের চারপাশে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে দেয়া হলো না কেন? এটা কি দায়িত্বে অবহেলা নয়? বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর আবরারকে দ্রুত নিকটবর্তী সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে না নিয়ে চার কিলোমিটার দূরে তাদের স্পন্সরকৃত আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, মহাখালীতে নিয়ে যাওয়া হলো।

আয়োজকদের দাবিÑ দুজন এফআরসিএস চিকিৎসক আবরারকে দেখেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে তারা বুঝতে পারবেন আগুনে পোড়া মানুষের জন্য এফআরসিএস ডাক্তারের প্রয়োজন কতটুকু? কারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কাউকে চিকিৎসা করার জন্য মেডিকেল অফিসারই যথেষ্ট। জরুরি হাসপাতালে নিয়ে সমন্বিত চিকিৎসা দেয়া জরুরি ছিল না কি? অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেরই ধারণা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপকদের অবহেলা ও নির্বুদ্ধিতায় প্রাণ গেল নাইমুল আবরারের। উপস্থিত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আরো ক্ষোভের কারণ হলো সাংস্কৃতিক পর্ব বা আয়োজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আয়োজক কমিটি বিষয়টি গোপন রেখেছিল। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের জানালে হয়তো অনুষ্ঠানটি থেমে যেত। অনুষ্ঠানটি পুরোপুরি শেষ না হলে হয়তো স্পন্সর পুরো টাকা দিতে চাইবে না। কিংবা পরবর্তী ইভেন্টগুলোতে নয়ছয় করত। ফলে মাঠে মারা যেত তাদের বাণিজ্য। তারা এ বাণিজ্যে ভাটা পড়ুক তা চাননি বলেই মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রেখেই চালিয়ে গেছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যে পত্রিকার অনুষ্ঠান হচ্ছিল তার ভোক্তা ছিল আবরার। যে পত্রিকা আবরারদের জন্যই ছাপা হয়, যাদের জীবন গড়ার নানারকম প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় পত্রিকাটিতে, সেই পত্রিকার অনুষ্ঠানেই থেমে গেল আবরারের জীবন। একজন আবরার মারা গেল আর গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্রের উল্লাসে সেই মৃত্যুকে আড়াল করা হলো- এ কেমন নির্মমতা? আবরারের বাবা-মা হয়তো মামলা করেননি, কারণ ছেলের বুকটা কাটাকুটি হোক তা তারা চাননি। তাদের যা গেছে তা আর সারাজীবন মাথাকুটেও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তাই জেনেবুঝেই হয়তো পিছিয়ে গেছেন তারা। আমার কথা হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি পত্রিকার অনুষ্ঠানে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটল তবু আমাদের দেশের মিডিয়া, কিংবা কোনো পত্রিকার প্রথম পাতায় কোনো খবর প্রকাশ হলো না। এ বিষয়টি কি সরকারের কানে পৌঁছায়নি এখনো? যে পত্রিকা অন্যান্য অপমৃত্যুকে ব্রান্ডিং করে মানবতার আলোকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর, সেই পত্রিকার অনুষ্ঠানে নিহত আবরারের খবর প্রথম পাতায় ছেপে কেন দৃষ্টান্ত রাখলেন না?

কবি ও শিক্ষক, ঢাকা।